03/12/2025
ক্রিকেট তো দেখি সব দেশেই, কিন্তু নিউজিল্যান্ডে ম্যাচ মানেই চোখের সামনে যেন প্রকৃতি আর খেলাধুলার এক স্বর্গীয় মিশ্রণ।
গ্যালারি নেই বললেই চলে—আর যেটুকু আছে, সবটাই যেন সবুজ পাহাড়, ছায়াঘেরা গাছ আর খোলা আকাশের সাথে একীভূত।
মাঠের চারপাশে দর্শকদের বসে থাকা, ঘাসের ওপর রৌদ্রস্নান করতে করতে ম্যাচ দেখা—এটাই নিউজিল্যান্ডকে আলাদা করে দেয়।
উপর থেকে ক্যামেরার ড্রোন শট দেখলে মনে হয়,
ক্রিকেট যেন শহরের মাঝের এক টুকরো পরিপাটি সবুজ কবিতা!
আর একটা কথা না বললেই নয়—
নিউজিল্যান্ডের টিভি গ্রাফিক্স, ম্যাচ কাভারেজ, রিপ্লে-এঙ্গেল, কালার-গ্রেডিং—সবকিছুই টপ ক্লাস।
ব্যাট-বলের সাথে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে যেভাবে ব্লেন্ড করে দেখায়—এটা সত্যিই আর্ট।
বিশেষ করে দিন-আলোতে ম্যাচগুলো তো HD নয়, যেন চোখে “বাস্তবের থেকেও সুন্দর” ভার্সন!
সত্যি বলতে—
এমন স্টেডিয়ামে ক্রিকেট হলে, খেলা না দেখলেও শুধু মাঠটাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখে থাকা যায়।
নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট মানেই রিল্যাক্সেশন + নেচার + পিওর জেন্টলম্যান স্পোর্টস ভাইব
Salute NZ Cricket — nature, class, and world-standard presentation!
03/12/2025
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চে আজকের দিনটি এক অনন্য স্মৃতি বহন করে। ১৯২৮ সালের ৩০ নভেম্বর, অর্থাৎ এই দিনে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আবির্ভাব হয়েছিল সেই মানুষটার, যিনি শুধু রান করেননি, ক্রিকেটকে নিজের নামের সঙ্গে নতুন ব্যাখ্যা উপহার দিয়েছিলেন। স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের অভিষেক ছিল যেন কোনও সাধারণ ঘটনার ধারাবাহিকতা নয়, বরং এক মহাকাব্যের প্রথম অধ্যায়। অস্ট্রেলিয়ার সাদা জার্সিতে তার প্রথম পদচিহ্নেই লুকিয়ে ছিল ভবিষ্যতের সেই ঝলক, যে ঝলক পরবর্তীতে ক্রিকেটকে বদলে দেবে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্টেজে দাঁড়িয়ে ব্র্যাডম্যান তখনও জানতেন না, তিনি চিরকালীর অংশ হয়ে উঠছেন।
তার পরের ইতিহাসটা এমন, যা ক্রিকেটপ্রেমীরা আবেগের সঙ্গে মুখস্ত করে রাখে। প্রতিটি ইনিংস ছিল যেন নিখুঁত গণিত, আর প্রতিটি শট ছিল শিল্পীর স্পর্শে আঁকা। তার ব্যাটিং গড় আজও অবিশ্বাস্য এক রহস্য, যা মানব সামর্থ্যের সীমানাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ব্র্যাডম্যান প্রমাণ করেছিলেন, পরিসংখ্যান কখনও কখনও শুধু সংখ্যা নয়, ইতিহাসের ভাষায় লেখা কবিতা। তার ব্যাট থেকে জন্ম নিয়েছিল ক্রিকেটের শুদ্ধতা, সৌন্দর্য আর অতুলনীয়তা। অভিষেকের এই দিনে তাই শুধু একজন খেলোয়াড়কে নয়, ক্রিকেটের চিরন্তন প্রতীককে সম্মান জানানো হয়।
21/11/2025
কোন ক্রিকেটার সব থেকে ভারী ব্যাট নিয়ে খেলে? এই প্রশ্ন বারংবার উঠে থাকে। সব থেকে বেশি ভারী ব্যাট নিয়ে খেলে এই সমস্ত ক্রিকেটাররা।
শচীন তেন্ডুলকার একটি খুবই ভারী ব্যাট নিয়ে খেলতেন, একই রকমের ভারী ব্যাগ নিয়ে খেলতেন বীরেন্দ্র শেহবাগ এবং ক্রিস গেইল।
সেই যুগে ব্যাট এতটাও ভালো কোয়ালিটি হত না যার জন্য ভারী ব্যাট নিয়ে খেলতে এই ক্রিকেটাররা বাধ্য হতো, কিন্তু বর্তমান সময়ের হালকা ব্যাটও বড় শট খেলার জন্য খুবই যথেষ্ট।
আপনার কি মনে হয় ব্যাটের ওজনের উপর নির্ভর করে শট কতটা সফল এবং শটের উপর জোর কতটা শক্তিশালী হতে পারে ?
21/11/2025
২০০৯ সালের এই দিনটিতে ক্রিকেটের আকাশে এমন এক মুহূর্ত নেমে এসেছিল যা প্রায় পৌরাণিক বলেই মনে হয়। আহমেদাবাদের সর্দার প্যাটেল স্টেডিয়ামের মাটিতে, ভারতের আর শ্রীলঙ্কার প্রথম টেস্টের শেষ দিনে, কোনও ঘোষণা ছিল না, কোনও নাটকীয়তা ছিল না—শুধু ছিল এক সাধকের নিঃশব্দ যাত্রার আরেকটি সোনালি বাঁক।
৪৪তম ওভার। বল হাতে চনাকা ওয়েলেগেদারা। হালকা ইন-সুইং, অফ-স্টাম্পের বাইরে পিচ করে ভিতরে ঢুকলো। আর সেই বলটিকে সুভার্ণ স্পর্শে ক্লিপ করে দিলেন একজন—যেন কোনও কবি কলম চালাচ্ছেন নিজের অভ্যাসে। ডিপ স্কোয়ার লেগে বল গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি হালকা দৌড়ে তুলে নিলেন একটি সিঙ্গেল।
মাত্র এক রান। ইনিংসে তাঁর ৩৫তম রান।
কিন্তু সেই সিঙ্গেলটি ছিল এক ইতিহাসের বোঝা বহনকারী—৩০,০০০ আন্তর্জাতিক রান।
একটি সংখ্যা যা আগে কেউ ছুঁতে পারেনি, পরে কেউ ছুঁয়েও উঠতে পারেনি।
তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল—
১২,৭৭৭ টেস্ট রান,
১৭,১৭৮ ওয়ানডে রান,
আর সেই একমাত্র টি-টোয়েন্টির ১০ রান।
এ যেন তিনটি ভিন্ন নদী এসে এক সাগরে মিলছে—আর সেই সাগরের নাম সচিন রমেশ তেন্ডুলকার।
---
কিন্তু তিনি থামেননি—কারণ তিনি সচিন
এই দিনটিতে গল্প এখানেই শেষ হয়নি।
সারা দিন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে লড়াই করে, উইকেটের মেজাজ বুঝে, সময়কে নিজের অনুকূলে এনে, দিনের শেষ বিকেলে আবার শোনা গেল—দর্শকদের বজ্রধ্বনি।
কারণ তিনি তুলে ফেলেছেন আরেকটি শতরান—
এটি তাঁর ৮৮তম আন্তর্জাতিক শতক, আর টেস্টে ৪৩তম।
তিনি অপরাজিত ছিলেন ১০০ রানে।
ম্যাচ ড্র হয়েছিল—কিন্তু তাঁর ব্যাটিং ছিল যেন সময়কে স্থির করে দেওয়া এক দৃশ্য।
---
এক মহাসাগর—এক ২৪ বছরের যাত্রা
১৯৮৯ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ডেবিউ করা সেই ১৬ বছরের কিশোরটি ২০০৯-এ এসে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছাল, যা ভাষায় ব্যাখ্যা করা কঠিন।
এ পথে তিনি গড়েছেন—
অসংখ্য রেকর্ড,
অসংখ্য প্রতিপক্ষের রাতের ঘুম হারাম করা কভার ড্রাইভ,
প্রজন্মের পর প্রজন্মের ক্রিকেটার তৈরির অনুপ্রেরণা,
আর এক দেশের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে জায়গা।
আর যখন ২০১৩ সালে সেই গল্পের শেষ পাতা লেখা হলো, তখন তাঁর আন্তর্জাতিক রান থেমে দাঁড়াল—
৩৪,৩৫৭ রানে।
ক্রিকেটের ইতিহাসে এটি এক অদৃশ্য পর্বতশৃঙ্গ, যা কেবল তিনি-ই নির্মাণ করেছিলেন—
একটি করে বল, একটি করে রান, আর কখনও কখনও—
একটি করে নিঃশব্দ সিঙ্গেল দিয়ে।
---
শেষে শুধু এইটুকুই—
সচিন তেন্ডুলকারকে বুঝতে গেলে শুধু সংখ্যার দিকে তাকালে চলবে না।
তাঁর প্রতিটি রান, প্রতিটি স্ট্রোক, প্রতিটি হাঁটা—
বয়ে এনেছে এক জাতির স্বপ্ন, এক খেলার মহিমা,
আর এক মানুষের নিষ্ঠা, অধ্যবসায় ও অটল সাধনার উপাখ্যান।
৩০,০০০-এর সেই সিঙ্গেলটি তাই শুধু একটি রান নয়—
এটি সময়ের বুকের ওপর খোদাই করে রাখা এক চিহ্ন,
যা ক্রিকেটের ইতিহাসে চিরকাল জ্বলে থাকবে।
08/11/2025
২০২৩ বিশ্বকাপের ৭ নভেম্বরের রাতটা যেন এক অলৌকিক গল্প। আফগানিস্তানের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস যখন ধ্বংসস্তূপে, তখন কেউ ভাবেনি এই ম্যাচের শেষটা ক্রিকেট ইতিহাসের সোনালী পাতায় লেখা থাকবে। ৯১ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে কার্যত পরাজয়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েছিল দল। কিন্তু তখনও ক্রিজে ছিলেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল, তবুও বেশিরভাগ ক্রিকেট ভক্ত অস্ট্রেলিয়ার পরাজয় নিশ্চিত ভেবে টিভি সেটের সামনে থেকে উঠে যেত লাগলো, স্টেডিয়ামে থাকা দর্শকরাও বেরিয়ে যাওয়ার জন্য উপক্রম করছিল। তবে তখনো কিছু ক্রিকেট পাগল মানুষ এটাই ভাবছিল যে, দেখি গ্ল্যান ম্যাক্সওয়েল থাকা পর্যন্ত কি ঘটে, তার ইনিংস টা দেখেই যাই! কিন্তু কে জানতো, সেদিন অস্ট্রেলিয়ান বিগ শো ক্রিকেট বিশ্বকে উপহার দিতে যাচ্ছিল ওয়ানডে ক্রিকেটে ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ইনিংসটি।
সেদিনের ম্যাক্সওয়েলের ইনিংসটা যেন মানসিক শক্তি আর ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য উদাহরণ। পেশীতে টান খেয়ে মাঠে পড়ে গেলেও তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন, আবার ব্যাট তুলেছেন, আবার ছক্কা হাঁকিয়েছেন। প্রতিটি শট যেন ছিল একেকটা বার্তা “আমি হার মানব না।” চোখের সামনে ব্যথা, শরীর কাঁপছে, কিন্তু মাথা শান্ত, লক্ষ্য স্পষ্ট জয়। এমন দৃঢ়তা ক্রিকেট খুব কমই দেখেছে। সেদিন ম্যাক্সির প্রতিটি ছক্কা, প্রতিটি স্ট্রোকে মিশে ছিল অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্যের গল্প।
৭ উইকেট চলে যাওয়ার পর শেষ স্বীকৃত ব্যাটসম্যান হিসেবে ম্যাক্সওয়েল তখন বোলার প্যাট কামিন্সকে সঙ্গে নিয়ে এক অসম্ভব কাজ শুরু করেন। দুজনের মধ্যে হয় ২০২* রানের পার্টনারশিপ, যেখানে কামিন্স করেন মাত্র ১২ রান, বাকি সবটাই ম্যাক্সওয়েলের ব্যাট থেকে, ভাব যায়! এ যেন এক একক নাটক, একক মহাকাব্য। তিনি যেন একাই লড়ছিলেন গোটা আফগানিস্তান বোলিং ইউনিটের বিরুদ্ধে। যার শরীর তখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে, পেশীতে টান, হাঁটতেও কষ্ট। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার ভাগ্য তখন একাই বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল সেই এক পাগলাটে প্রতিভা, যে কখনো হাল ছাড়ে না। ফিল্ডারদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল ছক্কা, বল পড়ছিল বাউন্ডারির বাইরে, আর দর্শকরা বুঝে গিয়েছিল আজকের দিনটা ইতিহাস হয়ে থাকবে।
শেষ পর্যন্ত ২০১* রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলে অপরাজিত থেকে অস্ট্রেলিয়াকে অসম্ভব ও অকল্পনীয় এক জয় এনে দেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। সেই ইনিংস কেবল রান কিংবা রেকর্ডের গল্প নয়, সেটি ইচ্ছাশক্তির, সাহসের, এবং ক্রিকেটের সৌন্দর্যের প্রতীক। ক্রিকেটে শত বছরে হয়তো একবার এমন ইনিংস দেখা যায়, যেখানে ব্যথা, ক্লান্তি, ভাগ্য আর প্রতিভা একত্রে মিশে যায়। সেই দিন ক্রিকেট জানল, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল “বিগ শো” শুধু নামেই নয়, কাজেও সত্যিকারের শোস্টপার।
গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের সেই ইনিংসকে যদি কেউ সর্বকালের সেরা ওডিআই ইনিংস বলে দাবি করে, তাতে তর্কের খুব বেশি অবকাশ নেই। কারণ এটি ছিল শুধু রানের গল্প নয়, ছিল মানসিকতা, সাহস আর ইচ্ছাশক্তির এক চূড়ান্ত প্রদর্শন। ৯১ রানে ৭ উইকেট হারানোর পর, পেশীতে টান খেয়ে হাঁটতেও না পারা অবস্থায় ২০১* রানে দলকে জয় এনে দেওয়া, এমন কিছু ক্রিকেট ইতিহাসে প্রায় শোনা যায় না। পরিস্থিতি, প্রতিপক্ষ, মাঠের চাপ, শরীরের অবস্থা, সব কিছু ম্যাক্সওয়েলের বিপক্ষে ছিল, তবুও তিনি জয় ছিনিয়ে এনেছেন শিয়ার ডিটারমিনেশন দিয়ে। পরিসংখ্যান, প্রেক্ষাপট আর প্রভাব, সব দিক থেকেই এই ইনিংস সেই একমাত্র, যেটিকে “সর্বকালের সেরা” বললে ক্রিকেট নিজেই সম্মতি দেয়।
07/10/2025
এই লেখাটা যাকে নিয়ে, তিনি তার যাবতীয় ক্রিকেটমাধুর্য্য সমেত অনেকটাই জায়গা করে নিয়েছেন তিনি জাহির।
কিন্তু তিনি কোন্ জাহির?
যারা আমার চেয়েও অনেকটাই প্রবীণ তথা প্রাচীন, কোন ক্রিকেটাড্ডায় এই নামটা উচ্চারণ করলেই তারা আব্বাস পদবীধারী এক পাকিস্তানী শিল্পী ব্যাটার-ক্রিকেটারকে দেখতে পান চোখের সামনে, যিনি তার ব্যাটের স্ট্রোকের আলোয় অন্ধকার করে দিতেন বোলারদের মাঠজীবন। আর যারা আমার চেয়ে অনেকটাই নবীন তথা আধুনিক, কোন ক্রিকেটাড্ডায় এই নামটা উচ্চারিত হলেই তারা খান পদবীর এক ভারতীয় বোলার-ক্রিকেটারকে দেখে ফেলেন চোখের সামনে, যিনি তার স্যুইংয়ের ঠেলায় দুর্বিষহ করে দিতেন ব্যাটারদের ব্যাটিংজীবন।
আর এই দুইয়ের মধ্যে পেন্ডুলামের মত দোদুল্যমান হয়ে থাকে আমার সমসাময়িক প্রজন্ম, যারা ওই দুজনের ক্রিকেটই অনেকটাই দেখে ফেলেছেন আর মোহিত হয়ে আছেন দুজনের খেলাতেই।
মহারাষ্ট্রের আহমেদনগর জেলার শ্রীরামপুর শহরে ৭ অক্টোবর, ১৯৭৮ তারিখে জন্মেছিলেন এই লেখার বার্থডে বয় জাহির খান। ছোটবেলাতেই মুম্বাইয়ের একটি ছোট্ট হাসপাতাল কোয়ার্টারে “শিফ্ট” করে যান তিনি, যে হাসপাতালে কাজ করতেন তার বাবার এক আন্টি।আজ ৪৭য়ে পা দেওয়া এই ক্রিকেটার পরে ভারতের পেস বোলিংয়ের জয়পতাকা বহন করেছিলেন ১৪ বছর ধরে। সেই ছোট্ট হাসপাতালের কোয়ার্টারটাই ভারতীয় পেসবোলিংয়ের এক লড়াকু সফল যোদ্ধার আঁতুড়ঘর হিসেবে চিহ্ণিত হয়ে আছে ইতিহাসে। আমরা সফলতাটা চোখের সামনে দেখতে পাই, কিন্তু পর্দার পিছনে থেকে যায় সাফল্যের পিছনের একমুখী, নিরলস অধ্যবসায়।
১৯৯৬ নাগাদ, প্রবীণ কোচ সুধীর নায়েক ছিলেন ১৮ বছর বয়সী তার প্রথম গুরু। একটি কাপড়ের মিলে তাকে পাঁচ হাজার টাকা মাসমাইনের একটি চাকরি জুটিয়ে দেন কোচ সুধীর নায়েক, যিনি তার মধ্যে দেখেছিলেন গতিময় পেসবোলিংয়ের অনন্ত সম্ভাবনা।অধিকাংশ দিন প্রাতরাশ হত না তার, যা হেরে যেত তার ইচ্ছেশক্তির কাছে। তিন বছর এন সি এ-তে নিবিড় ঘষামাজা এবং পরে চেন্নাইতে টি এ শেখরের এম আর এফ পেস একাডেমিতে (যার প্রতিষ্ঠার সময়ে যুক্ত ছিলেন ডেনিস লিলি) প্রশিক্ষণ নেওয়া তাকে নিয়ে ফেলে রণজি ট্রফির ঘেরাটোপে। ১৯৯৮তে এম আর এফ পেস একাডেমিতে তাকে পাঠানোর পিছনেও ছিলেন সুধীর নায়েক। পেস, স্যুইং, ইয়র্কার আর রিভার্স স্যুইংয়ের এই নায়ককে পাওয়ার জন্য ভারতীয় ক্রিকেট আজীবন সুধীর নায়েকের কাছে ঋণী থাকবে।
১৯৯৯-২০০০ মরশুমে বরোদার হয়ে তার রণজি অভিষেক হয়। ২০০৫-০৬ অবধি তাদের হয়েই রণজি-তে খেলেন তিনি। ২০০০-০১য়ের রণজি ফাইনালে রেলওয়েজ-কে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় বরোদা এবং ম্যাচপুরুষ হন তিনি, ২য় ইনিংসে ৫ উইকেটসহ ম্যাচে ৮/১৪৫ বোলিং ফিগারের জন্য। মোট ৫ বার রণজি ট্রফি জয়ী দলের সদস্য ছিলেন তিনি। ২০০০-০১য়ে বরোদার হয়ে আর ২০০৬-০৭, ২০০৮-০৯, ২০০৯-১০ আর ২০১২-১৩তে মুম্বাইয়ের হয়ে।কাউন্টি ক্রিকেটেও ২০০৪য়ে সারে-র হয়ে আর ২০০৬য়ে উরস্টারশায়ার-এর হয়ে খেলেছেন তিনি। ১৬৯ প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে তার নেওয়া উইকেট সংখ্যা ছিল ৬৭২। ১০০ আইপিএল ম্যাচে তার উইকেটসংখ্যা ছিল ১০২।
শ্রীনাথের গোধুলিবেলায় এই ক্রিকেটারের জন্য সৌরভ গাঙ্গুলীর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের দরজা খুলে দিয়েছিলেন তৎকালীন নির্বাচকরা। ৩রা অক্টোবর ২০০০ তরিখে, তার ২২ বছর পূর্ণ হবার আগেই এক তাজা ফুলের আঘ্রাণ পেয়ে যায় ভারতীয় ক্রিকেট। যে সুগন্ধ ভারতের পেস বোলিংকে ছুঁয়ে থেকে স্নিগ্ধ রেখেছিল বহুদিন যাবত। গ্রেগ চ্যাপেলের কোচিংয়ের সময়ে কিছুদিন চোট আর অবিচারের জন্য বাইরে থাকা বাদ দিলে ২০০০য়ের পরের ১৪ বছরে কার্যত তিনিই টেনেছেন ভারতের পেস আক্রমণকে। ঐ ১৪ বছরে আশিস নেহরা, অজিত আগরকার, শান্তাকুমারণ শ্রীসন্থ, মুনাফ প্যাটেল, ইরফান পাঠান, রুদ্রপ্রতাপ সিংয়েরা এসেছেন, গেছেন আবার এসেছেন ভারতীয় দলে, কিন্তু উল্টো দিকে তিনি ছিলেন সুদৃঢ় স্তম্ভর মত। তার পেস, স্যুইং, ইয়র্কার আর রিভার্স স্যুইং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘাতক হয়ে ওঠে। সে সময় বিশ্বজুড়ে ওড়া ভারতীয় পেসবোলিংয়ের জয়পতাকা অনেকটাই বহন করেছেন জাহির খান।
২০০৩, ২০০৭ আর ২০১১র বিশ্বকাপ খেলা তিনি শেষবার ছিলেন চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য। ২০১১ বিশ্বকাপে তার এক একটা স্পেল কঠিন সময়ে উতরে দিয়েছিল ভারতকে। ২৩টি বিশ্বকাপ ম্যাচে ৪৪টি উইকেট আছে তার দখলে। পরিসংখ্যান জানায় যে ৯২ টেস্টে তার ৩১১ উইকেটের পাশাপাশি ১২৩০ রানও ছিল। ৭/৮৭ আর ১০/১৪৯ ছিল সেরা টেস্ট বোলিং, ইনিংস আর ম্যাচপ্রতি। তার টেস্টে সর্বোচ্চ ৭৫ রান ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। ২০০ ওডিআই-তে তার ছিল ২৮২ উইকেট আর ৭৯২ রান। ৫/৪২ ছিল তার সেরা ওডিআই বোলিং। তার টেস্টে সর্বোচ্চ ৭৫ রান ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। ১৭টি টি২০ ম্যাচে তার নেওয়া উইকেটসংখ্যা ১৭। তার মোট আন্তর্জাতিক উইকেটের সংখ্যা ছিল ৬১০।
বল ডেলিভারির আগে এই বাঁহাতি পেসারের দুরন্ত লাফটা আজও খুব মিস করি।ঐ লাফটা তার কেরিয়ারের শুরুর দিকে একটা স্বপ্নসম সময়ের প্রতিনিধিত্ব করত। গড়াপেটা থেকে ভারতীয় ক্রিকেটকে মুক্ত করার সৌরভ-শচীন-রাহুলদের মিশনে যে কয়েকজন তরুণ প্রতিভা তাদের প্রাণপণ অবদান রেখেছিলেন ঐ সময়টাতে, তাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। তার ৪৭তম জন্মদিনে তাকে কুর্নিশ জানাই। ভাল থাকুন তিনি ব্যক্তিগত জীবনে, স্ত্রী সাগরিকা ঘাটগে এবং পরিবারসমেত।
শুভ জন্মদিন, কোনদিনও নিজেকে "জাহির না করে"ই ভারতের পেস বোলিং ইতিহাসের পাতায় ঢুকে যাওয়া জাহির খান।❤❤
04/10/2025
‘চাইলেই ছয়টা বল ছয়রকম করতে পারেন’ ওয়াসিম আকরাম সম্পর্কে সবসময়ই এই কথাটা প্রচলিত ছিল। পুরনো বলে রিভার্স সুইং করার এক আশ্চর্য ক্ষমতাও ছিল তাঁর। সেজন্যই স্লগ ওভারে আকরাম ছিলেন ক্যাপ্টেনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বোলার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৮ বছর পার করলেও গতি নিয়ে খুব বেশী ভাবতে হয়নি তাঁকে। বরং এরই সাথে স্লোয়ার আর সুইংয়ের অন্তর্ভুক্তি তার কার্যকারিতা বাড়িয়ে দিয়েছিলো বহুগুণে।
ছোটবেলায় ওয়াসিমের আগ্রহ ছিল টেবিল টেনিসে। শখের বশে ক্রিকেটটা খেলতেন। দশ বছর বয়স থেকে তিনি তাঁর ক্রিকেট প্রেমী দাদার সাথে থাকতেন। দাদার ক্রিকেটের প্রতি এত আগ্রহ দেখে তার নিজেরও ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। শুরুতে স্থানীয় ক্লাবে খেলা শুরু করেন। শুরুর দিকে তো ক্লাবের একাদশে সুযোগই পেতেন না। পরবর্তীতে লাহোরে আয়োজিত একটা ক্রিকেট ক্যাম্পে বোলিংয়ের অডিশন দিতে যান। প্রথম দুই দিন বোলিং করার সুযোগ পাননি, কিন্তু তৃতীয় দিনে বোলিং করে চোখে পড়েন সাবেক পাকিস্তানি ক্রিকেটার নির্বাচক হাবিব আহসানের। তৎকালীন পাক অধিনায়ক জাভেদ মিঁয়াদাদও প্র্যাকটিসে বোলিং দেখে ওয়াসিমের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁকে দলে নেওয়ার ব্যাপারে রাজি হয়ে যান।
১৯৮৫ সালে ইডেন পার্কে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টে তাঁর আন্তর্জাতিক অভিষেক ঘটে। সেই টেস্টে মাত্র দু’টি উইকেট পান, দলও হারে ইনিংস ব্যবধানে। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টের দুই ইনিংসেই পান ফাইফার। সবচেয়ে কম বয়সী বোলার হিসেবে টেস্টে দশ উইকেট পাওয়ার কীর্তি গড়েন ওয়াসিম। অবশ্য পরবর্তীতে বাংলাদেশী এনামুল হক জুনিয়র এই রেকর্ড ভেঙেছিলেন। সেই থেকেই ওয়াসিম পাকিস্তান দলের নিয়মিত অংশ হয়ে যান। সূচনা হয় তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের।
এমন খুব অল্প খেলোয়াড়ই আছেন যাঁরা টেস্ট আর ওয়ানডে দুই ফরম্যাটেই সফলতার সাথে দীর্ঘদিন ক্যারিয়ার চালিয়ে যেতে পেরেছেন। এই দুই ফরম্যাটেই ন্যূনতম ৪০০ উইকেট পেয়েছেন শুধুমাত্র মুত্তিয়া মুরালিধরন এবং ওয়াসিম আকরাম। ৩৮ ম্যাচে ৫৫ উইকেট নিয়ে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি ছিলেন ওয়াসিম। এই রেকর্ড পরবর্তীতে ভাঙ্গেন আরেক গ্রেট গ্লেন ম্যাকগ্রা।
প্রায় সব বোলারই হ্যাটট্রিক করার কীর্তি গড়তে চান। ওয়াসিম আকরাম হচ্ছেন একমাত্র বোলার, যার টেস্ট এবং ওয়ানডে দুই ফরম্যাটেই দু’টি করে হ্যাটট্রিক রয়েছে। এর মাঝে ওয়ানডের দু’টো হ্যাটট্রিক সরাসরি বোল্ড করার মাধ্যমে। প্রথম বোলার হিসেবে ওয়ানডে ক্রিকেটে ৫০০ উইকেট লাভ করেছিলেন ওয়াসিম, পরবর্তীতে মুরালিধরন তার রেকর্ড ভাঙলেও আর কোনো ফাস্ট বোলার এই রেকর্ডের ধারেকাছেও এখনো যেতে পারেননি।
বিরানব্বই বিশ্বকাপের ফাইনালে ইমরান খান যখন আউট হলেন, তখন মাঠে নামার কথা নিয়মিত ব্যাটসম্যান সেলিম মালিক কিংবা ইজাজ আহমেদের। কিন্তু গ্রেট ইমরান তরুণ ওয়াসিমের মধ্যে এমন কিছু দেখেছিলেন যার কারণে সে সময় মাঠে নামালেন ২৫ বছরের ওয়াসিমকে যিনি কিনা তখন বোলার হিসেবেই ছিলেন পরিচিত। চলমান বিশ্বকাপের ফাইনালের আগপর্যন্ত ওয়াসিমের সংগ্রহ ছিলো ৭ ইনিংসে মাত্র ২৯ রান। কাপ্তানের আস্থার প্রতিদান দিতেই বোধহয় মাঠে নেমে সেদিন ওয়াসিম আকরাম হয়ে গেলেন পুরোদমে ব্যাটসম্যান। ঝড়ো গতিতে মাত্র ১৯ বলে ৩৩ রানের একটা ক্যামিও খেললেন। তখনকার সময়ে ২৩০-২৪০ চ্যালেঞ্জিং স্কোর ছিলো। ওয়াসিমের এই রানের সুবাদে পাকিস্তান ২৪৯ রান করে ইংল্যান্ডকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলো।
বোলিংয়ে এসে শুরুতেই ইংল্যান্ড ওপেনার ইয়ান বোথামকে আউট করলেন। শুরুর চাপ সামলাতে না পেরে ৬৯ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বসে ইংল্যান্ড। দরকার ছিলো বড় একটা পার্টনারশিপের। সেখান থেকে ফেয়ারব্রাদার আর অ্যালান ল্যাম্ব ৭২ রানের একটা জুটি গড়ে প্রাথমিক বিপর্যয় সামাল দেন। ম্যাচে ফিরতে পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল একটা ব্রেকথ্রু, এবং ল্যাম্বকে অফ কাটারে বোল্ড করে সেই কাজটা করলেন সেই ওয়াসিম আকরামই। এরপর ক্রিস লুইসকে আবারও বোল্ড করলেন বিশাল এক ইনসুইংয়ে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জোড়া ডেলিভারি যে নেই, সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। শেষ পর্যন্ত ২২৭ রানে অল আউট হয় ইংল্যান্ড। ২২ রানে ম্যাচটি জিতে পাকিস্তান হয় প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ম্যান অফ দ্যা ফাইনাল নির্বাচিত হয়ে সেদিন পাকিস্তানের প্রথম ও একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক ছিলেন ওয়াসিম আকরাম। সেবার ১৮ উইকেট শিকার করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেটের মালিকও ছিলেন তিনি। পাকিস্তানের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের মূল কৃতিত্ব সবাই ইমরান খানের অধিনায়কত্বকে দিলেও ইমরানের সেই যুদ্ধের অন্যতম সেনানী যে ওয়াসিম আকরাম ছিলেন সেটা অস্বীকার করতে পারবে না কেউই।
লোয়ার অর্ডারে ব্যাট হাতে যথেষ্ট কার্যকরী ছিলেন ওয়াসিম। টেস্টে তাঁর তিনটি সেঞ্চুরি রয়েছে যার মধ্যে একটি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে করেছিলেন। টেস্টে ওয়াসিমের সর্বোচ্চ রানের ইনিংস হচ্ছে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২৫৭ রানের ইনিংস, যা আট নম্বর ব্যাটসম্যান হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ। এছাড়া সেই ইনিংসেই ১২টি ছক্কা মেরেছেন, যা কিনা এক ইনিংসে সবচেয়ে বেশি ছক্কা মারার রেকর্ড। পাকিস্তানি অধিনায়ক হিসেবে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ডও এটাই।
এছাড়া ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রায়ই লোয়ার অর্ডারে নেমে ছোটখাটো ক্যামিও খেলে পাকিস্তানকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জয় এনে দিয়েছেন। ১৯৮৯ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত নেহেরু কাপের ফাইনালে যখন শেষ দুই বলে প্রয়োজন ছিল ৬ রান, ওয়াসিম প্রথম বলেই ছক্কা মেরে পাকিস্তানকে এনে দিয়েছিলেন ঐতিহাসিক জয়।
গ্রেট ইমরান খান প্রায়ই আক্ষেপ করে বলতেন, ওয়াসিম যদি ব্যাটিং নিয়ে সিরিয়াস হতেন তাহলে একজন গ্রেট অলরাউন্ডারে পরিণত হতে পারতেন। ওয়ানডে ক্রিকেটে ৬টি ফিফটির সাহায্যে ৩৭১৭ রান নিয়ে ওয়াসিম আছেন ওয়ানডেতে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ১৬ তম। টেস্ট ক্রিকেটে ৩টি সেঞ্চুরি, এক ডাবল সেঞ্চুরি আর ৭টি ফিফটির সাহায্যে ২৮৯৮ রান করা ওয়াসিম কোনো অলরাউন্ডারের চেয়ে কম ছিলেন না কোনো অংশে।
অনেক গ্রেট খেলোয়াড়ই ওয়াসিম আকরামকে সর্বকালের সেরা ফাস্ট বোলার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেস খ্যাত শোয়েব আখতারের মন্তব্য হয়তো সেটার সত্যিকারের সামর্থ্যটা ফুটিয়ে তোলে। তিনি বলেছিলেন,
‘ওয়াসিম আকরাম চাইলেই আমার মতো ১০০ জন বোলার তার জুতোর ধুলো থেকে তুলে আনতে পারে। এটাই তাঁর ক্লাস।’
ওয়াসিম সম্পর্কে গ্লেন ম্যাকগ্রার বক্তব্য ছিল,
‘আমার কাছে ওয়াসিম আকরাম হচ্ছেন সর্বকালের সেরা বোলারদের একজন। একজন বাঁহাতি, যিনি কিনা দুই দিকেই সুইং করাতে পারতেন। নতুন এবং পুরনো বল দুটো দিয়েই তিনি বিপদজনক ছিলেন’।
রবি শাস্ত্রী বলেছিলেন,
‘হি ওয়াজ ক্যাপটেন’স ডেলাইট। লারা, টেন্ডুলকার, শেন ওয়ার্ন ছিল, ছিল স্টিভ ওয়াহও। তবুও নব্বইয়ের দশকে সেরা ক্রিকেটার ওয়াসিম আকরাম – এ বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।’
বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে অনেক গ্রেট প্লেয়ার এসেছেন এবং আগামীতেও আসবেন। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে আগে কোনোদিন ওয়াসিম আকরাম আসেননি আর আগামীতেও আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। লারা, টেন্ডুলকারের মতো গ্রেট ব্যাটসম্যানদেরকে নাকানিচুবানি খাওয়ানো ওয়াসিম আকরাম ছিলেন একজনই; যিনি সকলের চোখে সর্বকালের সেরা। সবাই যাঁকে এক নামে চেনে 'সুলতান অফ সুইং'!
14/09/2025
ক্রিকেট বিশ্বে এমন বিরল ঘটনা কেবলমাত্র একবারই ঘটেছে। যেখানে একজন বোলার হ্যাট্রিক করতে তিন ওভার, দুই ইনিংস এবং দুই দিন সময় নিয়ে তিনি তার হ্যাট্রিক পূর্ণ করেছেন।
এই কীর্তিটি গড়েছেন অস্ট্রেলিয়ার বোলার মার্ভ হিউজেস। ১৯৮৮ সালে অস্ট্রেলিয়া বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট ম্যাচে প্রথম ইনিংসে দিনের শেষ ওভারের শেষ বলে একটি উইকেট নেন। এরপর দ্বিতীয় দিনে তার প্রথম ওভারের প্রথম বলেই তিনি তার দ্বিতীয় উইকেট নিলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৪৪৯ রানে অলআউট হয়ে যায়। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসের শুরতে সে প্রথম ওভারের প্রথম বলেই আবার উইকেট নিলে দীর্ঘ সময় নিয়ে তার হ্যাটট্রিকটি সম্পূর্ণ হয়। একমাত্র অদ্ভুত এক রেকর্ড ইতিহাসের পাতায় আজও অক্ষুণ্ণ আছে।
08/09/2025
।।ভিভ-শচীনের ইডেন।।
ভিভ আর শচীন বোলিংয়েও কম যেতেন না। যথেষ্ট উইকেট আছে। ম্যাচ জেতানো বোলিংও করেছেন। তবু ওরা দলের প্রধান বোলার ছিলেন না। যদিও দলের প্রয়োজনে বল হাতে নিতেও দ্বিধা করেন নি কখনও। এভাবেই ওঁদের বোলারের ভূমিকায় দেখেছিলো ইডেন। দু'টিই টানটান ম্যাচ। প্রথমটা নেহরু কাপ ফাইনাল,১৯৮৯। পাকিস্তানকে জিততে হ'লে শেষ ওভারে ৬ রান করতে হবে। মার্শাল-অ্যাম্ব্রোজ-ওয়ালশ-বেঞ্জামিন নন,বল হাতে ক্যারিবিয়ান অধিনায়ক ভিভ। ইমরানের মতন বিগ হিটার সামনে থাকলেও পিছিয়ে আসেন নি। বুদ্ধিদীপ্ত স্পিনে ৪ বলে ৩ রান দিয়ে ম্যাচেই রেখেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। ৫ম বলে আক্রাম ছয় মেরে দেন। তাই শেষ মুহূর্তে নায়ক সেবার আর হ'তে হ'তেও হওয়া হয় নি ভিভের। তবে এটাই তো ক্রিকেট। আবার ক্রিকেট যে আরও কিছু তার হদিশ মিলেছিলো হিরো কাপ সেমি ফাইনালে (১৯৯৩)। সেবারও শেষ ওভারে জিততে ৬ রান দরকার দক্ষিণ আফ্রিকার। কপিল-প্রভাকর-কুম্বলে-শ্রীনাথ নন,বল হাতে চ্যালেঞ্জ নিলেন শচীন। ক্রিজে তখন অলরাউন্ডার ব্রায়ান ম্যাকমিলান। বড়ো শট নেওয়ায় বেশ সুনাম। কিন্তু শচীন সেদিন স্লো মিডিয়াম পেসেই ভেলকি দেখালেন। মাত্র ৩ রান উঠলো। শেষ বল পর্যন্ত গড়ানো ম্যাচে ভারত জিতলো ২রানে। ২০০১'এ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টেও হরভজনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উইকেট তুলে নেন গোটা কতক। ভারত জেতে। ...দুই কিংবদন্তির সুখদুঃখে ইডেন এভাবে জড়িয়ে আছে ভেবে স্মৃতি একটু বেশিই সোনালি হয়।
05/09/2025
টেস্ট ক্রিকেট, ক্রিকেটের আদি ও প্রাচীনতম ফরম্যাট। এই ফরম্যাটের মাধ্যমেই ক্রিকেটের সূচনা হয়, আর এখনো এটিই সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদী সংস্করণ।
পাঁচ দিনব্যাপী একটি টেস্ট ম্যাচে প্রতিদিন তিনটি সেশন থাকে— মর্নিং, আফটারনুন ও ইভিনিং সেশন। শুরুতে অবশ্য 'টাইমলেস টেস্ট' অনুষ্ঠিত হতো, যার নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা ছিল না।
প্রতিটি দিনের খেলায় তিনটি সেশনের ফাঁকে দুটি বিরতি নির্ধারিত থাকে—
• মধ্যাহ্নভোজের বিরতি
• চা বিরতি
এই দুটি বিরতি শুধু খেলোয়াড়দের বিশ্রামের সুযোগই দেয় না, বরং সময়ের সাথে টেস্ট ক্রিকেট সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
ক্রিকেটের আবিষ্কারক ইংল্যান্ড হলেও চা বিরতির প্রচলন শুরু হয় মূলত অস্ট্রেলিয়ানদের হাত ধরে।
সর্বপ্রথম অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক জো ডার্লিং ১৮৯৯ সালে ইংল্যান্ড সফরে গিয়ে চা বিরতির প্রস্তাব রাখেন। সে সময় আনুষ্ঠানিক কোনো বিরতির নিয়ম ছিল না, মাঠেই খেলোয়াড়দের চা পরিবেশন করা হতো।
পরবর্তীতে, ১৯০৫ সালে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে খেলোয়াড়দের চা বিরতির সময় ড্রেসিংরুমে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এর পর থেকেই এটি টেস্ট ক্রিকেটের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে।
(ছবিতে, মাঠেই ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া দলকে চা পরিবেশন করা হচ্ছে। মাঠে বসে চা পান করা লোকটিকে গেস করুন😉)
30/08/2025
ইংরেজিতে বললে Educated, বাংলায় "শিক্ষিত"; ক্রিকেটপাড়ায় সবচেয়ে এজুকেটেড বা শিক্ষিত ক্রিকেটার কে? আচ্ছা এই "শিক্ষিত" শব্দটার মানদণ্ড এমন যে এখানে আসলে ওই যে "সেরা" বা "সবচেয়ে" শব্দটা ব্যবহার করা একটু বিতর্কিত, তাই "অন্যতম" শব্দ দিয়েই আলোচনাটা করি। যদিও পোস্টারে "শিক্ষিত" ব্যবহার না করে "বিদ্বান" ব্যবহার করেছে, যাতে এই শিক্ষিততে যে মূলত অ্যাকাডেমিক সাইড ফোকাস করা হয়েছে, সেটা বুঝানো যায়।
আসি আবিষ্কার সালভি(Aavishkar Salvi) এর প্রসঙ্গে। ক্রিকেটের একদম তুখোড় ভক্ত কিংবা শূন্য দশকের শুরু থেকেই খেলা দেখেন, এই দুইটা ক্রাইটেরিয়ায় না পড়লে ভারতের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার আবিষ্কার সালভিকে চেনার খুব একটা উপায় নাই আসলে। ও হ্যাঁ, এখন যারা কোচদের খবরাখবর অনেক রাখেন তারাও জানতে পারেন। সেই আবিষ্কারকে বলছি ক্রিকেটপাড়ায় অন্যতম বিদ্বান ক্রিকেটার। কেনো?
অ্যাস্ট্রো-ফিজিক্স (AstroPhysics) এ যে ব্যক্তিটা Phd করেছেন তাকে বিদ্বান বলাটা অতিরঞ্জিত হয়েছে কি? মনে হয় না! ভারতের হয়ে ২০০৩ সালে অভিষেক করেছিলেন আবিষ্কার, বাংলাদেশের বিপক্ষে অভিষেকে নিয়েছিলেন ২ উইকেট। আবিষ্কার তখন মূলত সুপরিচিতি পেয়েছিলেন তার বোলিং অ্যাকশনের জন্য। অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি গ্লেন ম্যাগ্রার হুবহু অ্যাকশনে বল করতেন আবিষ্কার, ইউটিউবে Aavishkar Salvi সার্চ দিলেই ম্যাগ্রার অ্যাকশনে তার বোলিং দেখে ফেলবেন। তবে ২০০৩ এ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু করা আবিষ্কারের ক্যারিয়ার ২০০৩ এই শেষ, ওয়ানডে খেলেছেন কেবল ৪টি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই খেলেছেন নিজের শেষ ম্যাচ। এরপর আর জাতীয় দলে দেখা যায়নি। তবে হ্যাঁ, তিনি আইপিএলে খেলেছেন। ২০১১ আইপিএলেও দিল্লী ডেয়ারডেভিলসের হয়ে ম্যাচ খেলেছেন আবিষ্কার, ২০১২ আইপিএলে স্কোয়াডে থাকলেও ম্যাচ পাননি।
তো আবিষ্কারের ক্রিকেটিং ক্যারিয়ার ২০১৩তেই শেষ৷ এরপর কোচিং করানোর দিকেই ফোকাসড থাকেন। তবে এরই মাঝে ঠিকই তিনি Astrophysics এ PhD সম্পন্ন করে ফেলেন। ডিগ্রী ধরতে গেলে শুধু ভারত ক্রিকেট কেনো; সব দেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের মাঝে "বিদ্বান ক্রিকেটার" এর তালিকা করলে আবিষ্কারের নামটা খুব নিচে থাকার কথা না।
⌛ এক্সট্রা তথ্য: ভারতের কিন্তু আরেকজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার আছেন, যিনি ভারতের সিভিল সার্ভিস (বাংলাদেশের কাইন্ড অফ "বিসিএস" যেটা) পরীক্ষায় পাশ করার পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক করেছেন। যারা আবিষ্কার সালভির নামটা স্মরণ করতে পারছেন, তারা হয়তো সেই আইএএস অফিসারের নামটাও স্মরণ করতে পারবেন।