05/10/2026
সার্জারি আর মাশরাফি একে অপরের পরিপূরক। তবে শেষ অবধি সার্জারী-কে হার মানতে হয়েছে অপ্রতিরোধ্য মাশরাফির কাছে।
১৬ বছরের ওয়ানডে, টেস্ট ও টি২০ ক্যারিয়ারে দুই হাঁটুতে সর্বমোট অপারেশন হয়েছে ৭ বার, দুই এ্যাঙ্কেলের তিন অপারেশন মিলে ১০ বার যেতে হয়েছে ডাক্তারের ছুরির নিচে। প্রতি ম্যাচ শেষে সিরিঞ্জ দিয়ে টেনে বের করতে হতো হাঁটুতে জমা বিষাক্ত রস। ম্যাশ ঘুম থেকে উঠে সাথে সাথে চাইলেও নামতে পারেন না বিছানা থেকে, হাঁটু দুটি কয়েকবার ভাঁজ ও সোজা করে তবেই নামতে হয় বিছানা থেকে।
ডাক্তার তো বলেই দিয়েছেন এভাবে ক্রিকেট চালিয়ে গেলে এক সময়ে চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাবেন। অদম্য ম্যাশ এসবে পাত্তা না দিয়ে বার বার ফিরেছেন, লড়েছেন আপন মহিমায়, জয় করেছেন ক্রিকেট বিশ্বে লাখো লাখো ক্রিকেট প্রেমী সহ অসংখ্য মানুষের হৃদয়। বাঘের মতো ছুটে চলা, এ যেন এক অপ্রতিরোধ্য বীর সেনার গল্প। যার জীবনের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে সাহসিকতা, দেশপ্রেম আর অদম্য এক যোদ্ধার প্রতিচ্ছবি। যার থেকে অগণিত তরুন রা অনুপ্রেরণা নিয়ে এগিয়ে নিচ্ছে নিজের ক্যারিয়ার।
শত ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে লাল সবুজ পতাকার সম্মান, হাসি-কান্নার ভার যার কাঁধে চেপেছিল, তখন তা পালন করেছেন শক্ত হাতে! অর্জন করেছেন দেশ সেরা অধিনায়কের খেতাব। ম্যাচ হারলে যিনি কাঁদেন নিরব; সবার আড়ালে। নবীন ক্রিকেটারদের বুকের মধ্যে আগলে রাখেন ভালোবাসা দিয়ে বটবৃক্ষের মতো।
একজন মাশরাফি বাংলাদেশ ক্রিকেট কে যতটা এগিয়ে নিয়েছে তার নেতৃত্ব দিয়ে ঠিক ততটাই এগিয়ে নিয়েছে তার বোলিং দিয়ে। হয়তো দিতে পারতেন আরো কিছু, কিন্তু পারেননি ইঞ্জুরী নামক ভয়ংকর শত্রুর কারণে। মাশরাফির টেস্টে এক ইনিংসে ৫উইকেট নেই, নেই ওয়াসিম, মেগ্রাদের মতো শত শত উইকেট। ব্রেট লি, শোয়েব আখতারদের মতো গতি দানবও নন তিনি। তবে তিনি মাশরাফি বিন মুর্তজা, বাংলার কৌশিক।
তাঁর হাত ধরেই ক্রিকেটের সোনালী সময় পার করছে বাংলাদেশ। মাশরাফিই বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম ক্রিকেটার, যিনি কোনো লিস্ট-এ ম্যাচ না খেলেই সরাসরি জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন। তার বিচক্ষণ নেতৃত্ব ২০১৫ বিশ্বকাপে দলকে নিয়ে গিয়েছেন কোয়ার্টার ফাইনালে! শুধু কোয়াটারেই থেমে যাননি ম্যাশ; দেশের ক্রিকেটের সেরা সাফল্য আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি সেমি-ফাইনালেও নিতে সক্ষম হয়েছেন ২০১৭ সালে।
তার হাত ধরেই পাকিস্তানকে প্রথম বারের মতো হোয়াইট ওয়াশ, ভারতর, দক্ষিন আফ্রিকার সাথে প্রথমবারে মতো সিরিজ জয়।
-জাতীয় দলে অভিষেক হয় ৮ নভেম্বর ২০০১ সালে! পথচলা টা শুরু হয় টেস্ট ক্রিকেটের মাধ্যমে, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ইঞ্জুরীর নামক বিষাক্ত ছোবলে টেস্ট ক্যারিয়ার টা থমকে যায় অল্পতেই। ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ইঞ্জুরী হয়ে সেই যে মাঠ ছেড়েছিলেন তার পর আর ফেরা হয়নি এই ফর্মেটে।
তবে যেটুকু সুযোগ হয়েছে এই ফর্মেট মাতানোর তা নিজের মতো করেই মাতিয়েছেন ম্যাশ। ৩৬টি টেস্ট ম্যাচ খেলে দুটি অর্ধ-শতক সহ মোট রান করেছেন ৭৯৭টি; সাথে নেন ৭৮টি উইকেট। এই ফর্মেটে ক্যারিয়ার সেরা বেলিং ৬০ রানে খরচায় ৪উইকেট।
-২৩শে নভেম্বর ২০০১ সালে ওই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই অভিষেক হয় ওয়ানডে ফর্মেটে। এই ফর্মেটেও ম্যাশের পথচলা থমকে গেছে সেই ২০১৯ সালের পরপরই। যদিও আনুষ্ঠানিক ভাবে বিদায় জানাননি এখোনো তবে থমকে যাওয়ার আগে এই ফর্মেটোে যা করে গেছেন তা বাংলাদেশক ক্রিকেট ইতিহাসে থাকবে অমর হয়ে। ওয়ানডে ফর্মেটে সর্বোপরি ২২০টি আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ম্যাচ খেলে ১টি অর্ধ-শত সহ প্রায় ১৪ গড়ে ১৭৮৭ রান এবং ২৭০টি উইকেট নিয়েছেন। সেরা বোলিং ফিগার ২৬রানে ৬উইকেট।
-টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটেও আগমন ঘটে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই, তাও সেই নভেম্বরে তবে সালটা ২০০৬। ম্যাশ এই ফর্মেট থেকে বিদায় জানিয়ে দিয়েছেন সেই ২০১৭ সালের ৬এপ্রিল শ্রীলংকার সাথে শ্রীলঙ্কার মাটিতে ম্যাচটি খেলে। ৫২টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে ৩৬৬ রান এবং ৩৯উইকেট উইকেট রয়েছে এই জীবন্ত কিংবদন্তীর ঝুলিতে। সেরা বোলিং ফিগার ১৯রানে ৪উইকেট।
মাশরাফিকে যদি প্রশ্ন করা হয় ক্রিকেট জীবনে সবচেয়ে বড় দুঃখ কী? উত্তরে নিশ্চয় বলবে ঘরের মাঠে ২০১১ বিশ্বকাপ না খেলতে পারা। ইঞ্জুরীটা নামক চির প্রতিদ্বন্দ্বি সেবার বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দিয়ে ছিলো ম্যাশ কে। এছাড়া বাকিটা সময় সোনায় মোড়ানো ছিলো মাশরাফি ক্রিকেটীয় জীবন। ইঞ্জুরীর থাবা না থাকলে সেটা হতে পারতো আরো বহুগুন সুন্দর।
আজ ৫ই অক্টোবর! বাংলার ক্রিকেটের জীবন্ত কিংবদন্তীর জন্মদিন। বাংলার কৌশিকের জন্মদিন, নড়াইল এক্সপ্রেসের জন্মদিন। শুভ জন্মদিন ম্যাশ।