10/10/2026
ফজরের নামাজের আগে বাড়ির পেছনে অনেকগুলো ঘোড়া দৌড়ে যাওয়ার শব্দ পেতাম। কিন্তু আজান হয়ে গেলে সব শব্দ নিমিষেই হাওয়া হয়ে যেত!
এই শব্দটা কিছুদিন আগেও পেতাম না। প্রথম দিন ভেবেছিলাম, পাশের গ্রামের কারও ঘোড়া হবে। আমাদের এলাকায় দু-একজন এখনো ঘোড়ার গাড়িতে মাল টানে। কিন্তু পরপর তিন দিন একই সময়ে শব্দটা শুনে আমার ঘুমের সমস্যা হতে লাগল। রাতে শুয়েও অপেক্ষা করতাম, কখন আবার শুরু হবে।
স্ত্রীকে বললাম, “তুমিও শুনছ?”
ও পাশ ফিরে বলল, “হ্যাঁ। কাল তো মনে হচ্ছিল আমাদের জানালার পাশ দিয়েই গেল।”
বাড়ির পেছনে ঘোড়া যাওয়ার মতো কোনো রাস্তা নেই। একটা সরু জায়গা পেরোলেই পুরোনো ঈদগাহ। তারও পেছনে পুকুর। এতগুলো ঘোড়া সেখানে ঢুকলে বের হবে কোন দিক দিয়ে?
সকালে গিয়ে জায়গাটা দেখে এলাম। আগের দিনের বৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে আছে। আমার স্যান্ডেলের ছাপ ঠিকই পড়েছিল, কিন্তু ঘোড়ার খুরের একটা দাগও পেলাম না।
মাকে জিজ্ঞেস করতেই মায়ের মুখটা কেমন জানি মলিন হয়ে গেল। বললেন, “তোর বাবাও শুনত।”
বাবা মারা গেছেন চার মাস হলো। শেষের দিকে হাঁটতে কষ্ট হতো। তারপরও মাঝেমধ্যে ঝাড়ু হাতে পেছনের ঈদগাহে যেতেন। আমরা বারণ করলে বলতেন, “নামাজের জায়গাটা নোংরা হয়ে আছে। একটু পরিষ্কার করে আসি।”
মাকে বললাম, “বাবা কখনো দেখতে যায়নি?”
মা কাপড় ভাঁজ করছিলেন। হাত থামিয়ে আমার দিকে তাকালেন।
“গিয়েছিল কিনা জানি না। তবে ওই সময় পেছনের দরজা খুলতে দিত না।”
“কেন?”
“আমি তোর বাবাকে এত কিছু জিজ্ঞেস করিনি। তুইও রাতে ঘাঁটাঘাঁটি করিস না।”
মায়ের কথাটা শুনে কৌতূহল আরও বাড়ল। পরদিন ভোরে শব্দ শুরু হতেই বিছানা থেকে উঠে পেছনের জানালার কাছে গেলাম।
জানালাটা খুলতে গিয়ে টের পেলাম, আমার স্ত্রীও উঠে বসেছে।
“খুলছ কেন?”
“একটু দেখি।”
বাইরে তখন পুরো অন্ধকারও না, আবার কিছু পরিষ্কার দেখার মতো আলোও হয়নি। একটু দূরের ঈদগাহের গেটটা দেখা যাচ্ছিল। গত ঈদের পর থেকে ওটা এক পাশ দিয়ে হেলে আছে।
শব্দগুলো ঠিক ওদিকেই যাচ্ছিল।
আমি তাকিয়ে আছি। খুরের শব্দ এত কাছে যে মনে হচ্ছিল হাত বাড়ালেই একটা ঘোড়ার গায়ে লাগবে। অথচ সামনে কিছু নেই।
হঠাৎ একটা ঘোড়া ডাকল।
আমি সঙ্গে সঙ্গে জানালা থেকে সরে এলাম। ডাকটা বাইরে থেকে আসেনি। মনে হলো, জানালার নিচে দাঁড়িয়ে মাথা তুলে ডেকেছে।
স্ত্রী আমার হাত ধরে বলল, “বন্ধ করো।”
জানালা বন্ধ করার সময় আজান শুরু হলো। প্রথম ডাকের সঙ্গে সঙ্গে খুরের শব্দ থেমে গেল। শেষের ঘোড়াটা দূরে সরে গেল, এমন না। সব একসঙ্গে থামল।
পরদিন সকালে ঈদগাহের দেখাশোনা করেন যে চাচা, তাঁকে ঘটনাটা বললাম।
তিনি পুরো কথা শুনে শুধু জিজ্ঞেস করলেন, “কয়টার দিকে?”
সময় বলতেই চাচা ঈদগাহের দিকে তাকালেন।
“তোমার বাবা জানত।”
“কী জানত?”
“ওখানে যারা আসে, তাদের কথা।”
আমি কিছুক্ষণ তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। চাচা আর কিছু বললেন না। হাতে থাকা চাবি দিয়ে ঈদগাহের গেটটা সোজা করতে লাগলেন।
সেদিন রাতে আমার ঘুমই এলো না। স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়ার পর পেছনের দরজার পাশে একটা চেয়ার নিয়ে বসে থাকলাম। শব্দ শুরু হলে এবার বাইরে যাব।
ভোরের দিকে প্রথম খুরের শব্দটা পেলাম। তারপর আরও কয়েকটা। চেয়ার ছেড়ে উঠে দরজা খুললাম।
একটা ঠান্ডা দমকা বাতাস লাগল মুখে। সামনে কেউ নেই। কিন্তু ঈদগাহের গেটের কাছে পৌঁছে একটা কালো ঘোড়া দেখলাম। এত বড় ঘোড়া আমি আগে দেখিনি। ওটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। তার পেছনে আরও কয়েকটা ঢুকছিল মাঠে।
আমি থেমে গেলাম।
শেষ ঘোড়াটা গেট পেরোনোর সময় আজান শুরু হলো।
চোখের সামনে থেকে হঠাৎ ঘোড়াগুলো উধাও হয়ে গেল। আমার বুকের মধ্যে যেন কেঁপে উঠলো, আমার হাত পা অবশ হয়ে আসতে লাগলো। আমি গেট ধরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। ফিরে যাব, কিন্তু পা সরাতে পারছিলাম না।
একটু পর মাঠের ভেতর থেকে কারও কাশির শব্দ শুনলাম। তারপর কাপড়ের খসখস শব্দ। মনে হচ্ছিল অনেক মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে জায়গা ঠিক করছে।
কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
আমি গেট ছেড়ে পেছাতে যাব, তখন খুব কাছে থেকে একজন বলল, “ভাই, পথটা ছেড়ে দাঁড়ান।”
কথাটা বলল আমার কানের পাশেই আর আমার বুকের মধ্যে এসে যেন কিছু একটা ধাক্কা মেরে গেল। আমি পাশ ফিরে কাউকে পেলাম না। আর দাঁড়াইনি। বাড়িতে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলাম। আমার হৃদযন্ত্র তখনও হাপরের মতন যেন উঠানামা করছিল স্ত্রীকে ঘুম থেকে তুলতে গিয়ে দেখি, আমার হাত এত কাঁপছে যে ওর কাঁধে ঠিকমতো রাখতে পারছি না।
সকালে চাচাকে ডেকে আনলাম। সব শুনে তিনি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।
শেষে বললেন, “ঘোড়াগুলো সাধারণ ঘোড়া না। জ্বিন। ফজরের জামাতে আসে।”
আরও বললেন,
“তোমার বাবা একবার ওদের নামাজ পড়তে দেখেছিল। তারপর থেকেই জায়গাটা পরিষ্কার রাখত।”
বাবার ঝাড়ু হাতে বের হওয়ার কথা মনে পড়ল। আমরা কতবার বিরক্ত হয়েছি। বলেছি, বছরে দুই দিন নামাজ হয়, সেই জায়গা এত পরিষ্কার করার কী আছে!
চাচা চলে যাওয়ার পর পেছনের দরজাটা ভালো করে আটকে দিলাম। স্ত্রীকে সব বলিনি। শুধু বললাম, ভোরে ওই জানালাটা যেন না খোলে।
পরের দিন আবার শব্দ হলো। আমরা দুজনেই জেগে ছিলাম। কেউ বিছানা ছেড়ে উঠলাম না।
আজান হতেই সব থেমে গেল।
তার কয়েক সেকেন্ড পর পেছনের দরজায় দুবার টোকা পড়ল।
স্ত্রী আমার হাত চেপে ধরল। বাইরে থেকে শান্ত গলায় একজন বলল, “ভাই, যিনি মাঠটা পরিষ্কার করতেন, তিনি কি অসুস্থ?”
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
একটু অপেক্ষা করে লোকটা আবার বলল, “অনেক দিন তাঁকে দেখি না।”
চলবে...
(যারা নতুন পড়ছো, সিরিজটা হারিয়ে ফেলতে না চাইলে আমাকে ফলো দিয়ে ফেভারিট করে রাখতে পারো)
-------X------
ফজরের অদৃশ্য মুসুল্লি - পর্বঃ ১ (বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে রচিত)