20/06/2024
৫২ বছর বয়সে
১২ দিনে দৌড়ালেন
১ হাজার কি.মি.
১২ দিনে ১০০০ কিলোমিটার দৌড়ে রেকর্ড গড়লেন ৫২ বছর বয়সি নাতালি দাউ! থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরজুড়ে দৌড়ে এই অনন্য কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছেন মহিলা আল্ট্রাম্যারাথন রানার নাতালি। অস্ট্রেলিয়ান বংশোদ্ভূত এই সিঙ্গাপুর নিবাসী প্রতিদিন গড়ে ৮৪ কিলোমিটার করে দৌড়েছেন!
নাতালির এই কীর্তি যে কেবল কঠিন ছিল তা নয়, তিনি যে সব প্রতিকূলতার মুখে পড়েছিলেন, তাতে তাঁর এই সাফল্য একরকম অসম্ভবই হয়ে উঠেছিল বলা যায়। তিনি সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন।
নাতালির এই দৌড়ের প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল, প্রবল গরম। ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি তাপমাত্রায় প্রতিদিন দৌড়ছেন তিনি। রোজ অতিক্রম করেছেন দু'টি ম্যারাথনের সমান দূরত্ব। গরমের জন্য তাঁর রানিং শু গলে গিয়েছিল রাস্তার তাপে। এছাড়াও, দৌড় শুরু করার প্রথম দিনই হিপ জয়েন্টে চোট পান নাতালি। তৃতীয় দিনে তাঁর ইউরিনারি ট্র্যাক ইনফেকশন হয়ে যায়। এই সব চ্যালেঞ্জের মধ্যেই দৌড় চালিয়ে যান তিনি। একটানা ১২ দিন ধরে।
৫ জুন দৌড় শেষ করেন নাতালি। 'দ্রুততম হাজার কিলোমিটার থাইল্যান্ড-সিঙ্গাপুর আল্ট্রাম্যারাথন'-এর রেকর্ডও গড়েন সেই সঙ্গেই। এই ম্যারাথনে নামার জন্য নাতালি গোটা বিশ্বে প্রচার চালিয়েছেন এবং ৫০ হাজার ডলারেরও বেশি টাকা তুলেছেন। এই টাকা তিনি কাজে লাগাবেন স্পোর্টসে বিভিন্ন নারীদের অনুপ্রাণিত করতে।
নাতালি জানান, বয়স্ক ব্যক্তিদের, বিশেষ করে মহিলাদের জন্যই তাঁর এই দৌড়। তিনি চান, সকলেই নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ করুক। তাঁর কথায়, 'কবে শুরু করছেন, প্রথম করছেন নাকি শেষ করছেন, তাতে কিছু আসে যায় না। কিন্তু এমন কিছু করুন, যা আপনি আগে করেননি, যা বিশ্ববাসী সচরাচর করে না।'
এই আল্ট্রাম্যারাথনে নাতালির নিজের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, প্রতিদিনের দৌড়ের ক্লান্তি দূর করে নতুন করে জেগে ওঠা। এক একদিনের দৌড় শেষ করার পরে রোজই তাঁর ভয় করত, পরের দিন হয়তো আর উঠতে পারবেন না, দৌড়তে পারবেন না। হয়তো আর শেষ করতে পারবেন না গোটা রাস্তা। মনে পড়ত পরিবারের কথা। তবু সেই ক্লান্তি, ফোস্কা পড়া পা, পরিবারের কাছে ফেরার অপ্রতিরোধ্য আকাঙ্ক্ষা নিয়েই রোজ ফের দৌড়তে শুরু করতেন তিনি। একসময়ে শেষও করলেন, গড়লেন রেকর্ড।
নাতালির কথায়, 'যেভাবেই হোক দৌড় চালিয়ে যেতে হবে। ফিনিশিং লাইন কতটা দূরে, সেটা নিয়ে ভাবলে হবে না।'
এই দৌড়ের সময় বিবিসিকে পাঠানো মালয়েশিয়ার পূর্ব উপকূল বরাবর কোথাও রেকর্ড করা একটি ভয়েস বার্তায় নাতালি দাউ বলেন, "আমাকে একবারে শুধু এক ধাপ, এক কিলোমিটার যেতে হবে। আল্ট্রা-রানিং আর রানারের মধ্যে সম্পর্কটা (দ্যোদুল্যমান) ভালোবাসা-ঘৃণার সম্পর্কের মতো।"
৫২ বছর বয়সী নাতালি থাইল্যান্ড থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত তাঁর ১ হাজার কিলোমিটার দৌড়ের এক তৃতীয়াংশ কভার করেছিলেন এবং যাত্রাটা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছিল।
"চার দিনের মাথায় আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছি যে আমি আসলেই এই জিনিসটি শেষ করতে পারব কিনা। আমি খেলাধুলার চ্যালেঞ্জ পছন্দ করি, এর মৌলিকতা পছন্দ করি। কিন্তু প্রায় সময়ই মনের মধ্যে উঁকি দেয়া এসব 'কু' ডাককে ঘৃণা করি। আর তারা প্রায়ই চিন্তায় এসে ভিড় করে" তিনি বলছিলেন।
নাতালিকে ঘড়ি ধরে ১২ দিনে তাঁর দৌড় শেষ করার লক্ষ্য অর্জন করতে দিনে কমপক্ষে ৮৪ কি.মি. - দুটি ম্যারাথনের সমতুল্য দূরত্ব পাড়ি দিতে হয়েছিল।
নাতালি একজন আল্ট্রা-রানার। যারা সাধারণত ৪২.২ কি.মি. ম্যারাথনের দৈর্ঘ্যের বেশি দূরত্ব দৌড়ে পাড়ি দেয়, তাদেরকে আল্ট্রা-রানার হিসাবে অভিহিত করা হয়। অ্যাথলেট হিসেবে প্রশিক্ষণ নেননি নাতালি। বয়স যখন ত্রিশের কোটার শেষের দিকে, তখন দৌড়ানো শুরু করেছিলেন তিনি। সুস্থ থাকতে দৌড়ানোর পথ বেছে নেন তিনি।
যদিও বিশ্বব্যাপী দৌড়ের চল রয়েছে এবং বেশিরভাগ তথ্যই বলে যে, পশ্চিমা দেশগুলিতে এই ক্রীড়ার জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এই পরিসংখ্যানে জায়গা করে নেয়া কঠিন। যদিও এই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ তাইওয়ান, কম্বোডিয়া এবং জাপান জনপ্রিয় ম্যারাথন আয়োজন করে।
অপেশাদার অ্যাথলেটদের মধ্য থেকে নাতালি'র মতো চ্যালেঞ্জ গ্রহীতা খুঁজে পাওয়া আরও বেশি কঠিন। কারণ নাতালি'রা যেকোনো সামাজিক ইস্যুকে সামনে রেখে দৌড়ায়। আর প্রায়শই সোশ্যাল মিডিয়াতে তাদের কঠিন রান সম্পর্কে জানান দেয়।
এ বিষয়ে নাতালি বলেন, ‘দৌড়ে আপনি প্রথম হলেন, নাকি সবার শেষে দৌড় শেষ করলেন, সেটা কোনো বিষয় নয়; বরং আপনি অতিমানবীয় একটি কাজ শেষ করেছেন। বিশ্বের শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ মানুষ কখনো এমন কাজটি করতে পারবে না।’
তিনি শেষ পর্যন্ত ৫ জুন সিঙ্গাপুরের ডাউনটাউনে ফিনিস লাইন অতিক্রম করেন। ছুটির দিন না হওয়া সত্ত্বেও কয়েকশ দৌড়বিদ তাকে উৎসাহ দিতে এসেছিলেন। এই উৎসাহদাতারা ছিলেন উজ্জ্বল রানিং গিয়ার পরিহিত। তারা ভোরবেলা শহরের শিল্পাঞ্চলের মধ্য দিয়ে দৌড়ে নাতালিকে সঙ্গ দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা অনেকেই ছিলেন দৈনিক দিনমজুরের মতো, যাদের পিঠে ছিল ব্যাকপ্যাক এবং প্লাস্টিকের লাঞ্চ ব্যাগ। এসব নিয়েই উৎসাহদাতারা নিজেদের কর্মক্ষেত্রে ফিরে গেছেন।
বারো দিনের উত্থান-পতন
বিবিসিকে নাতালি বলেন, ‘এত দীর্ঘ পথ দৌড়ানোর ঘটনা এটাই প্রথম। এর আগে সবচেয়ে বেশি ২০০ কিলোমিটার দৌড়েছিলাম। কিন্তু এবার নিজেকে ভিন্ন ধরনের একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলাম।’
সেপ্টেম্বরে থাই সীমান্ত থেকে মালয়েশিয়া হয়ে সিঙ্গাপুরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। পরের আট মাসে, বেশ কয়েকজন বন্ধু দৌড়ের পরিকল্পনায় সহায়তা করতে যুক্ত হয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে প্রজেক্ট ১০০০ নামে পরিচিত হয়।
"আমি তখন কিছুটা বোকা ছিলাম এবং এ ধরনের দৌড়ের জন্য কী পরিকল্পনা করতে হবে, সে সম্পর্কে খুব কমই জানতাম। আমার দল আমাকে এমন কিছু জিজ্ঞাসা করেছিল যা আমি ভাবিনি। যেমন, তোমার যদি হাসপাতালের প্রয়োজন হয়, তবে কী হবে? আমরা কীভাবে সীমান্ত ক্রসিংয়ের পরিকল্পনা করব? আমাদের কি অনেকগুলো সিকিউরিটি ভ্যান লাগবে?"
১২-দিনের আল্ট্রা-ম্যারাথনের সময় নাতালি বিবিসিতে রাতের ভয়েস নোটগুলি পাঠিয়েছিলেন যাতে প্রতিটি দিনের ভালোমন্দ বিষয়গুলো উল্লেখ থাকতো।
পঞ্চম দিন তিনি বলেছিলেন, "আমরা রাস্তার পাশের একটি স্টল থেকে কিছু নাশতা করছিলাম। এ সময় যাত্রা শুরুর আগে পাঁচ মিনিটের জন্য চারদিকের দৃশ্য প্রাণ ভরে উপভোগ করেছি। এদিন একটি ভাল দিন ছিল। কিন্তু সবগুলো দিনই এমন ভালো হবে, এমন আশা করা বোকামি। আমাদের এখনও অনেক দূর যেতে হবে।"
তিনি এবং তার দল প্রতি রাতে মাত্র দুই থেকে তিন ঘন্টা ঘুমাতেন। কারণ তারা দৌড়ের তৃতীয় দিনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, দিনের তাপমাত্রাকে এড়াতে তাকে মধ্যরাতের পরেই দৌড় শুরু করতে হবে।
"রাত ৮টায় নৈশভোজ শেষ করা এবং সাড়ে এগারটায় আপনার অ্যালার্ম সেট করা খুব মজার নয়," তিনি আরেক বার্তায় বলেছিলেন। প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠা ছিল "সবচেয়ে ভয়ঙ্কর", নাটালি রানের পরে বলেছিলেন। "আমি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবতাম, 'আজ যদি দৌড়াতে না পারি তাহলে কী হবে?'"
"ফিনিশিং লাইন অনেক দূরে, আপনি এমন চিন্তা মাথাতেও আনবেন না। আমি এমনকি প্রতিদিনের ফিনিশিং লাইনটিও দেখিনি। আর ফিনিশিং লাইনটি কেমন, তা না জেনেই আপনাকে এই রানিং জোনে মানসিকভাবে যুক্ত থাকতে হবে। তাহলেই এমন চ্যালেঞ্জ আপনার পক্ষে শেষ করা সম্ভব।"
শেষের কাছাকাছি সময়ে তার শরীর ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। তিনি পায়ের আঙ্গুল প্লাস্টার করেছিলেন। কারণ সবগুলোতে ফোস্কা ছিল।
"আমি হাঁটতে গিয়ে সংগ্রাম করেছি। প্রচন্ড ক্লান্ত ছিলাম এবং শুধু কল্পনা করেছি বাড়িতে ফিরে আমি পরিবারকে দেখতে চাই। মনে মনে ভাবতাম, আমি আগামীকাল উপভোগ করার চেষ্টা করব। কিন্তু সত্যি বলতে [সিঙ্গাপুর] সীমান্ত অতিক্রম করার তর আর সইছিল না।" - তার দশম দিনের নোটের বক্তব্য।
'আল্ট্রা-রানাররা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে চায়'
আল্ট্রা-রানাররা "একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিত্বের ধরন", নাতালি বলেন।
"বিশ্বের কিছু অংশে বাস করা বেশ আরামদায়ক। [তাই] লোকজন একটু বেশি চ্যালেঞ্জের খোঁজ করছে। আর এক্ষেত্রে আল্ট্রা-রান সত্যিই একটি ভাল উপায়।"
ব্যক্তিগত অর্জনের এই উপলদ্ধির বাইরে গিয়ে নাতালি'র আশা ছিল যে প্রকল্প ১০০০ মহিলাদের ক্ষমতায়ন করবে। তার এই উদ্যোগে একটি দাতব্য তহবিল প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩৭ হাজার মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছে। এই প্রকল্প আরও বেশি মেয়ে ও মহিলাদের খেলাধুলা করতে উৎসাহিত করে৷
"লোকেরা দান করুক বা না করুক, এটি একটি বার্তা পৌঁছানোর প্ল্যাটফর্ম ছিল," নাতালি বলেন। "এছাড়াও, একজন বয়স্ক মহিলা হিসাবে এটি করে আমি সত্যিই লোকদের কাছে প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম যে, আপনি [নিজেদের] চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। আমরা কেবল আমাদের নিজেদের চিন্তার মাধ্যমেই আবদ্ধ থাকি।"
এই স্তরের আল্ট্রা-রানিং পরিচালনা করাও একটা বিশেষ কিছু। কারণ এতে সময়, স্পন্সর এবং সাপোর্ট টিমের প্রয়োজন হয়। হংকং-ভিত্তিক আল্ট্রা-রানার জন এলিস এ প্রসঙ্গে বলেন, "আপনার এক জোড়া জুতা ছাড়া আর কিছুই লাগবে না। আর দৌড়ের সামাজিক এবং প্রতিযোগীতামূলক দিকটি মজার। এই পৃথিবী একটি বড়, চমৎকার জায়গা। দৌড়ের মাধ্যমে আপনি নিজের সীমাবদ্ধতাকে ঠেলে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং নিজের সম্পর্কে নতুন জিনিস খুঁজে বের করে সেখান থেকে সামনে এগিয়ে যেতে পারবেন। আর এটা উপভোগ করতেও ভালো লাগে।"
মেরি হুই, হংকং-ভিত্তিক একজন সাংবাদিক যিনি দূর-দূরান্তের ট্রেইল-রান করেন, তিনি বলেন, "একটি বড় দলে দৌড়ানোর আগে এবং পরে প্রচুর মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতা হয়। এই লোকদের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা প্রশিক্ষণ নিতে হয়। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, সেরা রানারেরও ট্রেইলে খারাপ দিন যেতে পারে। এর মাধ্যমে আমরা জীবনের বাধাগুলি কমিয়ে আনতে পারি।"
নাতালিকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে রান সম্পূর্ণ করার রোমাঞ্চ সম্পর্কে, তিনি বলেছিলেন, "অ্যাডভেঞ্চার এবং অভিজ্ঞতা ... এটিই মূল্যবান"।
সূত্র : বিবিসি।