03/10/2026
ইংল্যান্ডের আন্ডাররেটেড একজন অলরাউন্ডার
পরিসংখ্যান সবসময় একজন ক্রিকেটারের পুরো চিত্র তুলে ধরে না। অনেক সময় সংখ্যার আড়ালে থেকে যায় একজন ক্রিকেটারের আসল গল্প। পল কলিংউডের ক্যারিয়ার তারই দারুণ উদাহরণ।
টি-টোয়েন্টিতে কলিংউডের স্ট্রাইক রেট ১২৭। সংখ্যাটা খুব একটা চোখে পড়ার মতো নয়। কিন্তু একটু গভীরে গেলে ছবিটা বদলে যায়। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে তার তিনটি ফিফটির দুটিই এসেছে ১৯২ স্ট্রাইক রেটে। অন্যটিতে তার স্ট্রাইক রেট ছিল ১৫৫। অর্থাৎ প্রয়োজনের সময়ে দ্রুত রান তোলার সামর্থ্য তার ছিল যথেষ্ট।
টেস্ট ক্রিকেটে আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কলিংউডকে দেখা গেছে। তিনি ছিলেন লম্বা ইনিংস খেলার বিশেষজ্ঞ। টেস্টে করেছেন ১০টি শতক। এর মধ্যে চারটি ছিল ২০৬, ১৮৬, ১৬১ ও ১৪৫ রানের ইনিংস। শুধু শতক নয়, বড় ইনিংসকে আরও বড় করার মানসিকতাও ছিল তার ব্যাটিংয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
স্বভাবের দিক থেকে কলিংউড ছিলেন সহজ-সরল ও স্বতঃস্ফূর্ত। কিন্তু ক্রিকেটের মাঠে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল পরিশ্রম আর নির্ভরযোগ্যতা। ২০০১ সালে ইংল্যান্ডের হয়ে অভিষেকের পর প্রায় নয় বছর ধরে তিনি এমন এক পেশাদারিত্ব দেখিয়েছেন, যা তাকে দলে অপরিহার্য করে তুলেছিল।
তখন ইংল্যান্ড দলে তার চেয়ে প্রতিভাবান অনেক ক্রিকেটার ছিলেন। কিন্তু একের পর এক প্রতিযোগীর ভিড় পেরিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন কলিংউড। কারণ তিনি শুধু ব্যাটার ছিলেন না। দলের প্রয়োজনে বল হাতে দায়িত্ব নিতে পারতেন, আবার ফিল্ডিংয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্যও ছিল।
তার ঘরোয়া ক্রিকেটের ক্যারিয়ারও ছিল অসাধারণ দীর্ঘ। ডারহামের পেশাদার ক্রিকেটের ২৬ বছরের মধ্যে ২৩ বছরই তিনি এই দলের হয়ে খেলেছেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৩০৪ ম্যাচে তার রান ১৬,৮৪৪, সঙ্গে ১৬৪ উইকেট। সংখ্যাগুলোই বলে দেয়, তিনি কতটা ধারাবাহিকভাবে দলের জন্য অবদান রেখেছেন।
ব্যাট হাতে কলিংউডের ধরন ছিল কিছুটা আলাদা। ক্রিজে খুব একটা নড়াচড়া করতেন না। বল সোজা ব্যাটে খেলতে পছন্দ করতেন। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী শট খেলার বৈচিত্র্যও ছিল তার। বাইরে থেকে তার ব্যাটিংকে যতটা সাদামাটা মনে হতো, বাস্তবে তার হাতে ছিল বেশ ভালো শটের সম্ভার।
বল হাতে তার ধরন ছিল আরও সাধারণ। গতি বা ভয়ংকর বৈচিত্র্যের চেয়ে নির্ভর করতেন সঠিক জায়গায় বল রাখা ও পরিস্থিতির সুবিধা নেওয়ার ওপর। কিন্তু উপযুক্ত পরিবেশ পেলে সেই সাধারণ বোলিংই হয়ে উঠতে পারত ম্যাচ জেতানো অস্ত্র। ২০০১-০২ মৌসুমে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডেতে সুইং বোলিং করে ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্স দিয়েছিলেন তিনি।
আর ফিল্ডিং?
এখানেই কলিংউড ছিলেন বিশ্বমানের। কভার ও ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে তার ফিল্ডিং ছিল অসাধারণ। কঠিন ক্যাচ, দ্রুত মুভমেন্ট কিংবা অবিশ্বাস্য থ্রো, যেকোনো মুহূর্তে তার কাছ থেকে বিশেষ কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা থাকত।
তবে কলিংউডের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো ছিল তার দৃঢ়তা।
২০০০-০১ সালের শীত। তখন বুঝতে পারছিলেন, নিজের ক্যারিয়ার যেন একটা জায়গায় আটকে আছে। তাই অস্ট্রেলিয়ায় চলে গেলেন গ্রেড ক্রিকেট খেলতে। উদ্দেশ্য ছিল নিজেকে আরও ভালোভাবে তৈরি করা, নিজের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা।
সেই সিদ্ধান্তই হয়তো তার ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।
এরপর তিনি শুধু ইংল্যান্ড দলে জায়গা করে নেননি, হয়ে উঠেছিলেন দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ক্রিকেটার। আর তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় আসে অধিনায়ক হিসেবে।
২০১০ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ইংল্যান্ড প্রথমবারের মতো কোনো বৈশ্বিক ক্রিকেট টুর্নামেন্টের শিরোপা জেতে। অধিনায়ক কলিংউডের হাতেই ওঠে সেই ট্রফি। ইংল্যান্ডের প্রথম অধিনায়ক হিসেবে বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট জেতার কৃতিত্বও তখন তার নামের পাশে যোগ হয়।
পল কলিংউড হয়তো এমন একজন ক্রিকেটার নন, যার নাম শুনলেই প্রথমে বিশাল পরিসংখ্যান মনে পড়ে। কিন্তু ক্রিকেটার হিসেবে তার মূল্য শুধু রান বা উইকেট দিয়ে মাপা কঠিন।
ব্যাট হাতে বড় ইনিংস, বল হাতে প্রয়োজনের সময় অবদান, ফিল্ডিংয়ে বিশ্বমানের দক্ষতা আর নিজের জায়গা ধরে রাখার অসাধারণ মানসিকতা, সব মিলিয়েই পল কলিংউড।
পরিসংখ্যান তার ক্যারিয়ারের একটা অংশ বলে। পুরো গল্পটা বলে তার বহুমুখী অবদান।