30/10/2025
৯০ বিশ্বকাপের ম্যারাডোনা: স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই করা এক যোদ্ধা
১
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটা সময় পাটিগণিতে ‘স্রোতের অনুকূলে আর স্রোতের প্রতিকুলে’ বিষয়ক বলে কিছু অংক ছিল।ধরা যাক, একজন সাঁতারু ১০ মাইল/ঘণ্টা বেগে সাতার কাটতে পারে। নদীর স্রোতের গতিবেগ ২ মাইল/ঘণ্টা। তাহলে সেই সাঁতারু যখন স্রোতের দিকে সাঁতার কাটবে, তখন নদীর স্রোত তার গতির সাথে যুক্ত হবে। সেই মুহূর্তে সে সাঁতরাতে পারবে আসলে (১০+২) = ১২ মাইল/ঘণ্টা বেগে। একই ভাবে সে যদি স্রোতের বিপরীতে সাতার কাটে তখন তার গতি হয়ে যাবে (১০-২) = ৮ মাইল/ঘণ্টা।
তার মানে একই দক্ষতা সম্পন্ন সাঁতারু একই ভাবে সাঁতার কাটার পরেও শুধু মাত্র পরিস্থিতির কারণে একই দূরত্ব পার হবার জন্য দুই রকম সময় নেবে। একজন পারফর্মারের পারফর্ম করার ক্ষেত্রে শুধু মাত্র নিজের পারফর্মেন্সটাই গুরুত্বপূর্ণ না, সাথে আরো অনেক বাহ্যিক বিষয় কাজ করে। প্রতিটি খেলোয়াড়ই তার পছন্দের পরিবেশের বাইরে গেলে কিছুটা অস্বস্তিতে ভোগেন। একই ভাবে প্রতিটি খেলোয়াড়ই তার চেনা পরিবেশে সবচেয়ে সেরা সার্ভিসটা দিতে পারেন।
এখন কথা হচ্ছে আপনি স্বাভাবিক ভাবেই সবসময় আপনার সেরা পরিবেশটা পাবেন না। বরং, কিছু কিছু খেলোয়াড় আছেন যারা কিনা প্রতিকুল পরিবেশকেও কিছু কারিশমা দ্বারা নিজের পক্ষে নিয়ে আসে। তারাই গ্রেট বলে বিবেচিত হন। তারা চেনা পরিবেশের সাথে সাথে বিরুদ্ধ পরিবেশেও ভিন্ন ভাবে সফল। এদেরকে তাই একটু আলাদা ভাবে মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। ক্রিকেটে খুঁজতে দিলে ওয়াসিম আকরাম খুব আদর্শ একটা উদাহরণ। ওয়াকারের চেয়ে স্ট্রাইক রেট কিংবা ম্যাচ প্রতি উইকেটে পিছিয়ে থাকার পরেও ইতিহাস ওয়াসিমকেই এগিয়ে রাখে তার বিভিন্ন পরিস্থিতি জয় করার ক্ষমতা থাকার কারণে।
যাই হোক, অনেক শোনা হলো ক্রিকেট আর সাঁতারের কথা। এখন ফুটবল মাঠের এমনই একজনের কীর্তির কিছু অংশের কথা শোনা যাক। আর সেই কীর্তিমান মানুষটির নাম দিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনা।
২
একজন খেলোয়াড়ের বিশ্বকাপের সেরা পারফর্মেন্স কোনটা? এই সম্পর্কে কোন স্বীকৃতি এখনো দেওয়া হয়নি। তবে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের মতে প্রথম দুটোর মাঝে একটাতে ম্যারাডোনার ৮৬ এর পারফর্মেন্স থাকবে সেটা নিশ্চিত। তার সাথে লড়াই হবে পেলের ৭০ কিংবা ৫৮ এর পারফর্মেন্স। সে যাই হোক, এগুলোর তুলনায় ৯০ এর বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার পারফর্মেন্স খুবই মলিন মনে হবারই কথা। পরিসংখ্যানের বিচার পুরো আসরে তার অ্যাসিস্ট মাত্র ১টি, কোন গোল নেই। একজন মিডফিল্ডার বিশেষ করে ম্যারাডোনার মান অনুযায়ী এটা একেবারেই সাধারণ হবার কথা।
৯০ এর বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা এবং আর্জেন্টিনার পারফর্মেন্সটা একটু লক্ষ্য করুন। প্রথম ম্যাচে ক্যামেরুনের কাছে ১-০ গোলের হার। তবে সেই ম্যাচের খেলা দেখলে বুঝা যায় যে ক্যামেরুনের লক্ষ্য ছিল ম্যারাডোনার পায়ে বল গেলেই তাকে শারীরিক ভাবে আঘাত করা।
দ্বিতীয় ম্যাচে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে ম্যারাডোনার কোন গোল কিংবা অ্যাসিস্ট নাই। ৩য় ম্যাচে রোমানিয়ার বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচেও কোন গোল কিংবা অ্যাসিস্ট নেই।
সেই বিশ্বকাপে গ্রুপ ছিল ৬ টি, প্রতি গ্রুপ থেকে সরাসরি ২ টি করে দল পরের পর্বে যাবে। প্রতি গ্রুপের ৩য় সেরা দল থাকে ৬ টি, সেখান থেকে প্রথম ৪ টি দল নিয়ে আগের ১২ দলের সাথে যোগ করে দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়। আর্জেন্টিনা ছিল এই চার দলের একটি (ইউরো ২০১৬ এর পর্তুগালের মতো)।
দ্বিতীয় পর্বে ব্রাজিলের মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা। সেদিন ম্যাচের একমাত্র গোলটি করেন ক্লদিও ক্যানিজিয়া, ম্যারাডোনার একটা পাস থেকে। যা ছিল, পুরো টুর্নামেন্টে ম্যারাডোনার একমাত্র অ্যাসিস্ট।
পরের ম্যাচ যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে। গোলশূন্য ড্র সেই ম্যাচ শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে গড়ায়। টাইব্রেকারে ম্যারাডোনা পেনাল্টি মিস করেন, কিন্তু গোলকিপার গোয়াকোচিয়া সেই যাত্রায় আর্জেন্টিনাকে বাঁচিয়ে নিয়ে যান।
ইতালির বিপক্ষে সেমিফাইনালটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন। সেই ম্যাচে শিলাচ্চির গোলে প্রথমেই ইতালি এগিয়ে যায়, কিন্তু ৬৭ মিনিটে ক্যানিজিয়ার গোলে ম্যাচে ফেরত আসে আর্জেন্টিনা। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে আবারও ম্যাচটা জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। তবে ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে ১-০ গোলের হার মেনে নেয় আর্জেন্টিনা।
৩
১৯৯০ এর বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার পারফর্মেন্স বিশ্লেষণ করার আগে জানা উচিৎ, সেই মৌসুমে আসলে ম্যারাডোনা ক্লাব পর্যায়ে কেমন ফর্মে ছিলেন? সেবার ম্যারাডোনা ন্যাপলিকে নিয়ে দ্বিতীয় বারের মতো ইতালিয়ান সিরি ‘এ’ টাইটেল জিতেন। ১৬ গোল করে নিজে হন ন্যাপলির পক্ষে সিরি ‘এ’ র সর্বোচ্চ গোলদাতা। এছাড়া সব মিলিয়ে লিগের ৩য় সর্বোচ্চ- তার চেয়ে বেশি গোল করেন বাস্তেন (১৯) আর ব্যজিও (১৭)।
এমন ফর্মে থাকা একজন খেলোয়াড় কিভাবে বিশ্বকাপে গোল বিহীন থাকেন? এই বিষয়টা বুঝতে হলে সর্বপ্রথম আপনাকে আরো কিছু বিষয় জানতে হবে। যেকোন একটা কাজে সফলতা পাওয়ার জন্য তিনটা বিষয় আপনার থাকতে হবে, Vision, Mission and Goal. বিষয়টা সহজভাবে বুঝানোর চেষ্টা করা যাক।
Vision হচ্ছে কোন একটা কাজ করার ইচ্ছে। মনে করুন আপনি গুলিস্তান থেকে নিউমার্কেট যাবেন। এখন এই যাওয়ার টার্গেটটাই আপনার Vision. গুলিস্তান থেকে নিউমার্কেট যাওয়ার জন্য আপনি কিছু পন্থা অবলম্বন করবেন, হয়তো বাসে যাবেন, কিংবা রিক্সায় অথবা পায়ে হেঁটে। এটা হচ্ছে আপনার Mission এবং এই Mission বাস্তবায়িত করার জন্য আপনাকে কিছু কাজ করতে হবে যেমন বাসে করে নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছানোর জন্য নির্দিষ্ট বাসটাই ধরতে হবে কিংবা যে বাসটা গুলিস্তান থেকে নিউমার্কেটে যায় সেই বাসটাতেই উঠতে হবে। আপনি যদি সাভারের বাসে উঠেন তাহলে কখনোই নিউমার্কেটে পৌছুতে পারবেন না । এখানে, নিউ মার্কেটে যাওয়া হচ্ছে আপনার Goal.
একজন মানুষকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌছুতে হলে তার Vision, Mission এবং Goal সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। অবাস্তব Vision থাকলে সেটা বাস্তবায়ন করা মোটামুটি অসম্ভব। যেমন, আপনার Vision হলো নিউমার্কেটে যাওয়া কিন্তু আপনার Mission হচ্ছে নৌকায় চড়ে যাওয়া! তাহলে সমস্যা। এই Vision-এর দিক থেকে ম্যারাডোনা ছিলেন অন্যান্য অনেক খেলোয়াড়ের চেয়ে এগিয়ে।
৯০ এর বিশ্বকাপে বাকি দলগুলোর তুলনায় শক্তিতে ম্যারাডোনার দলটা ছিল অনেকটা স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতোই। ম্যারাডোনা জানতেন যে, এই দলে তিনি যদি পারফর্ম করতে যান তাহলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে হয়তো সফল হবেন কিন্তু তার বাজে দিনে দলের ভরাডুবি হবে সেটা নিশ্চিত। এই কারণে তিনি পেছন থেকে নির্দেশনা দেবার চিন্তা করলেন।
অন্যান্য খেলাতেও এই কাজ অনেকে করেছেন। ক্রিকেটের উদাহরণ দিয়েই বুঝানোর চেষ্টা করা যাক; শেবাগ ওপেনিং পজিশনে সেট করার জন্য গাঙ্গুলী নিজের পজিশন ছেড়ে নিচে নেমে এসেছিলেন। এতে গাঙ্গুলীর ক্যারিয়ার কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিন্তু দল উপকৃত হয়েছে।
ম্যারাডোনার কাজটাও ছিল অনেকটা এমন। তিনি তার খেলোয়াড়দেরকে নিজের মতো খেলার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন যাতে বাকিরা নির্ভার ভাবে খেলতে পারেন। কাজটা ছিল অনেকটা এমন, ধরুন আপনাকে ৩০০ রান তাড়া করতে হবে। দলের ব্যাটিং লাইনের অবস্থা যদি খুব খারাপ হয় তাহলে সচরাচর সবচেয়ে সেরা ব্যাটসম্যানটা ওপেনিংয়ে নামবে না। ওপেনিংয়ে নামা ব্যাটসম্যানটা সেঞ্চুরি করলেও, যদি ১০০ রান বাকি থাকা অবস্থায় আউট হয়ে যায় সেটা বাকি সবাই মিলে হয়তো পূরণ করতে পারবে না। কারণ সেই সাহসটাই তারা হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু যখন তারা দেখবে যে, তাদের পরেও কেউ একজন আছে যে কিনা তারা আউট হয়ে যাবার পরেও নৌকাটা তীরে পৌঁছে নেবার সামর্থ্য রাখে, তখন তাদের সামর্থ্যটাও বেড়ে যায়। এই কাজটাই করেছিলেন ৯০ এর ম্যারাডোনা। নিজে পারফর্ম যতটুকুই হোক, টার্গেট ছিল অন্যদের কাছ থেকে সেরাটা বের করার। সেই কাজে তিনি ছিলেন সফল।
ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ছিল জার্মানি, যারা কিনা আগের বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ছিল। জার্মানির সেই দলটা ছিল ভয়ানক রকমের শক্তিশালী। সেই জার্মানি ৮২ এর বিশ্বকাপেও ফাইনালে খেলেছিল। পাওলো রসির চমকে দুর্দান্ত ভাবে ফিরে আসা ইতালির সাথে আর পেরে উঠেনি।
৮৬ এর ফাইনালেও ৫৫ মিনিটের ২ গোলে পিছিয়ে পড়েছিল। কিন্তু ৭৪ আর ৮০ মিনিটের দুই গোলে দুর্দান্ত ভাবে ফিরে এসেছিল জার্মানি। শেষ পর্যন্ত ম্যারাডোনার পাসে বুরাচাগা জার্মান কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকে দেয়।
৯০ এর ফাইনালে জার্মানির আসাটা আর্জেন্টিনার মতো ধুঁকে ধুঁকে নয়, গ্রুপ পর্ব থেকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই এসেছিল। দ্বিতীয় পর্বে হারিয়েছিল গুলিত-কোম্যান-রাইকার্ড-বাস্তেনদের নেদারল্যান্ডকে। কোয়ার্টারে চেকোস্লাভিয়া আর সেমিতে ইংল্যান্ডকে। ফাইনালে তাই জার্মানি ফেভারিট হিসেবেই যাত্রা শুরু করে।
৪
এতোকিছুর পরেও, ৯০ বিশ্বকাপ ফাইনালটা বিতর্কিত নানা কারণেই। সেই বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার সবচেয়ে প্রিয় খেলোয়াড় ক্যানিজিয়া ফাইনাল মিস করেন, সেমি ফাইনালে হলুদ কার্ড পাওয়ার কারণে। জনশ্রুতি আছে যে। আর্জেন্টিনাকে আরো দুর্বল করে দেবার জন্যেই নাকি সেমিতে ক্যানিজিয়াকে ইচ্ছাকৃত হলুদ কার্ড দেখানো হয়েছিল যাতে তিনি ফাইনালে খেলতে না পারেন।
বিষয়টা সত্য কিনা তার প্রমাণ নেই, তবে ফাইনালে অযাচিত সমর্থন দেওয়া হয়েছিল জার্মানিকে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর্জেন্টিনার টার্গেটই ছিল ডিফেন্সিভ খেলে ম্যাচটা টাইব্রেকারে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু ভাগ্য সেদিন বিরূপ। ম্যাচের ৬৫ তম মিনিটেই আর্জেন্টিনার একজন খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখলে, তারা ১০ জনের দলে পরিণত হয় । সেই লাল কার্ড ছিল সেই পর্যন্ত হওয়া বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথম লাল কার্ড। তবে সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনা ঘটে ৮৫ তম মিনিটে। পেনাল্টি বক্সের ভেতরে ফাউল করায় বিতর্কিত পেনাল্টি দেওয়া হয় আর্জেন্টিনার বিপক্ষে। পেনাল্টি থেকে গোল করেন জার্মানির ব্রেহমে। এর দুই মিনিট পর আবার আরেকজন আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখানো হলে আর্জেন্টিনা ৯ জনের দলে পরিণত হয়। সেদিন আর্জেন্টিনা আর পেরে উঠেনি। আর ম্যাচটা টাইব্রেকারে গেলে কি পারতো? তাও জানার উপায় নেই। তবে এমন হলে, আক্ষেপ কিছুটা থেকেই যায়।
৫
‘দল দুর্বল পেয়েছেন, প্রতিপক্ষ দুর্দান্ত, সাথে রেফারিরও বিরূপ সমর্থন’- এই তিনটার একটা বিষয়ও পক্ষে গেলে হয়তো বা ম্যারাডোনা আরেকটা বিশ্বকাপ জিতেই যেতেন। অবশ্য সেটি না করতে পারলেও ম্যারাডোনা সেই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সেরা খেলোয়াড় এবং টুর্নামেন্টের ৩য় সেরা খেলোয়াড় হন। বিশ্বকাপের অল স্টার একাদশে আর্জেন্টিনা থেকে উনার বাইরে আর মাত্র একজন খেলোয়াড়ই সুযোগ পান, গোলকিপার গোয়াকচিয়া।
এত সব সীমাবদ্ধতা স্বত্বেও বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে ফাইনালে উঠতে পারাটাকেই তাই খুব বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। ৯০ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন না হয়েও বিশ্বকাপ ও আর্জেন্টিনার ইতিহাসে ম্যারাডোনা তাই আলাদা একটি অবস্থান নিশ্চিত করে রেখেছেন।
28/10/2025
১.
আবেগ আর যুক্তি খুব বিপরীত ধর্মী জিনিস তবে দুইটাই প্রয়োজনীয়। জীবনে যুক্তির প্রয়োজন আছে, আবার প্রয়োজন আছে আবেগেরও। ভয়ংকর হচ্ছে আবেগীয় যুক্তি। ধরুন বাংলাদেশ আর ভারতের মাঝে ফুটবল খেলা হচ্ছে। কট্টর বাংলাদেশের সমর্থকও জানেন যে তাদের দলের জেতার সম্ভাবনা কম। কিন্তু আবেগের বশে তারা নিজের সমর্থিত দলের জয়টাই চাইবে । এটাই স্বাভাবিক, যে কোন সমর্থকই এটা চাইবে। জানে যে হারার সম্ভাবনা বেশী, তবুও হারলে মন খারাপ হবে। সমর্থকদের এই অনুভুতির নামটাই আবেগ। তবে একজন যুক্তিবাদি মানুষ মন খারাপ হলেও বিষয়টা মেনে নিবে।
কিন্তু যারা আবেগ দিয়ে চলে তারা বিষয়টা মানতে পারবে না। প্রচন্ড মন খারাপ করবে এবং হারের পেছনে নিজের মনকে সান্তনা দেবার জন্য অদ্ভুত অদ্ভুত যুক্তি বের করবে। আপনি এই ধরণের মানুষকেও অবজ্ঞা করতে পারবেন না। তারাও সমাজের একটা অংশ। হয়তো খুব ক্ষুদ্র।
তবে আজকের লেখার মূল বিষয় এটা নয়। একজন খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে আবেগের বহিঃপ্রকাশ যে যুক্তির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল তার একটা উদাহরণ দেবার চেস্টা থাকবে এই লেখায়।
২.
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে নাকি তিনি খেলার প্রস্তাব পেয়েছিলেন। তা সে তো অনেক বড় খেলোয়াড়রাই পায়। এটা বড় বিষয় হলেও দূর্লভ কোন বিষয় না।
তিনি নাকি তাদেরকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, সেটাও তো খুব বড় কোন বিষয় না। বড় খেলোয়াড়েরা নিজেদের মতো করে ক্যারিয়ারের পরিকল্পনা করতেই পারেন।
তবে তিনি যে কারণে মাদ্রিদকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সেটার কারণটা শুনলে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। তিনি ছিলেন প্রচণ্ড রকমের আড্ডাবাজ একজন মানুষ। খেলা শেষে বন্ধু বান্ধব নিয়ে মদের আড্ডাতেই ব্যস্ত থাকতেন। কাজেই যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে মাদ্রিদে গেলে এই বিষয়গুলোকে জলাঞ্জলী দিতে হবে তখন তিনি বিনয়ের সাথে প্রস্তাবটা প্রত্যাখ্যান করলেন।
ক্যারিয়ার নিয়ে সাংঘাতিক রকমের খামখেয়ালী ছিলেন মানুষটা। একটা সময় সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত কিং পেলের সাথে সেরার প্রতিযোগিতা হতো তার। বলা হয়ে থাকে তিনি নাকি সর্বকালের সেরা ড্রিবলার। সুযোগ পেলেই বল নিয়ে ড্রিবলিং করতেন এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাতে সফলই হতেন। ব্যানানা শটের জন্য বিখ্যাত ছিলেন, এমনকি এই শটে নাকি কর্ণার থেকে গোলও করেছেন।
হ্যা, ঠিকই ধরেছেন। এই লোকটার নাম গ্যারিঞ্চা।
IFFHS এর দ্বারা গত শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড়দের তালিকায় গ্যারিঞ্চার অবস্থান ছিল ৮ম যা কিনা ব্রাজিলিয়ানদের মাঝে পেলের পর দ্বিতীয়।
এই শতাব্দীতে ব্যালন ডি অর কতৃপক্ষ দ্বারা সর্বকালের সেরা যে তিনটি দল করা হয়েছিল তাতে গ্যারিঞ্চার জায়গা হয়েছিল দ্বিতীয় দলে। প্রথম দলে উনার জায়গায় কে সিলেক্ট হয়েছিল জানেন?
লিওনেল মেসি। মেসি না থাকলে তিনিই প্রথম একাদশে জায়গা পেতেন।
৩.
ক্লাবের হয়ে সিনিয়র প্রথম ম্যাচেই করেছিলেন হ্যাটট্রিক। জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপে তার অভিষেকের প্রথম তিন মিনিটকে বলা হয় ‘দি গ্রেটেস্ট থ্রি মিনিটস ইন ফুটবল হিস্ট্রি’। ম্যাচ শুরুর এক মিনিটের কম সময়ের মাঝেই বিপক্ষে দলের তিনজনকে কাটিয়ে গোল পোস্টে শট নেন, কিন্তু পোস্টে লেগে বল ফেরত আসে। এর পর মূহুর্তেই পেলেকে একটা পাস দেন, পেলের সেই শটও পোস্টে লেগে ফিরে আসে। এরপরেও আরো কয়েকটা আক্রমণ করে প্রতিপক্ষকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখেন।
তবে তার ক্যারিয়ারের হাইলাইটিং মোমেন্ট হচ্ছে ১৯৬২ এর বিশ্বকাপ। পেলে ইনজুরিতে পড়ার পর দায়িত্ব পড়লো তার কাধে। কোয়ার্টারে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-২ গোলে জেতা ম্যাচে করলেন ২ গোল আর সেমিতে চিলির বিপক্ষে ৪-২ গোলে জেতা ম্যাচে করলেন আরো ২ গোল। ফাইনালে প্রচন্ড জ্বর নিয়ে খেললেন, নিজে গোল করতে পারেননি কিন্তু জিটো আর ভাভাকে দিয়ে গোল করালেন। বিশ্বকাপ জিতে নিল ব্রাজিল, নিজে জিতলেন গোল্ডেন বল আর গোল্ডেন বুট। ১৯৬৬ বিশ্বকাপও খেলেছিলেন। ইনজুরি নিয়ে খেলেও বুলগেরিয়ার বিপক্ষে ১ টা গোল করেন, কিন্তু পরের ম্যাচে হাঙ্গেরির সাথে ৩-১ গোলে হেরে যায় ব্রাজিল। জাতীয় দলের ক্যারিয়ারে ওই একটাই পরাজয়। এমনি এমনি তো আর কেউ কেউ তাকে পেলের চেয়েও ওপরে রাখেন না।
৪.
যুক্তির বিচারে গ্যারিঞ্চার চেয়ে পেলেই উপরে। অবশ্য আবেগ বলে ক্যারিয়ার নিয়ে সিরিয়াস হলে হয়তো ইতিহাস পাল্টালেও পাল্টাতে পারতো। তবে প্রসঙ্গ সেটা নয়। শুরুতেই বলেছিলাম যে ঘটনা উল্লেখ করা হচ্ছে সেখানে যুক্তির চেয়ে আবেগ জয়ী হয়েছে। সেটাই এখন বলছি।
ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামের নাম তো শোনার কথা। সেই স্টেডিয়ামে হোম এবং অ্যাওয়ে দলের জন্য দুটো আলাদা ড্রেসিং রুম আছে। দুই ড্রেসিং রুমের নাম রাখা হয়েছে দুজন বিখ্যাত খেলোয়াড়ের নামে। হোম ড্রেসিং রুমের নাম ‘গ্যারিঞ্চা’ আর অ্যাওয়ে ড্রেসিং রুমের নাম ‘পেলে’।
পেলে তিন বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলেও মারাকানের হোম ড্রেসিং রুমের নামটা গ্যারিঞ্চার নামেই করা হয়েছে। তিন বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন পেলেকে ব্রাজিলিয়ানরা সেরার আসন দিয়েছে ঠিকই তবে হৃদয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশী ভালো বাসার জায়গাটা তারা রেখেছে গ্যারিঞ্চার জন্যেই।
আবেগের কাছে মাঝে মাঝেই যুক্তি এভাবে হেরে যায়। এজন্যেই তো প্রমাণ হয় আমরা মানুষ, রোবট নই।
26/10/2025
২০০৭ সাল, ভারত বনাম পাকিস্তান – প্রথম টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনাল।
ভারত প্রথমে ব্যাট করে গৌতম গম্ভীরের ৫৪ বলে ৭৫ রান আর শেষের দিকে রোহিত শর্মার ১৬ বলে ৩০ রানের একটা ক্যামিও ইনিংসের উপর দাঁড়িয়ে সংগ্রহ করে ১৫৭ রানের একটা স্কোর।
পাকিস্তান ব্যাটিং এ প্রথম ওভারেই হাফিজকে হারালেও ইমরান নাজিরের ঝড়ো ইনিংসে রান রেটের সাথে পাল্লা দিয়েই লড়ছিল।
নাজির আউট হয়ে যাবার পর খুব দ্রুত ইউনুস খানের উইকেটও হারায় পাকিস্তান। তখনই জুটি বাধে শোয়েব মালিক আর মিসবাহ।
ভারতকে ঠিক সেই মূহুর্তে ম্যাচে ফেরায় ইরফান পাঠান - পরপর দুই বলে আউট করেন শোয়েব মালিক আর এই ফরম্যাটের দূর্ধর্ষ খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত শহীদ আফ্রিদিকে। আফ্রিদী যখন ক্রিজে আসেন তখন পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ৫১ বলে ৮২ রানের। কিন্তু আফ্রিদীকে প্রথম বলেই ফিরিয়ে দিয়ে পাকিস্তানকে ধাক্কা দেন ইরফান। পরবর্তীতে ১১ বলে ১৫ রান করে ভয়ংকর হয়ে উঠতে থাকা ইয়াসির আরাফাতকেও ফেরত পাঠান ইরফান।
ভারতীয় দলের বোলিং ডিপার্টমেন্টে সবচাইতে ইকোনমিক্যাল বোলার ছিলেন সেদিন ইরফান এবং সেই ইনিংসে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীও ছিলেন তিনি।
শেষ মূহুর্তে মিসবাহের লড়াইয়ে ম্যাচটা প্রতিদ্বন্ধিতা পূর্ণ হলেও ভারতই জিতে প্রথম সেই টুর্নামেন্ট বিজয়ী হয়।
সেই ম্যাচের ম্যান অব দি ম্যাচ হন ইরফান পাঠান।
শুভ জন্মদিন ইরফান।
25/10/2025
ক্রিকেট বিশ্বের খুব উঁচু স্থানে উনার নাম নেই।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ৫৭ টেস্টে ৩০.৯৫ গড়ে ১৭০ উইকেট, ৭৫ টি ওয়ানডে ম্যাচে ১০৬ উইকেট আর আন্তর্জাতিক টি টুয়েন্টিতে ৯ ম্যাচে ১২ উইকেট।
তবে ২০১৫ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীর তালিকায় উনার অবস্থান ছিল তৃতীয় যেটা কিনা ভারতীয় বোলারের মধ্যে সর্বোচ্চ। কোয়ার্টার ফাইনাল আর সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ দুই ম্যাচেই পেয়েছিলেন ৪ টি করে উইকেট।
দলে জায়গা নিশ্চিত করতে তাকে অনেক বারই সংগ্রাম করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত জায়গা হারিয়েছেন। তবে তার মূল সংগ্রামটা ছিল জীবন যুদ্ধে।
তার বাবা ছিলেন কয়লা খনির শ্রমিক। সেই এলাকার বাচ্চাদের পক্ষে ক্রিকেট খেলার কথা কল্পনাতে আনতেও সাহসের প্রয়োজন কারণ ক্রিকেট খেলতে যে কিট প্রয়োজন হয় সেগুলো যোগাড় করার টাকাও তাদের ছিল না।
উমেশের ক্যারিয়ার হয়তো সেভাবে পূর্ণতা পায় নি। তবে উনার সংগ্রাম পিছিয়ে থাকা অনেক মানুষকেই সাহস জোগাবে সেটা নিশ্চিত।
বোলার হিসেবে উমেশ আমার খুব প্রিয় খেলোয়াড় নন। তবে উনার সংগ্রামটা আমার খুব প্রিয়।
শুভ জন্মদিন উমেশ।
23/10/2025
তিনটি বিশ্বকাপ জেতা একমাত্র খেলোয়াড় পেলে, এই একটি কথাই তার অর্জনকে অনেক উপরে তুলে দেয়। যদিও অ্যাকটিভ খেলোয়াড় হিসেবে পেলের অর্জন দুটি বিশ্বকাপ। কিন্তু আরেকটা বিশ্বকাপে ঠিক কি হয়েছিল? সবাই কি সেটা জানি? পেলে ব্রাজিলের গ্রেট দল পেয়ে সফলতা পেয়েছিলেন নাকি ভালো একটা দলকে গ্রেট দলে পরিণত করেছিলেন?
আজকের লেখায় আমরা বিশ্বকাপে পেলের পারফর্ম্যান্স নিয়ে কিছু জানার চেষ্টা করবো।
বিশ্বকাপে পেলের অবদানগুলো একনজরে দেখা যাক।
- ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপ
মাত্র ১৭ বছর বয়সে ব্রাজিলের মতো দলের হয়ে বিশ্বকাপ খেলা যেনতেন বিষয় নয়। সেই বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্যায়ে একটি অ্যাসিস্ট দিয়ে শুরু করেন। কোয়ার্টারে ওয়েলসের বিরুদ্ধে পেলের একমাত্র গোলে ব্রাজিল সেমিফাইনালে পৌঁছে। এই গোল করে বিশ্বকাপে সর্বকনিষ্ঠ (১৭ বছর ২৩৯ দিন) গোলদাতা হিসেবে রেকর্ডবুকে নাম লেখান পেলে। এরপর সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপের সর্বকনিষ্ঠ (১৭ বছর ২৪৪ দিন) হ্যাটট্রিকদাতার রেকর্ড করেন। ফাইনালেও দুই গোল করেন । সেই বিশ্বকাপের সিলভার বল ও সিলভার বুট দুটোই জেতেন পেলে। এছাড়া সেই বিশ্বকাপের সেরা উদীয়মান তারকার পুরষ্কারও জেতেন তিনি।
১৭ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জেতাটা কী, সেটা বোঝানোর জন্য আরো কিছু গ্রেটের পরিসংখ্যান উল্লেখ করা জরুরী মনে করছি।
• ম্যারাডোনা ২২ বছর বয়সে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেন।
• রোনালদো নাজারিও ১৮ বছর বয়সে বিশ্বকাপ একাদশে সুযোগ পান। কিন্তু রোমারিও, বেবেতোর ভিড়ে মূল একাদশে জায়গা পাননি।
• জিদান ফ্রান্সের মূল দলেই সুযোগ পান ২২ বছর বয়সে, আর বিশ্বকাপ একাদশে সুযোগ পান ২৬ বছর বয়সে।
• মেসি ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ একাদশে সুযোগ পান। কিন্তু সবগুলো ম্যাচে খেলার সুযোগ পাননি।
• ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ২১ বছর বয়সে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেন।
উপরে উল্লেখিত সব খেলোয়াড়ই লিজেন্ড। তাদের কাউকে ছোট করার জন্য তথ্যগুলো দেয়া হয়নি। কিন্তু ১৭ বছর বয়সে তখনকার ব্রাজিল দলে সুযোগ পাওয়াটা যে একটা বিশেষ ব্যাপার, সেটা বোঝানোর জন্যই এর অবতারণা করা হয়েছে। আর পেলে সেই সুযোগটা কাজেও লাগিয়েছেন দারুণভাবে।
- ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপ
এই বিশ্বকাপে পেলে তৎকালীন সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি নিয়ে খেলা শুরু করেন এবং আশা করা হচ্ছিল এটা পেলের টুর্নামেন্ট হবে। চিলির বিরুদ্ধে প্রথম গোলে অ্যাসিস্ট করে আর চারজন ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে দ্বিতীয় গোল দিয়ে সেই পথেই ছিলেন তিনি। কিন্তু চেকোস্লোভিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে ইনজুরিতে পড়ে বাকি টুর্নামেন্ট মিস করেন।
- ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের ব্রাজিলের দলকে ধরা হয় তৎকালীন ব্রাজিলের সেরা দল। গ্যারিঞ্চা, গিলমার, সান্তোস, জোয়ারজিনহো, টোস্টাও, গারসেন, আর সাথে পেলে। কিন্তু সবাইকে হতাশ করে মাত্র তিনটি ম্যাচ খেলে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় ব্রাজিল। প্রথম ম্যাচে বুলগেরিয়ার বিরুদ্ধে পেলে গোল করেন, কিন্তু বুলগেরিয়ান ডিফেন্ডারদের বর্বরোচিত ফাউলে ইনজুরিতে পড়ে পরের ম্যাচ মিস করেন। হাঙ্গেরীর বিরুদ্ধে সেই ম্যাচে হেরে যায় ব্রাজিল। কোচ ভিসেন্তে ফিওলা গ্রুপের শেষ খেলায় ইউসেবিওর পর্তুগালের বিপক্ষে যখন পেলেকে নামান, তখন সবাই আশ্চর্যান্বিত হয়ে যায়। কারণ তখনও পেলে তার ইনজুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। সেই ম্যাচটাকে ‘৬৬ এর বিশ্বকাপের সবচেয়ে বাজে ম্যাচ বলে স্বীকার করা হয়। ওই ম্যাচে পুরো ব্রাজিল দল, বিশেষত পেলেকে এত বেশি পরিমাণ ফাউল করা হয় যে, পেলে মাঠ থেকে তো ইনজুরড হয়ে বের হনই, সেই সাথে ম্যাচের পর তিনি অবসরের ঘোষণাও দেন। পরবর্তীতে ইউসেবিও এবং পর্তুগালের সমস্ত টিম মেম্বার অফিসিয়ালি ব্রাজিলের কাছে ক্ষমা চায়।
- ১৯৭০ এর বিশ্বকাপ
১৯৭০ এর বিশ্বকাপে পেলের খেলার কথা ছিল না। কিন্তু ১৯৬৯ এর শুরুতে পেলেকে আবার দলে নেয়া হয় এবং বাছাইপর্বে তিনি ৬ ম্যাচে অংশ নিয়ে ৬টি গোল করেন। এই টুর্নামেন্টে পেলে মূলত প্লে-মেকার হিসেবে খেলেন। ফাইনাল ম্যাচে ইতালির বিরুদ্ধে প্রথম গোলটি সহ পুরো টুর্নামেন্টে ৪টি গোল আর ৭টি অ্যাসিস্ট করে সেই বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরষ্কার জিতে নেন তিনি। সাথে বিশ্বকাপ জিতে জুলেরিমে কাপটাকে চিরতরে নিজেদের করে নেন।
- শেষ কথাঃ
বিশ্বকাপ অনেকেই জিতেছে। কিন্তু ঠিক কোন জায়গাটাতে পেলে গ্রেট?
১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া প্রতিটি বিশ্বকাপেই ফেভারিট হিসেবে যাত্রা করে ব্রাজিল। কিন্তু পেলে আসার আগে ২৮ বছর বিশ্বকাপ জিততে পারেনি তারা। পেলে যাওয়ার পরেও পরবর্তী বিশ্বকাপ জেতে ২৪ বছর পরে।
বয়স হিসেবে পেলের ক্যারিয়ারের সবচাইতে পিক টাইম ছিল ১৯৬২ আর ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ। কিন্তু দুই বিশ্বকাপেই দূর্দান্ত শুরু করেও ইনজুরির জন্য বাদ পড়েন দল থেকে।
এখানে আরো একটা বিষয় লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবেন, ফুটবলে প্রজন্ম একটা বড় বিষয়। এক প্রজন্ম সচরাচর দুটি বিশ্বকাপ ভালো খেলে। কিন্তু পেলে চারটি বিশ্বকাপেই ভালো খেলেছিলেন এবং যে দুটি বিশ্বকাপে পুরোটা খেলতে পেরেছিলেন সেই দুটোতেই তার যাদু দেখিয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা- বিভিন্ন প্রজন্মের সাথে সুন্দরভাবে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন।
প্রতিটি বিশ্বকাপের শেষে একটি অল ষ্টার দল ঘোষণা করা হয়। পেলে ১২ বছরের ব্যবধানে দুটি দলে (১৯৫৮ ও ১৯৭০) জায়গা পান। এত সময়ের ব্যবধানে এরকম কোনো দলে আর কোনো খেলোয়াড় সুযোগ পাননি।
আপনি যখন জানবেন, চারটি বিশ্বকাপে ১৪টি ম্যাচ খেলে ১২টি গোল আর ১০টি অ্যাসিস্ট, দুটি ফাইনালে গোল করার রেকর্ড, চারটি ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ড- তাহলে পেলে সম্পর্কে আপনার শ্রদ্ধাবোধ আরেকটু বাড়ার কথা।
শুভ জন্মদিন পেলে।
20/10/2025
১
এই শতাব্দীর শুরুতে ক্রিকেটের বাইবেল উইজডেন থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে গত শতাব্দীতে যারা খেলেছেন তাদের মাঝ থেকে ফরম্যাট অনুযায়ী সেরা বোলার এবং সেরা ব্যাটার নির্বাচন করা হবে।
ক্রাইটেরিয়া অনুযায়ী টেস্ট আর ওয়ানডেতে সেরা ব্যাটার হিসেবে নির্বাচিত হলেন যথাক্রমে স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান আর স্যার ভিভ রিচার্ডস। অন্যদিকে টেস্ট আর ওয়ানডেতে সেরা বোলার হিসেবে নির্বাচিত হলেন যথাক্রমে মুরালিধরণ এবং ওয়াসিম আকরাম।
কিন্তু ওয়ানডে বোলারের ক্ষেত্রে সেরার তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন যে ব্যাক্তিটি উনাকে অনেকেই সেরার তালিকায় হয়তো সেরা পাঁচে রাখেন না। কিছুটা আন্ডাররেটেড এই বোলার পরিচিত ছিলেন ‘সাদা বিদ্যুৎ’ নামে।
উনার নাম অ্যালান ডোনাল্ড।
২
দক্ষিন আফ্রিকায় কমপক্ষে ৩০০ উইকেট পেয়েছে এমন বোলারদের মাঝে ডোনাল্ডের গড় দ্বিতীয় (২২.২৫) আর ওয়ানডেতে কমপক্ষে ২০০ উইকেট পেয়েছেন এমন বোলারদের মাঝে ডোনাল্ডের গড় (২১.৭৮) সবচাইতে ভালো।
ওয়ানডে বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকান পেসার মাঝে সবচাইতে বেশী উইকেটও ডোনাল্ডের – ২৫ ম্যাচে ৩৮ উইকেট। পেস স্পিন সব মিলিয়ে শুধু ইমরান তাহির উনার চাইতে বেশী উইকেট পেয়েছেন – ২২ ম্যাচে ৪০ উইকেট।
ক্যারিয়ারের সেরা সময় কাটিয়েছেন ১৯৯৬ সালে। সেই বছর ২০ টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলে স্বীকার করেছিলেন ৫১ টি উইকেট। এই সময়ে ৪ টি টেস্ট খেলে ২৬ টি উইকেটও নিয়েছিলেন। তবে টেস্ট ক্যারিয়ারের সেরা বছর ছিল ১৯৯৮ সাল। সেই বছর ৮০ টি উইকেট পেয়েছিলেন ১৪ টেস্টে। কোন এক নির্দ্বিষ্ট বছরে একজন পেসারের এর চাইতে বেশী উইকেট পাবার ঘটনা মাত্র একবার – ১৯৮১ সালে ডেনিস লিলির ৮৫ উইকেট।
৩
ক্যারিয়ারে অসংখ্য অর্জন থাকা সত্বেও খুব দুঃখজনক একটা স্মৃতি আজীবন ডোনাল্ডের সঙ্গী হয়ে থাকবে।
১৯৯৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল – শেষ ওভারে প্রয়োজন ৯ রান। প্রথম দুই বলেই দুটা চার মেরে স্কোরবোর্ডে সমতা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্লুসনারের ডাকে সাড়া দিতে দেরি করায় রান আউট হয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায়।
সেই সময়টাতে ওয়ানডে ক্রিকেটে দক্ষিন আফ্রিকা দূর্দান্ত করছিল। অস্ট্রেলিয়ার সাথে ম্যাচটা জিততে পারলে ক্রিকেট ইতিহাসটাই হয়তো অন্যভাবে দাড়াতো।
যাই হোক, কিছু ব্যর্থতা বাদ দিলেও ডোনাল্ড ইতিহাসে স্মরণীয় হয়েই থাকবেন।
07/10/2025
১
বিশ্বকাপ ফুটবলে ১ আসরে সবচাইতে বেশী গোল করেছেন কে?
ফ্রান্সের জা ফন্টেইন – সামান্য একটু খোজ খবর রাখা যে কোন মানুষই এই উত্তরটা জানেন আশা করছি।
তবে আজ একটা মজার তথ্য শেয়ার করছি যেটা কিনা অনেকেই জানেন না সম্ভবত।
একটা সময় পর্যন্ত প্রতি বিশ্বকাপ শেষেই অল স্টার দল গঠন করা হতো আর সেটা হতো সেই সময়ের সাংবাদিকদের ভোটে।
জা ফন্টেইন সেই বিশ্বকাপে ৬ ম্যাচে ১৩ গোল করেছিলেন। মিরাসোভা ক্লোসার ১৬ টি গোল করতে ম্যাচ খেলতে হয়েছে ২৬ টি।
অবাক করা বিষয় হচ্ছে এত দূর্দান্ত পারফর্ম করেও সেই বিশ্বকাপের অল স্টার দলে ফন্টেইন জায়গা পান নি। এর চাইতেও অবাক করা বিষয় হচ্ছে সেই বিশ্বকাপের অল স্টার দলের ফর্মেশন ছিল ১ জন গোলকিপার – ৩ জন ডিফেন্ডার – ২ জন মিড ফিল্ডার – ৫ জন ফরোয়ার্ড (এর মাঝে ২ জন অবশ্য উইংগার ছিলেন)।
তবে মূল মজার বিষয় এটাও নয়।
যেখানে ফন্টেইন সেই বিশ্বকাপে একাই করেছিলেন ১৩ গোল, সেখানে পুরো দল মিলে গোল করেছিলেন ১২ টি।
অল স্টার দলে জায়গা পেতে হলে ফন্টেইন কে আর কি করা লাগতো?
28/09/2025
#ফাইনাল
১
মনে করুন এটা ৯০ এর দশক – সালটা ৯৬ থেকে ৯৯ এর মাঝে কোন একটা সময়।
বিশ্বাস করুন, সেই সময়ে আজকের ম্যাচটা হলে অন্তত ক্রিকেট বিশ্বের সাথে যুক্ত যে কয়টা দেশ আছে সেখানকার কাজ কর্ম থমকে যেত। সারাদিন জুড়ে শুধু একটাই আলোচনা চলতো যে আজ ভারত পাকিস্তান ফাইনাল।
ভারতের পক্ষে শচীন, আজহার, সৌরভ, দ্রাবিড় দের ব্যাটে আগুন থামানোর জন্য পাকিস্তান দলে থাকতো ওয়াসিম, ওয়াকার, সাকলাইন আর শোয়েব আখতার দের মতো দূর্ধর্ষ বোলার। ক্রিকেট বিশ্বে তখন একটা কথা খুব প্রচলিত ছিল যে পাকিস্তানের বোলার আর ভারতের ব্যাটার দের মিলিয়ে যদি একটা দল করা হয় তাহলে তাদেরকে বিশ্বের কোন দল হারাতে পারবে না।
১৯৯৯ সালে পাকিস্তান টেস্ট খেলতে গেলো ভারতে প্রায় ১৬ বছর পর। সেই সময়ের উম্মাদনা কিংবা ইএসপিএন চ্যানেলে কি পরিমাণ প্রচারণা হয়েছিল সেটা বলার মতো না। ভারত পাকিস্তান ক্রিকেট মানে শুধু ক্রিকেট ছিল না – ছিল ক্রিকেটের বাইরেও আরো অনেক কিছু। আর সেটা যদি ফাইনাল ম্যাচ হয় তাহলে তো কোন কথাই নেই।
২
সময়ের পরিক্রমায় অনেক কিছুই পালটে গিয়েছে। পাকিস্তান দূর্বল থেকে দূর্বলতর হয়েছে আর ভারত হয়েছে আরো পরাক্রমশালী। চিরকাল দূর্বল বোলিং নিয়ে চলা ভারতের বর্তমান বোলিং বিশ্বের অন্যান্য যে কোন দলের চাইতে বৈচিত্রপূর্ণ।
ওয়াসিম ওয়াকারকে মাথায় রেখেই বলছি – বুমরাহ হয়তো বা সাদা বলে সর্বকালের সেরা বোলার। রেকর্ড তার পক্ষেই রায় দিবে। ব্যাটারদের এই যুগেও বুমরাহ যেভাবে ব্যাটারদের বেধে রাখে কিংবা প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠায় সেটা অবিশ্বাস্য।
ভারতের ব্যাটারদের কথা তো বলাই বাহুল্য। শচীন সৌরভ সেওয়াগ যাবার পর আসলো রোহিত কোহলি। এখন আবার চলে এসেছে অভিষেক গিল। পাকিস্তানেও একটা সময় গ্রেট ব্যাটারদের আগমন হয়েছিল। হানিফ মোহাম্মদ, জহির আব্বাস কিংবা মিয়াদাদ থেকে শুরু করে সাঈদ আনোয়ার, ইনজামাম, ইউনুস আর ইউসুফ দেরকে সর্বকালের সেরা ব্যাটারদের তালিকায় রাখাই যায়। অথচ বর্তমানে পাকিস্তানে যে ব্যাটাররা আছে তাদেরকে সর্বকালের সেরার তালিকায় দূরে থাকুক, সময়ের সেরার তালিকাতেও রাখা যায় না।
যে বোলিং নিয়ে পাকিস্তান চিরকাল গর্ব করতো সেখানেও চরম হতাশা।
এই দুই দল বর্তমানে ১০ টি ম্যাচ খেললে ৯ দিনই ভারত জিতবে – বাকি একটা দিন হয়তো পাকিস্তান।
৩
সেই একটা দিন কি আজ হতে পারে?
ক্রিকেটের মজাটা এখানেই। সব ম্যাচ জিতে ফাইনালে এসে ধরা খাবার কীর্তি ভারতের কম নেই। সর্বশেষ ওয়ানডে বিশ্বকাপের কথাই ধরুন। গ্রুপপর্বের ম্যাচেও অস্ট্রেলিয়াকে হারালো। কিন্তু ফাইনালে এসে অস্ট্রেলিয়াই শেষ হাসি হাসলো।
আজকের ম্যাচে খন্ড খন্ড লড়াইয়ের মাঝে একটা হচ্ছে শাহীন আফ্রিদী বনাম অভিষেক শর্মার লড়াই। চলতি টুর্নামেন্টে অভিষেক শর্মা করেছেন ২০৪.৬৩ স্ট্রাইক রেট আর ৫১ গড়ে ৩০৯ রান। আর আফ্রিদী গত দুই ম্যাচের প্রথম ওভারেই উইকেট নিয়েছেন।
ক্রিকেট বিশ্ব তাই তাদের দিকে তাকিয়েই থাকবে যে কে জিতবে লড়াইটা।
তবে এর মাঝেও কিছু কথা থাকে।
পাকিস্তান আগে ব্যাট করে যদি অল্প রানে আউট হয়ে যায় তাহলে অভিষেক কোন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে না। সেক্ষেত্রে লড়াইটা অসম হবে। প্রথমে ব্যাট করে পাকিস্তানের ব্যাটাররা যদি একটা লড়াই যোগ্য স্কোর দাড় করাতে পারে সেক্ষেত্রে আফ্রিদীর সাথে লড়াইটা চ্যালেঞ্জিং হবে। কিংবা ভারত যদি প্রথমে ব্যাট করে তাহলেও লড়াইটাতে সমতা থাকে।
৪
খেলার রেজাল্ট যাই হোক না কেন, নিরপেক্ষ দর্শক হিসেবে আমরা চাইবো ম্যাচটা যাতে উপভোগ্য হয়।
সম্ভাবনা ভারতের দিকে বেশী হেলে থাকলেও পাকিস্তান সবসময়ই আনপ্রেডিক্টেবল দল। কাজেই ভারতীয় দলও নিশ্চয়ই তাদেরকে হালকা ভাবে নিবে না। এর সাথে চলতি টুর্নামেন্টে ভারতীয় দল ক্রিকেটের মাঝে যেভাবে রাজনীতি টেনে নিয়ে এসেছে তাতে করে একটা জবাব দেবার তাগিদও নিশ্চয়ই পাকিস্তানীদের ভেতর থাকবে।
সব মিলিয়ে ম্যাচটা উপভোগ্যই হবার কথা।
27/09/2025
#পাকিস্তান_বনাম_ভারতের_যত_ফাইনাল
পাকিস্তান বনাম ভারত – স্বপ্নের ফাইনাল।
ইদানিং যুগে ভারত অনেক এগিয়ে আর পাকিস্তান অনেক পিছিয়ে পড়লেও একটা সময় পর্যন্ত দুই দলের লড়াইয়ে থাকতো বাড়তি উত্তাপ।
ওয়ানডে বিশ্বকাপে দুই দল এই পর্যন্ত ৮ বার মুখোমুখি হলেও কখনো ফাইনালে মুখোমুখি হয়নি। সবচাইতে কাছাকাছি সম্ভাবনা দাড়িয়েছিল ১৯৮৭ বিশ্বকাপে। কিন্তু উপমহাদেশে বিশ্বকাপ হওয়া সত্বেও শক্তিশালী দল নিয়ে দুই দলই সেমি তে হেরে বাদ পড়ে যায়।
টি ২০ বিশ্বকাপের প্রথম আসরে অবশ্য তারা ফাইনাল খেলে।
এবারের এশিয়া কাপেও ফাইনালিস্ট হওয়ায় গত ১৭টি আসরের মধ্যে প্রথম বারের মতো ফাইনালিস্ট তারা।
এই পর্যন্ত বিভিন্ন আসরে (টেস্ট, ওয়ানডে আর ওয়ানডে) সব মিলিয়ে ভারত আর পাকিস্তান ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছে মোট ১০ বার। এর মাঝে পাকিস্তান জিতেছে ৭ বার আর ভারত জিতেছে ৩ বার।
কালকের ফাইনাল ম্যাচ দেখার আগে বিগত ফাইনাল গুলোর দিকে একটু তাকানো যাক।
- বেনসন এন্ড হেজেস বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন শীপ ’৮৫
ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলংকা আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ – তখনকার সব দল নিয়ে অস্ট্রেলিয়াতে টুর্নামেন্টটা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারী-মার্চ জুড়ে। টুর্নামেন্টটা ছিল অনেকটা বিশ্বকাপের মতোই।
ভারত আর পাকিস্তান ফাইনালে গেলেও ভারত ম্যাচটা জিতে ৮ উইকেটে। ৫০ ওভারের মাত্র ১৭৬ রান করে পাকিস্তান। গ্রুপ পর্বের মুখোমুখি লড়াইতেও পাকিস্তান হেরেছিল ভারতের কাছে।
সেই টুর্নামেন্টে সব দিক দিয়েই ভারত আধিপত্য বিস্তার করে। প্রতিটি ম্যাচ জেতার পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী এবং সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীর তালিকায় প্রথম ৩ জনই ছিলেন ভারতীয়।
- অস্ট্রেলেশিয়া কাপ ‘৮৬
এশিয়া মহাদেশের তিন দল পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলংকা আর অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের দুই দল অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডকে নিয়ে টুর্নামেন্টটা হয়েছিল শারজাহতে ১৯৮৬ সালের এপ্রিল মাসে।
নক আউট ভিত্তিক এই টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলে ভারত আর পাকিস্তান। ফাইনালে প্রথমে ব্যাট করে ভারত করে ২৪৫ রান যেটা কিনা তখনকার বিবেচনায় অনেক বড় স্কোর। বোলিং এ একটা পর্যায় পর্যন্ত ভারত জেতার মতো অবস্থাতে ছিল। কিন্তু জাভেদ মিয়াদাদের অসাধারণ একটা ইনিংসের কল্যানে জয় পায় পাকিস্তান।
এটাই সেই ম্যাচ যেখানে শেষ বলে চেতন শর্মাকে ছক্কা মেরে ম্যাচ জিতিয়ে ফেরেন মিয়াদাদ।
- উইলস ট্রফি ’৯১
১৯৯১ সালের অক্টোবর মাসে শারজাহতে উইলস ট্রফি নামে একটা ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্ট হয় যেটাতে অংশ নেয় ভারত, পাকিস্তান আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ফাইনাল খেলে ভারত আর পাকিস্তান। গ্রুপ পর্বেও এই দুই দল পরষ্পরের বিপক্ষে ২ বার মুখোমুখি হয়েছিল যেটাতে ২ দলই একটি করে জয় পায়।
ফাইনালে পাকিস্তান প্রথমে ব্যাট করে ২৬২ রানের একটা স্কোর দাড় করায়। ভারত ৪৬ ওভারে ১৯০ রান করে অলআউট হয়ে যায়। এই ম্যাচেই আকিব জাভেদ ৩০ রানের বিনিময়ে ৭ টি উইকেট পান যা কিনা দীর্ঘসময় ধরে ওয়ানডে ইন্টারন্যাশনালে এক ইনিংসে সবচাইতে বেশি উইকেট শিকারের রেকর্ড ছিল। এই ম্যাচে আকিব জাভেদ হ্যাট্ট্রিক করেন কিন্তু হ্যাট্ট্রিক বলের ৩ টিতেই তিনি আউট করেন এল.বি.ডাব্লিউ এর সাহায্যে।
- পেপসি অস্ট্রেলেশিয়া কাপ ‘৯৪
শারজাহতে ৯৪ সালে আবারও হয় অস্ট্রেলেশিয়া কাপ। ফাইনাল খেলে আবারও ভারত আর পাকিস্তান।
পাকিস্তান প্রথমে ব্যাট করে ২৫০ রানের স্কোর দাড় করায়। জবাব দিতে নেমে ভারত অল আউট হয় মাত্র ২১১ রানে।
- সিলভার জুবলি ইন্ডিপেন্ডেস কাপ ’৯৮
বাংলাদেশে স্বাধীনতার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্ট হয় ভারত, বাংলাদেশ আর পাকিস্তানকে নিয়ে। অনুমিত ভাবেই ফাইনালে উঠে ভারত আর পাকিস্তান।
ওয়াসিম ওয়াকার সেই সময়ে ফর্মের তুঙ্গে থাকলেও ওয়াসিম ইনজুরির জন্য আর ওয়াকার কাউন্টি ক্রিকেটে ব্যস্ত থাকায় দলের সাথে আসতে পারেনি।
ভারত এই সিরিজে প্রচন্ড আধিপত্য দেখিয়ে ফাইনালে উঠে।
ফাইনাল ছিল ৩ ম্যাচের। প্রথম ম্যাচটাও ভারতই জেতে। দ্বিতীয় ফাইনালে পাকিস্তান ফিরে আসে এবং পাকিস্তান জেতার ফলে তৃতীয় ফাইনালটা হয়ে উঠে সত্যিকারের ফাইনাল। তৃতীয় ফাইনালে আগে ব্যাট করে পাকিস্তান গড়ে ৪৮ ওভারে ৩১৪ রান। সেই সময়ে এত রান তাড়া করে কোন দলই জিততে পারেনি।
কিন্তু শচীন টেন্ডুলকারের উড়ন্ত সুচনা, সৌরভ আর রবিন সিং এর বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাটিং আর ঋষিকেত কানিতকারের শেষ ওভারের চার – সব মিলিয়ে ভারত পেলো বিশ্বরেকর্ড গড়া একটি জয়।
- পেপসি কাপ ‘৯৯
ভারতের মাটিতে ভারত, পাকিস্তান আর শ্রীলংকাকে নিয়ে একটা ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্ট হয় ১৯৯৯ সালের মার্চ মাসে।
ইনজুরির জন্য ভারতীয় ব্যাটিং দলের দুই স্তম্ভ শচীন আর আজহার অনুপস্থিত থাকেন। ফাইনালে উঠে ভারত আর পাকিস্তান।
গ্রুপ পর্বের দুইবারের দেখাতেই ভারতকে হারায় পাকিস্তান। ফাইনাল ম্যাচেও শেষ হাসিটা পাকিস্তানই হাসে।
পাকিস্তানের ২৯১ রানের জবাবে মাত্র ১৬৮ রানেই অল আউট হয়ে যায় ভারত।
- কোকাকোলা কাপ ‘৯৯
আবারও শারজাহ এর মাঠ – ভারত, পাকিস্তান আর ইংল্যান্ড কে নিয়ে ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্ট। ফাইনাল খেলে পাকিস্তান আর ভারত। গ্রুপ পর্বে ই দুই দল মুখোমুখি হয়েছিল ২ বার – প্রত্যেকেই জিতেছিল ১ টি করে ম্যাচ।
ফাইনালে প্রথমে ব্যাট করে ভারত দাড় করায় ১২৫ রানের একটা ছোট্ট স্কোর যেটা পাকিস্তান ২৮ তম ওভার আর ২ উইকেট হারিয়েই অতিক্রম করে ফেলে।
ইনজুরির জন্য শচীন টেন্ডুলকার এই টুর্নামেন্টেও খেলতে পারেনি।
- আইসিসি টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপ ‘০৭
আইসিসির প্রথম টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ২০০৭ সালে।
প্রথম বিশ্বকাপেই হয় স্বপ্নের ফাইনাল – পাকিস্তান বনাম ভারত।
গ্রুপ পর্বেও দুই দল মুখোমুখি হয়েছিল একবার। নির্দ্বিষ্ট ওভারে সেই ম্যাচ টাই হওয়ায় পেনাল্টিতে (তখন সেই সিস্টেমই ছিল) ভারত জিতে ম্যাচটা।
ফাইনালে দুই দলের দিকেই ম্যাচ ঘুরছিল। শেষ পর্যন্ত মেসবাহের সেই পাগলাটে স্কুপ শট আর কাপ ভারতের ঘরে।
- কিটপ্লে কাপ ‘০৮
ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশকে নিয়ে ২০০৮ সালে বাংলাদেশের মাঠে হয় ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্ট। ভারত আর পাকিস্তান ফাইনাল খেলে। গ্রুপ পর্বের মুখোমুখিতে ভারত ১৪০ রানের বড় জয় পায় পাকিস্তানের বিপক্ষে। কিন্তু ফাইনালে শেষ হাসিটা হাসে পাকিস্তানই।
প্রথমে ব্যাট করে পাকিস্তান দাড় করায় ৩১৫ রানের একটা বিশাল স্কোর। জবাবে ভারত অলআউট হয়ে যায় ২৯০ রানে।
- আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ’১৭
আট দলের এই টুর্নামেন্টে ভারত পাকিস্তান ছিল একই গ্রুপে। গ্রুপ পর্বের মুখোমুখি ম্যাচে ১২৩ রানের বড় জয় পায় ভারত। কিন্তু ফাইনালে আবারও শেষ হাসিটা হাসে পাকিস্তান।
প্রথমে ব্যাট করে পাকিস্তান ৩৩৮ রান করে। ভারতের লম্বা ব্যাটিং লাইনের পক্ষে এই রান তাড়া করাটা খুব কষ্ট সাধ্য হবার কথা ছিল না।
কিন্তু মোহাম্মদ আমির শুরুতেই একটা অসাধারণ স্পেল করেন। নিজের প্রথম ৬ ওভারে রান দেন মাত্র ১৬ – তুলে নেন রোহিত শর্মা, শিখর ধাওয়ান আর বিরাট কোহলিকে।
ম্যাচ মূলত তখনই শেষ।
পরের দিকে হার্দিক পান্ডিয়া ৪৩ বলে ৭৬ রান করলেও ১৫৮ রানে অল আউট হয় ভারত।