17/06/2026
The Fall of Brazil
- ১৯৯৮ বিশ্বকাপ, ফাইনাল
- ব্রাজিল ০ ফ্রান্স ৩
- স্টাড ডি ফ্রান্স, প্যারিস
জিদানের ডবল হেডার বা ব্রাজিলের আক্রমণ ভাগের ব্যর্থতার চেয়েও ভয়াবহ সংবাদ ছিল, হঠাৎ করে রোনাল্ডোর অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। ২৭ এবং ৪৫ মিনিটে সেটপিস থেকে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন জিদান। ম্যাচের ৯০ মিনিটে, শেষ পেরেকটি ঠোকেন এমানুয়েল পেটিট। দ্বিতীয় হাফের শুরুতেই মার্চিং অর্ডার পান মিলান ডিফেন্সিভ মিড মার্সেল ডেসাইলি। ১০ জনে পরিণত হলেও, ফ্রান্সের লো ব্লক ডিফেন্স ব্রাজিলের আক্রমণ ভালভাবেই সামলে নেয়।
সত্যিকার অর্থে ফাইনালে ব্রাজিল একেবারেই ভাল খেলে নাই। পুরো টুর্নামেন্টে জুড়ে ত্রাস ছড়ানো রোনাল্ডো এবং রিভাল্ডো ছিলেন নিজেদের ছায়া হয়ে। বিল্ডআপে ছিল অনেক ভুল। প্লেয়াররা যেন তাদের ন্যাচারাল স্কিলমুভ দিতেও ভুলে গিয়েছিলেন। সেকেন্ড হাফে যথাসাধ্য চেষ্টা করলেও ফ্রান্সের লো ব্লক ডিফেন্স ভাঙার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না।
- ২০০৬ বিশ্বকাপ, কোয়ার্টার ফাইনাল
- ব্রাজিল ০ ফ্রান্স ১
- ডয়েশব্যাঙ্ক স্টেডিয়াম, ফ্র্যাঙ্কফুর্ট
রোনাল্ডো, রোনাল্ডিনহো, অ্যাড্রিয়ানো, কাকা, কাফু, রবার্তো কার্লোস, জুনিনহো, জিলবার্তো সিলভা, এমারসন, লুসিও, ডিডা। দারুণ দল তাই না? ২০০৬ এর দলটা আমার দেখা সেরা দল ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও, সেটা শুধু কাগজে কলমেই সেরা।
দলের ১১ জনের বয়স ছিল ৩০ এর উপরে। রোনাল্ডো, রোনাল্ডিনহো, অ্যাড্রিয়ানো দেরকে নামের ওজন এবং স্পন্সর দের চাপের জন্য খেলানো লাগছিল। পুরো টুর্নামেন্টে শুধুমাত্র কাকা এবং জি রবার্তো ছাড়া আর কেউই দলের জন্য নিবেদিত হয়ে খেলেন নাই। কোয়ার্টার ফাইনাল সহ বেশ কিছু ম্যাচে, স্পন্সর এবং সমর্থক দের খুশি করতে, ৭ জন ফ্রন্টলাইনার খেলিয়েছিলেন পাহেইরা। দলের আক্রমণ এবং ডিফেন্সের মধ্যে ছিল না কোন ভারসাম্য। দ্রুতগতির থিয়েরি হেনরির বিপক্ষে বুড়িয়ে যাওয়া রবার্তো কার্লোস হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়চ্ছিলেন। জিদানের একটা ক্রসেই সলিলসমাধি হয় তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দের। একেবারে শেষের দিকে রোনাল্ডিনহো বক্সের বাইরে একটা ফ্রি কিক পান। ব্যালন বিজয়ী বার্সেলোনা জাদুকর, ওরকম ১০টা সেটপিসের ৯টাই গোল দিতে অভ্যস্ত ছিলেন। বারের অনেক উপর দিয়ে উড়িয়ে মারেন তিনি। সূর্যাস্ত ঘটে জোগা বনিতোর।
- ২০১০ বিশ্বকাপ, কোয়ার্টার ফাইনাল
- নেদারল্যান্ডস ২ ব্রাজিল ১
- নেলসন ম্যান্ডেলা স্টেডিয়াম, পোর্ট এলিজাবেথ
ব্রাজিলের এই দলটাকে আমি একটা বিশেষনেই অভিহিত করবো, "ডেডলি"। মাঝমাঠ দখলে রাখা, উইং থেকে দারুণ সব আক্রমণ, দুই স্ট্রাইকারের ফিনিশিং, কাকার আধিপত্য, ডিপ থেকে এলানোর বিল্ডআপ সবমিলিয়ে ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মত দল ছিল। বড় একটা ঝামেলা হয়ে যায়, গ্রুপের আইভরি কোস্ট ম্যাচে দলের ইঞ্জিন, এলানোর ইনজুরি। ফলে, ডিফেন্স আর অ্যাটাকের মধ্যে দুর্দান্ত সংযোগের ভাঙন ধরে। কোয়ার্টার ফাইনালের শুরুটাও দারুণ হয়েছিল। অফসাইডে রবিনহোর গোল বাতিলের পরে, মাত্র ১০ মিনিটেই ব্রাজিল এগিয়ে গিয়েছিল। ফার্স্ট হাফের শেষের দিকে কাকা, লুইস ফ্যাবিয়ানো, রবিনহো ত্রয়ীর মুভমেন্টে মুহূর্তের জন্য থমকে যায় বিশ্বচরাচর। ডাচ কীপার স্টেকেলেনবার্গ, কাকার ফিনেস শট আঙুল দিয়ে আউট না করলে, ওখানেই ম্যাচ শেষ হয়ে যায়। সেকেন্ড হাফে স্বরূপে ফেরে রোবেন, শ্নাইডার রা। মুহুর্মুহু আক্রমণে দিশেহারা হয়ে ভুল করে বসেন হুলিও সিজার এবং ফেলিপে মেলো। ৭৩ মিনিটে ফেলিপে মেলো লাল কার্ড দেখলে, পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়। শেষ পর্যন্ত, হতাশ হয়েই ফিরতি প্লেনের টিকেট কাটতে হয় সেলেসাও দের।
- ২০১৪ বিশ্বকাপ, সেমিফাইনাল
- ব্রাজিল ১ জার্মানি ৭
- এস্তাদিও মিনেইরো, বেলো হরিজন্তে
একেই দূর্বল দল, ছন্নছাড়া মিডফিল্ড; সাথে দলের সেরা প্লেয়ারের টুর্নামেন্ট খতম। নেইমারের ইনজুরি স্ট্রিক শুরু হয় ২০১৪ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে। গোদের ওপর বিষফোঁড়া ছিল, দলের অধিনায়ক থিয়াগো সিলভার সাসপেনশন। কোচ স্কলারির নির্দেশ ছিল লংবল দিয়ে স্ট্রাইকার এবং উইঙ্গার দেরকে বলের যোগান দেয়া। কোচ যেখানে নেইমার বিহীন মিডফিল্ডের উপরে ভরসা করতেই অস্বস্তি করছিলেন, সেখানে ব্রাজিল করলো একেবারে উড়ন্ত সূচনা। যেন জার্মানিকে ফার্স্ট হাফে অন্তত ৪/৫টা গোল দিয়েই ছাড়বে। ঠান্ডা মাথার জার্মান রোবট রা একটি শট-ও নয়্যার বরাবর যেতে দেয় নাই। কিছুক্ষন পরে মুলারের গোলে এগিয়ে যায় জার্মানি। আরো মিনিট দশেক পরে স্টিমরোলার চালিয়ে ৬ মিনিটের মধ্যে ৪ গোল দিল ব্যাভারিয়ান রা। টনি "স্নাইপার" ক্রুস দেখিয়ে দিলেন ফুটবল কিভাবে খেলতে হয়। প্রথম হাফ শেষে ব্রাজিল পিছিয়ে ছিল ৫ গোলে। সেকেন্ড হাফে জার্মানি স্কোর করে আরো ২টি। ৮৯ মিনিটে অস্কার ফেরত দেন ১টি গোল। রচিত হয়, মারাকানাজো দুঃস্বপ্নের পরে মিনেইরাজো দুঃস্বপ্ন।
স্কোরলাইন ৪-০ হওয়ার পরেই টিভি অফ করে দেই। ম্যাচের বাকিটা আর দেখি নাই, কোনদিন দেখবো-ও না। মিনেইরাজোর জন্য আমার বুকের গভীরে, কালো একটা ক্ষত হয়ে গিয়েছে, যা হয়তো কখনোই মুছবে না।
- ২০১৮ বিশ্বকাপ, কোয়ার্টার ফাইনাল
- ব্রাজিল ১ - বেলজিয়াম ২
- কাজান এরেনা, কাজান
৯৪ মিনিট, নেইমারের কার্লিং শট এবং কোর্তোয়ার ফিঙ্গারটিপ সেইভ। একেবারে যেন ২০১০ এর প্রতিচ্ছবি। নেইমার এবং কাকা যেন দুই পরাজিত রাজকুমার। লুকাকুর পাগলা ষাঁড়ের দৌড়, ডি ব্রুইনের দুর্দান্ত শট, হ্যাজার্ড বা কুটিনহোর দারুণ প্লেমেকিং, রেনাটো অগাস্টোর হেড অথবা ফার্নান্ডিনহোর সেমসাইড গোল সবকিছু ছাপিয়ে আলোচনায় ছিল কোর্তোয়ার "ডেভিল ইন আ ব্ল্যাক ড্রেস" পারফরম্যান্স। খোদ শয়তান যেন ভর করেছিল ভবিষ্যৎ রিয়াল মাদ্রিদ গোলকিপারের ওপর। ৮.৬ রেটিং নিয়ে ৯টি সেভ দেন কোর্তোয়া। টুর্নামেন্টে ব্রাজিল মোটামুটি খেলেছিল। ম্যাচ জিতে যাচ্ছিল, কিন্তু কোথাও একটা অস্বস্তি থেকেই যাচ্ছিল। নেইমার নিজেও শতভাগ ফিট ছিলেন না। কুটিনহো, থিয়াগো সিলভা, উইলিয়ান দের উপর ভর করে কোয়ার্টারে উঠলেও, ব্রাজিল দুর্দান্ত খেলেছিল এটা বলা যাবে না। যোগ্য দল হিসেবেই জিতেছিল বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্ম।
- ২০২২ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল
- ব্রাজিল ১(২) - ক্রোয়েশিয়া ১(৪)
- এডুকেশন সিটি স্টেডিয়াম, আল রায়ান
আর বাকি মাত্র ১৫ মিনিট... রড্রিগো, পাকুয়েতা, নেইমারের দুর্দান্ত ওয়ান টাচ পাসে ব্রাজিল এগিয়ে, ১-০ গোলে... সেলেসাওরা উঠে যাচ্ছে সেমিফাইনালে। ফ্রেডের অতিউৎসাহ, বল লুজ, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক, পেতকোভিচের শট, মার্কুইনহোসের পায়ে লেগে ডিফ্লেকশন এবং গোল। পুরো ম্যাচে ব্রাজিল খারাপ খেলে নাই, কিন্তু ক্রোয়েশিয়া কি খারাপ খেলেছিল? মিডফিল্ড দখলের দিক দিয়ে কিন্তু মড্রিচ বাহিনী এগিয়ে ছিল। পাসের সংখ্যা, লংবল সাপ্লাই, ট্যাকল, গ্রাউন্ড এবং এরিয়াল ডুয়েল সবদিকেই ব্রাজিল পরাজিত ছিল। দুই উইঙ্গার ভিনিশিয়াস এবং রাফিনহা সুনাম অনুযায়ী খেলতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। পার্থক্য গড়ে দিচ্ছিলেন নেইমার। ক্রোয়েশিয়ান ফরওয়ার্ড দের ফিনিশিং ও ভাল ছিল না। শেষাবধি, টাইব্রেকারে ব্যর্থতার সাথে সাথে কান্নায়ে ভেঙে পড়েন ব্রাজিলিয়ান দুখী রাজকুমার।
৬ বার ব্যর্থতার স্বাদ পেয়েছি। সাথে পেয়েছি, ২ বার প্রিয় দলকে চ্যাম্পিয়ন হতে দেখার অসামান্য অভিজ্ঞতা। এবারে তূলনামূলক দূর্বল দল... তারপরও আশা ছাড়ছি না। চ্যাম্পিয়ন না হলেও অসুবিধে নেই, ব্রাজিলকে আরেকবার চ্যাম্পিয়ন হতে দেখার অপেক্ষায়ে থাকবো আজীবন। আমার জন্য, প্রতিটি ব্রাজিল সমর্থকের জন্য বিশ্বকাপ শুরু হতে যাচ্ছে আরেকটু পর 💛🇧🇷
#কালেক্টেড