19/09/2026
টি২০ যা চাইতো সেটাই ছিলেন ইমরান নাজির,একটা সময় ইমরান নাজির ব্যাট হাতে নামা মানেই ছিল প্রথম ওভারেই চার বা ছক্কার মার!এটুক শিওর!পরেরটা বলা যায় না,ইমরান নাজিরের ক্যারিয়ারের মতোই!
বিস্ফোরক ব্যাটিং,ভয়ডরহীন শট আর কয়েক ওভারেই ম্যাচের চেহারা বদলে দেওয়ার ক্ষমতা।কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যে ক্রিকেটারকে পাকিস্তানের হয়ে একসময় বিরেন্দর শেবাগের প্রতিউত্তর মনে করা হতো,আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিনিই কখনো নিজের প্রতিভার পুরোটা দেখাতে পারেননি।
ইমরান নাজিরের পাকিস্তান ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল মাত্র ১৭ বছর বয়সে।১৯৯৯ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক।বয়স তখন এত কম যে সামনে পড়ে ছিল বিশাল এক ভবিষ্যৎ।পাকিস্তানের ক্রিকেটে তখন থেকেই তাকে নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। আগ্রাসী ব্যাটিং, দ্রুত রান তোলার মানসিকতা,বোলারকে চাপে ফেলার সাহস, সব মিলিয়ে নাজিরকে মনে হয়েছিল এমন একজন ব্যাটার,যিনি সময়ের সঙ্গে পাকিস্তানের বড় তারকা হয়ে উঠতে পারেন।
কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সেই গল্পটা সেভাবে লেখা হয়নি।
শতাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে চারটি শতক।সংখ্যাটা নাজিরের প্রতিভার সঙ্গে ঠিক মানানসই নয়।তিনি পাকিস্তানের হয়ে ৭৯টি ওয়ানডে ও আটটি টেস্ট খেলেছেন, খেলেছেন টি২০ আন্তর্জাতিকও।কিন্তু বারবার মনে হয়েছে,নাজিরের মধ্যে যতটা সম্ভাবনা ছিল,তার তুলনায় প্রাপ্তিটা অনেক কম।
তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আর ঘরোয়া টি২০ ক্রিকেটে যেন দুজন আলাদা ইমরান নাজির।
পাকিস্তানের ঘরোয়া টি২০ ক্রিকেটে তিনি ছিলেন একেবারেই অন্য রকম এক ব্যাটার। বিশেষ করে শিয়ালকোট স্ট্যালিয়নসের হয়ে তার পারফরম্যান্স ছিল দলটির দীর্ঘ সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি।টি২০ ক্রিকেটের শুরুর বছরগুলোতে পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটে শিয়ালকোট স্ট্যালিয়নসের আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো।আর সেই দলের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যাটারদের একজন ছিলেন নাজির।
ইসলামাবাদ ইউনাইটেডের স্ট্র্যাটেজি ম্যানেজার হাসান চিমা তাকে বলেছিলেন, ‘ডোমেস্টিক গড।’
কথাটা শুনতে হয়তো একটু বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে।কিন্তু পরিসংখ্যান নাজিরের ঘরোয়া টি২০ পরিচয়টা বুঝতে সাহায্য করে।টি২০ ক্রিকেটে তার ক্যারিয়ার স্ট্রাইক রেট ১৪৮.৯১,যা সর্বকালের সেরা ৫০-এর মধ্যে রয়েছে।আরও বিস্ময়ের বিষয়,টি২০ ক্রিকেটের শুরুর দশকেই তিনি ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ ম্যাচ খেলেছেন,যখন এই ফরম্যাটের ব্যাটিং সংস্কৃতি আজকের মতো এতটা আক্রমণাত্মক ছিল না।
তার টি২০ গড়ও ২৭.৯৩।স্ট্রাইক রেট এবং গড়,দুটোতেই তিনি বিরেন্দর শেবাগের চেয়ে এগিয়ে।
এখানেই ইমরান নাজিরের গল্পটা অন্য রকম হয়ে যায়।
তিনি যে ধরনের ক্রিকেট খেলতেন,টি২০ আসলে সেই ক্রিকেটের জন্যই তৈরি। পাওয়ারপ্লেতে ঝুঁকি নেওয়া,ফিল্ডার মাথার ওপর দিয়ে বল পাঠানো,গ্যাপ খোঁজার বদলে অনেক সময় সরাসরি বোলারের ওপর আক্রমণ,কয়েকটি বলের মধ্যে ম্যাচের গতি পাল্টে দেওয়া,নাজিরের ব্যাটিংয়ে এসব ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার।
কিন্তু টি২০ তাকে যতটা বুঝেছিল, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট যেন ততটা বুঝতে পারেনি।
অথবা প্রশ্নটা উল্টো করেও করা যায়।
ইমরান নাজির কি নিজেই নিজেকে পুরোপুরি বুঝতে পেরেছিলেন?
সম্ভবত এটাই তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
কারণ প্রতিভার অভাব তার ছিল না।বরং সমস্যা ছিল,সেই প্রতিভাকে ধারাবাহিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেননি।আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একটি ইনিংস দিয়ে নিজের সামর্থ্যের আভাস দিয়েছেন,তারপর আবার হারিয়ে গেছেন।কখনো দুর্দান্ত শুরু,কখনো অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি,কখনো এমন আউট যা দেখে মনে হয়েছে আরও কিছুটা ধৈর্য ধরলেই গল্পটা অন্য রকম হতে পারত।
হাসান চিমার কথাটাই তাই নাজিরকে বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলোর একটি।আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যারা তাকে দেখেছেন,তারা নাজিরের সেরাটা খুব কমই দেখতে পেয়েছেন।ঘরোয়া ক্রিকেটে,বিশেষ করে টি২০তে,তিনি ছিলেন অন্য মাত্রার খেলোয়াড়।
এখানে ট্র্যাজেডিটা প্রতিভার নয়, সম্ভাবনার।
কারণ ইমরান নাজিরের মধ্যে এমন কিছু ছিল,যা শেখানো যায় না।তার ব্যাটিংয়ে ছিল স্বাভাবিক আগ্রাসন।বোলারকে ভয় দেখানোর ক্ষমতা ছিল।টি২০ ক্রিকেট তখনও যখন নতুন,নাজির এমন ব্যাটিং করতেন যা পরে টি২০ ক্রিকেটের স্বাভাবিক ভাষা হয়ে উঠেছে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তাই নাজিরকে শুধু পাকিস্তানের আরেকজন ব্যর্থ প্রতিভা হিসেবে দেখলে গল্পের বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।
তিনি ছিলেন এমন এক ক্রিকেটার,যিনি নিজের সময়ের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে ছিলেন।ঘরোয়া টি২০ ক্রিকেটে তার ব্যাটিং সেটারই প্রমাণ।কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সেই প্রতিভার সঙ্গে ধারাবাহিকতার যোগসূত্র তৈরি হয়নি।
সবাই ইমরান নাজিরকে চিনত।
পাকিস্তান চিনত।সমর্থকেরা চিনত। প্রতিপক্ষের বোলাররাও জানত,নাজির সেট হয়ে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ম্যাচ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা থেকেই যায়,ইমরান নাজির কি নিজেকে চিনেছিলেন?
হয়তো চিনেছিলেন।কিন্তু নিজের প্রতিভাকে কোথায়,কখন এবং কতটা ব্যবহার করতে হবে,সেই উত্তরটা তিনি পুরো ক্যারিয়ারে খুঁজে পাননি।
আর সেই কারণেই ইমরান নাজিরের গল্পটা শুধু চারটি আন্তর্জাতিক শতকের নয়।
এটা এমন এক ব্যাটারের গল্প,যার জন্য টি২০ যেন ঠিক সেই জায়গাটাই তৈরি করেছিল,যেখানে তিনি নিজের স্বাভাবিক ক্রিকেট খেলতে পারবেন।কিন্তু সেই ক্রিকেটারই আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের সম্ভাবনার পুরো গল্পটা লিখে যেতে পারেননি।
টি২০ তাকে পেয়েছিল তার সবচেয়ে স্বাভাবিক রূপে।
ক্রিকেট বিশ্ব তাকে দেখেছিল তার অসম্পূর্ণ রূপে।