13/06/2026
সংকট সময়ে বিশাল ঘাটতি বাজেট বিএনপি সরকারকে বিপদে ফেলবে
সালেক সুফী
অভ্যন্তরীণ এবং বৈষয়িক নানা ঘটনায় বাংলাদেশ এখন মহাসঙ্কটে। অর্থনীতি ক্ষয়িষ্ণু , মুদ্রাস্ফীতি ,দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি ,জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকটে জন জীবন অসস্ততিতে। ঠিক এই সময়ে বিএনপি জোট সরকারের জন্য বিশাল আকারের ঘাটতি বাজেট সুবিবেচনা প্রসূত হয়েছে বলে মনে হয় না. বাজেট পেশ উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য শ্রুতিমধুর ছিল সন্দেহ নেই. কিন্তু অন্তরালের চ্যালেঞ্জগুলোর কথা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে অনুমান করতে অর্থনীতির জাদুগর না হয়েও বলা যায় অতি উচ্চ বিলাসী এই বাজেট বাস্তবায়ন করা হয়ত অধরাই রয়ে যাবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজেট ব্যবস্থাপনার একটি শক্তিশালী রূপক। এটি এমন এক বাস্তবতা, যেখানে অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অবিরাম প্রচেষ্টার পরও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, ঋণের চাপ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে তা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে।বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং সীমিত সম্পদ দিয়ে অসীম চাহিদা পূরণের আকাশ কুসুম স্বপ্ন বিলাস বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রযোজ্য নয়.
প্রস্তাবিত বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায় ৯লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল প্রস্তাবিত বাজেটে পরিচালন ব্যায় ধরা হয়েছে ৬ লক্ষ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা ,উন্নয়ন ব্যায় ৩ লক্ষ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা ,খাদ্য হিসাব ২ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা ,ঋণ ও অগ্রিম ১৩ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৬ লক্ষ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ৬ লক্ষ ৪ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভুত রাজস্ব ২৫ হাজার কোটি টাকা, কর বহির্ভুত রাজস্ব ২৫ হাজার কোটি অনুদান ৬.১৫০ কোটি টাকা। ঘোষিত বাজেট অনুযায়ী ঘাটতি ২ লক্ষ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। বলা হয়েছে ১ লক্ষ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা আসবে বিদেশী ঋণ হিসাবে। স্থানীয় ঋণ হিসাবে প্রাক্কলন করা হয়েছে ১ লক্ষ ২৭ হাজার কোটি টাকা। স্থানীয় ঋনের ১ লক্ষ ১২ হাজার নেয়া হবে ব্যাংক ঋণ ,সঞ্চয় পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি এবং অন্নান্য ৮ হাজার ৫০০ কোটি।
বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী কৃষি ,খাদ্য, স্বাস্থ ,সামাজিক নিরাপত্তা ,নবায়ন যোগ্য জ্বালানী খাতে বিপুল প্রণোদনা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই কর রেয়াত দেয়া হয়েছে। জানিনা রাজস্ব আহরণ ব্যাবস্থাপনার জরুরি সংস্কার ব্যাতিরেকে কিভাবে প্রাক্কলিত রাজস্ব আদায় হবে? আর নতুন সরকার বিপুল মাত্রায় স্থানীয় ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিলে দেশীয় বিনিয়োগে বিশাল প্রভাব পড়বে কিনা? নতুন সরকার দেশের আইন শৃঙ্খলা উন্নয়ন করে স্থিতিশীলতা অর্জন না করা পর্যন্ত বিদেশী ঋণ বা বিদেশী বিনিয়োগ কাঙ্খিত ভাবে অর্জন সম্ভব হবে না.সেই ক্ষেত্রে সরকারকে নির্ভর করতে হবে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্সের উপর. সবাই জানে বিদ্যমান গ্যাস বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত রপ্তানি শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধি কমে গাছে। অনেক শিল্প রুগ্ন হয়ে পড়েছে, বেকার সমস্যা প্রকট হচ্ছে। যুদ্ধ সংকটে বিপর্যস্ত মদ্ধপ্রাচ্যের দেশ গুলো থেকে রেমিনটেন্স প্রবাহ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে. প্রস্তাবিত বাজেটে অনেক ক্ষেত্রেই কর অব্যাহতি বা অবকাশ প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে কমে যাওয়া রাজস্ব আয় কিভাবে পূনভরণ হবে তার নির্দেশনা নেই। সরকার সাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের কথা বলছে ,সাফল্য আসতে ৮-১০ বছর সময় লাগবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি সংশোধন বা বাতিল না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশকে অধিক মূল্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি কিনতে হবে.
আমি শিক্ষা ,সাস্থ ,কৃষি ,সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাজেটে উল্লেখিত প্রণোদনাকে স্বাগত জানাই। স্বাগত জানাই নবায়ন যোগ্য জ্বালানি ,বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহার সম্প্রসারণে সরকার প্রস্তাবিত প্রণোদনাকে। জ্বালানি পরামর্শক হিসাবে আমি আমার আলোচনা জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টরে সীমিত রাখবো।
সবাই জানাই দেশের সকল খাতের সুষম উন্নয়ন এবং বিকাশে নির্ভরযোগ্য জ্বালানী বিদ্যুৎ নিরাপত্তা একান্ত অপরিহার্য। সরকারকে পরামর্শ দিবো নবায়ন যোগ্য জ্বালানি উন্নয়নে প্রয়োজনীয় প্রণোদনার পাশাপাশি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিজস্ব জ্বালানি বিশেষত কয়লা এবং গ্যাস সম্পদ আহরণের ব্যবস্থা গ্রহণ। বাজেট ভাষণে দেশীয় কয়লা আহরণ এবং উন্নয়ন উল্লেখ ছিল না. গ্যাস আহরণ আর উন্নয়নেও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেয়া হয় নি। জ্বালানি বিদ্যুৎ খাতে উল্লেখিত বরাদ্দের একটি বিরাট অংশ কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতা পরিশোধে প্রয়োজন হবে. সরকার চাইলেই বিদেশী কোম্পানিগুলো জ্বালানি অনুসন্ধানে ঝাঁপিয়ে পড়বে না. ৩.৪ বা ৫ বছরে নবায়ন যোগ্য জ্বালানীর অবদান কাঙ্খিত মাত্রায় বৃদ্ধি পাবে না. আর ২০৩০র মধ্যে উৎপাদিত বিদ্যুতের ২০% অবদান নবায়ন যোগ্য জ্বালানি থেকে আসতে হলে স্রেডা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে. অন্তত আগামী ৫ বছর বাংলাদেশকে উচ্চ মুলা এলএনজি , তরল জ্বালানি ,এলপিজি আমদানী করতেই হবে. বিপিডিবি ,পেট্রোবাংলার বিপুল ঘাটতি শুধু জ্বালানি বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় করে সামাল দেয়া যাবে না. সেই ক্ষেত্রে আমদানিকৃত জ্বালানীর উপর আরোপিত শুল্ক কর কমানো বা পরিহার করতে হবে. বাংলাদেশ ২০৪০ কেন ২০৫০ পর্যন্ত ফসিল ফুয়েল নির্ভরতা থেকে বের হতে পারবে না. ঝুঁকি নিয়ে হলেও কয়লা উত্তোলন করে ব্যবহার করতে হবে.
আবার নবায়ন যোগ্য বিদ্যুতের অবদান বাড়াতে হলে ব্যাক্তিখাতকে যথাযথ প্রণোদনা দিয়ে বিনিয়োগে উৎবুদ্ধ করতে হবে। দেশে সোলার এবং বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সোলার প্যানেল ,ইনভার্টার ,ব্যাটারী উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে ,বিদ্যুৎ চালিত বাহন এবং দেশ ব্যাপী আধুনিক চার্জিং স্টেশন স্থাপনে দেশি বিদেশী যৌথ উদ্যোগকে উৎসাহ দিতে হবে.
আশা করি প্রস্তাবিত বাজেটের উপর সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হবে. আমি চাই দেশে শিক্ষা ,সাস্থ ,কৃষি খাতে সংস্কার আর উন্নয়ন হোক.সামাজিক নিরাপত্তা ব্যাবস্থার উন্নয়ন হোক. কিন্তু পরিপূরক হিসাবে জ্বালানি বিদ্যুৎ থাকে বাস্তবতার নিরিখেই স্বনির্ভর করার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সংস্কার করা হোক.
বাংলাদেশের জন্য অন্তত ২-৩ বছর কিছুটা সংরক্ষণবাদী বাজেট প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করা সমীচীন হবে. ইতিমধ্যে রাজস্ব আহরণ খাতকে ব্যাপক সংস্কার করে কর : জিডিপি কাঙ্খিত হরে বাড়াতে হবে. কর কাঠামোর সংস্কার করে দেশকে স্বনিভর করতে হবে ,রপ্তানি খাতকে বহুমুখী করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে.
শেষ কথা প্রস্তাবিত বিপুল ঘাটতি বাজেটের লাগাম টেনে ধরে বাস্তবায়ন যোগ্য বাজেট অনুমোদন করতে হবে.