15/12/2019
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের একটি ফুটবল দল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত অর্জন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যার্থে অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনী ফুটবল খেলায় অংশ নেয়। এই দলটি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল নামে পরিচিত ছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধকালীন প্রথম ফুটবল দল এটি। ৩৪ জন খেলোয়াড়, সঙ্গে ম্যানেজার এবং কোচসহ সর্বমোট ৩৬ জন নিয়ে গড়া ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিলেন জাকারিয়া পিন্টুসহ অধিনায়ক ছিলেন প্রতাপ শঙ্কর হাজরা। ব্যবস্থাপক ছিলেন তানভীর মাজহারুল ইসলাম তান্না। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠন করা হয়। পরে আরো একজনকে অন্তর্ভুক্ত করলে সদস্য সংখ্যা ৩১ হয়। ২৩ জুলাই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল মুজিবনগর থেকে নদিয়া পৌঁছে। নদিয়ার ডিসি দীপককানত্ম ঘোষ এবং স্পোর্টস এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদকসহ অন্য কর্মকর্তারা দলটিকে অভ্যর্থনা জানান। পরদিন কৃষ্ণনগর স্টেডিয়ামে নদিয়া একাদশের বিপক্ষে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল প্রথম খেলতে নামে। এই দিন মেহেরপুর সীমান্ত এলাকা দিয়ে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ম্যাচ উপভোগ করতে স্টেডিয়ামে আসে। খেলা শুরুর আগে জাতীয় পতাকা নিয়ে মাঠ প্রদক্ষিণ করেন দলের সদস্যরা। এ সময় জাতীয় সঙ্গীতও বাজানো হয়। ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয়। স্বাধীন বাংলা দলের হয়ে প্রথম গোল করেন শাহজাহান।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবল দলের সদস্যরা ছিল দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ। ফুটবলারদের আগ্রাসী মনোভাব ছিল। তারা প্রথমে ছিল মুক্তিযোদ্ধা, পরে ফুটবলার। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার (যা পরবর্তী সময়ে কলকাতায় স্থানান্তরিত করা হয়) শামসুল হককে একটি ক্রীড়া সমিতি গঠনের নির্দেশ দেন। সমিতির প্রথম সেক্রেটারি লুৎফর রহমান, সাবেক ফুটবলার ও কোচ আলী ইমাম এবং সাবেক ফুটবলার সাইদুর রহমান প্যাটেলের সহায়তায় শামসুল হক একটি ফুটবল দল গঠন করার সিদ্ধান্ত নেন। যা বিপ্লবের অগ্রদূত হিসেবে কাজ করে এবং দেশের চরম দুঃসময়ে অর্থ সংগ্রহ ও দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে।
অল ইন্ডিয়া রেডিও ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে থাকা ফুটবলারদের ট্রায়ালের জন্য কলকাতায় শরণার্থী শিবিরের আসার আহ্বান জানায়। কোচ ননি বসাক, অবশেষে ২৫ জন খেলোয়াড়কে ভারত সফরের আগে একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের জন্য মনোনীত করেন।
ক্যাম্পের পর অল্প কয়েকজন দলে যোগ দিয়েছিলেন। কাজী সালাহউদ্দিন ছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিভাধর খেলোয়াড়দের মধ্যে একজন। সালাহউদ্দিন প্রথমে মুক্তিযুদ্ধের জন্য গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। কলকাতার একজন চিত্র সাংবাদিক তাকে ফুটবল দলের ক্যাম্পেইনের কথা জানান।
তিনি তখন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে নিয়মিত খেলতেন এবং পূর্ব পাকিস্তান ফুটবল দলের নেতৃস্থানীয় সদস্য ছিলেন। সালাহউদ্দিন অবিলম্বে ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি প্লেনে করে কলকাতায় দলের সঙ্গে যোগ দেন। এভাবে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের জন্ম। জাকারিয়া পিন্টুকে অধিনায়ক এবং প্রতাপ শঙ্কর হাজরাকে সহ-অধিনায়ক করে দল গঠন করা হয়। এ ছাড়া কাজী সালাহউদ্দিন, নূরন্নবী, সাইদুর রহমান প্যাটেল, আলী ইমাম, গোবিন্দ কুণ্ডু, অমলেশ সেন এবং শেখ আশরাফ আলীর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। জুলাইয়ের শেষের দিকে পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর স্টেডিয়ামে দলটির অভিষেক হয়। ছোট স্টেডিয়ামটিতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় মানুষ গাছ ও দেয়াল টপকে, প্রতিবেশীর ছাদ থেকে খেলা দেখে।
শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয়। এ সময় স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন অস্থায়ী সরকারের প্রতিনিধিরা। এ ম্যাচে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে। বাংলাদেশের একটি ইরেজি দৈনিকে জাকারিয়া পিন্টু বলেন, ‘আমি এখনো সেই দিনটি স্মরণ করতে পারি। আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি হচ্ছে, দেশের বাইরে আমি প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি। এটি বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত।’
তবে পতাকা উত্তোলন করার পেছনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল এবং বেশ বিতর্কও সৃষ্টি হয়েছে। কারণ তখনও ভারত সরকার বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
ভারতীয় কর্মকর্তারা দলকে এমন ভাবমূর্তির মধ্য দিয়ে না যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল। তবে ম্যাচের ঠিক আগেই তারা কিছুটা নমনীয় ভাব পোষণ করে। ভারত সরকার এতে অসন্তুষ্ট ছিল এবং নদিয়া জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করে। বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানোয় নদিয়াকে ভারতীয় ফুটবল এসোসিয়েশন থেকে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। বাংলাদেশের পরবর্তী ম্যাচ ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা ফুটবল দল কলকাতার মোহন বাগানের বিপক্ষে। আগের ম্যাচের বিতর্কের কারণে মোহন বাগান নাম পাল্টে গোষ্ঠ পাল (গোষ্ঠ পাল ছিলেন কিংবদন্তি ভারতীয় ফুটবলার) একাদশের ব্যানারে খেলতে রাজি হয়। যদিও মোহন বাগান ৪-২ গোলের সহজ জয় পায়, তারপরও তাদের ক্যাপ্টেন চুনি গোস্বামী বাংলাদেশের ভূয়সী প্রসংশা করেন।
ম্যাচ শেষে চুনি গোস্বামী বলেছেন, ‘মোহন বাগানের অধিনায়ক হিসেবে আমি চেয়েছিলাম বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য কিছু করতে…এই খেলার প্রতি সম্পূর্ণ সমর্থন দিয়ে আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি।’ ১৫ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে বাংলাদেশ ৪-২ গোলে কলকাতা একাদশকে পরাজিত করে। খেলা শুরুর আগে বাংলাদেশি ফুটবলাররা পাকিস্তানের পতাকা পদদলিত করে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই ঘটনায় ভারত সরকার আতঙ্কিত হয়ে ওঠে।
ইতিহাসবিদ ও লেখক কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, সর্বাধিক মনোযোগ আকর্ষণকারী ম্যাচটি ছিল মুম্বাইতে স্পোর্টস উইক একাদশের বিপক্ষে। স্পোর্টস উইকের সম্পাদক খালিদ আনসারী ম্যাচটি আয়োজনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন। ড্যাশিং ক্রিকেটার মনসুর আলী খান পতৌদি ভারতীয় দলের অধিনায়কত্ব পালন করেন এবং স্পোর্টস উইকের হয়ে একমাত্র গোলটি করেন। ম্যাচটি বাংলাদেশ ৩-১ গোলে জয়লাভ করে। পরে পতৌদি, মুম্বাই গভর্নর এবং বলিউড তারকা দিলীপ কুমার বাংলাদেশের ত্রাণ তহবিলে বিপুল অর্থ দান করে। ম্যাচের টিকেট বিক্রি করে ১৮০০ টাকা সংগ্রহ হয়েছিল এবং সেটিও তহবিলে জমা করা হয়।
বাংলাদেশ তাদের সর্বশেষ ম্যাচটি খেলেছিল পশ্চিবঙ্গ বালুরঘাট একাদশের বিপক্ষে। বাংলাদেশের গেরিলা ক্যাম্পটিও ছিল বালুরঘাটে। খেলা শুরুর আগে খেলোয়াড়রা গেরিলা বাহিনীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে।
বাংলাদেশ একাদশ দিল্লিতে তহবিল সংগ্রহের জন্য আরেকটি ম্যাচ খেলতে যাওয়ার কথা, এমন সময় তারা বহুল প্রতীক্ষিত সংবাদটি পেল- বাংলাদেশ পাকিস্তানের রোষানলমুক্ত একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। এতে সবাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ সব মিলিয়ে ১৬টি ম্যাচ খেলেছিল। যার ১২টিতে জয়, ৩টিতে ড্র এবং একটিতে হেরেছে। প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশি টাকা সংগ্রহ হয়েছিল, তখনকার দিনে এটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তহবিল সাহায্য ছিল। দেশে ফিরলে তাদের বিপ্লবের অগ্রদূত হিসেবে অভিবাদন জানানো হয়। পরে তারা ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ফুটবলে অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন পুরস্কার জিতে নেন এবং মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য বাংলাদেশ সরকার সম্মাননা প্রদান করেন। বাংলাদেশের বাইরে খুব কম লোকই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অবদান সম্পর্কে অবগত আছেন।
শীর্ষ দাসগুপ্তের ‘এ প্লে ফর ইনডিপেনডেন্স : দ্য ফরগোটেন স্টোরি অব বাংলাদেশ ফুটবল রেভ্যুলিউশানারিজ’ অবলম্বনে
15/10/2019
17/07/2019
20/06/2019
11/06/2019
11/06/2019
05/05/2019