03/10/2026
শ্বশুরের ছিল দুটো সোনার ডিম পাড়া হাঁসের মতো বাড়ি। বড় ছেলে আর মেজো ছেলেকে একটা করে বাড়ি লিখে দেওয়ার পর আমার স্বামীকে দেখে শ্বশুর শুধু বলেছিলেন,
“তোর তো বউ আছে, তোর জন্য আর কী লাগবে?”
সবাই হেসেছিল। আমিও সেদিন কথাটাকে নিছক ঠাট্টা ভেবেছিলাম।
কিন্তু শ্বশুর মারা যাওয়ার ঠিক দুই সপ্তাহ পর এমন এক সত্যি আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল, যার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না!
আজও সেই কথাটা মনে পড়লে বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে।
আমার নাম সায়মা। আমার স্বামীর নাম নাবিল। বিয়ের পর থেকে আমরা খুব সাধারণভাবেই সংসার করে আসছি। আমাদের চাহিদাও খুব বেশি ছিল না। স্বামী যা আয় করত, তা দিয়েই কোনো রকমে সংসার চলত। কখনো ভালো দিন গেছে, কখনো টানাটানির দিন গেছে। তবু আমরা দুজনই একটা কথাই বলতাম—
“আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ যতটুকু দিয়েছেন, সেটুকুই আমাদের জন্য যথেষ্ট।”
আমার শ্বশুর আবদুল কাদের সাহেব ছিলেন অন্যরকম মানুষ। জীবনে অনেক কষ্ট করেছেন। শূন্য হাতে শুরু করে ধীরে ধীরে নিজের ভাগ্য নিজেই গড়েছিলেন। বহু বছর আগে শহরের ব্যস্ত একটা এলাকায় তিনি পাশাপাশি দুটো বড় বাড়ি করেছিলেন।
নিচতলায় দোকান, ওপরের তলাগুলোতে ভাড়া।
মাসের শুরু হলেই দুই বাড়ি থেকে যে পরিমাণ ভাড়া উঠত, সেটা আমাদের মতো সাধারণ পরিবারের কাছে কল্পনার মতো মনে হতো। সত্যি বলতে, ওই দুই বাড়ি ছিল আমাদের শ্বশুরের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
শ্বশুরের তিন ছেলে।
বড় ছেলে ফারহান, মেজো ছেলে মাহিন আর সবার ছোট আমার স্বামী নাবিল।
ফারহান আর মাহিন দুজনই বাবার সঙ্গে অনেকটা ব্যবসার কাজ দেখাশোনা করত। আর নাবিল নিজের মতো করে একটা ছোট চাকরি করত। বাবার সম্পত্তির দিকে তার কোনোদিনই খুব একটা নজর ছিল না।
বরং নাবিল সবসময় বলত,
“আব্বা সারাজীবন কষ্ট করে যা বানিয়েছেন, উনি যতদিন বেঁচে আছেন, সব উনারই। আমরা উনার কাছ থেকে ভালোবাসা পেলেই খুশি।”
কথাটা শুনে আমি অনেকবার স্বামীকে বলেছি,
“তুমি একটু নিজের কথাও ভাবো। সবসময় এত উদাসীন থাকলে হবে?”
নাবিল হেসে বলত,
“আমার কী দরকার? আল্লাহ আমাকে সুস্থ রেখেছেন, তোমাকে দিয়েছেন, একটা ছেলে দিয়েছেন—আমার তো অনেক কিছুই আছে।”
সেই মানুষটাকেই কয়েক মাস পর আমি নিজের চোখের সামনে ভেঙে পড়তে দেখেছিলাম।
শ্বশুরের শরীর যখন ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছিল, তখন একদিন তিনি বাড়ির সবাইকে ডেকে পাঠালেন।
সেদিন দুপুরে আমরা সবাই তার ঘরে বসেছিলাম।
ফারহান, মাহিন, তাদের স্ত্রী, আমরা—সবাই।
শ্বশুর বিছানায় হেলান দিয়ে বসেছিলেন। মুখটা আগের চেয়ে অনেক শুকিয়ে গিয়েছিল। চোখের নিচে কালি পড়েছিল। তবু চোখ দুটো তখনও আগের মতোই তীক্ষ্ণ।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
“আমি জানি না আর কতদিন আছি। তাই আমার যা কিছু আছে, আমি জীবিত থাকতেই তোমাদের মধ্যে ভাগ করে দিতে চাই।”
ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে গেল।
ফারহানের মুখে চাপা উত্তেজনা। মাহিনও চুপচাপ বাবার দিকে তাকিয়ে ছিল।
শ্বশুর প্রথমে বড় ছেলে ফারহানের দিকে তাকালেন।
তারপর বললেন,
“বড় বাড়িটা তোর নামে করে দিলাম।”
ফারহানের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
কাগজপত্র বের হলো। সাক্ষী হলো। আইনজীবীর সামনে সবকিছু ঠিকঠাক সম্পন্ন হলো।
এরপর শ্বশুর মেজো ছেলে মাহিনকে ডাকলেন।
“আর ছোট বাড়িটা তোর।”
মাহিনও বাবার হাত ধরে বলল,
“আব্বা, আপনি এত কিছু করছেন কেন?”
কথাটা বললেও তার চোখেমুখে যে আনন্দ, সেটা লুকানোর কোনো চেষ্টা ছিল না।
সবকিছু যখন প্রায় শেষ, তখন হঠাৎ আমার স্বামীর দিকে সবার চোখ গেল।
নাবিল এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল।
আমি তার পাশে বসেছিলাম। আমার বুকের ভেতর তখন অদ্ভুত একটা ধুকপুকানি।
কারণ দুটো বাড়িই যখন দুই ভাই পেয়ে গেল, তখন স্বামীর জন্য কী থাকবে?
শ্বশুর কিছুক্ষণ নাবিলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি এনে বললেন,
“আর তুই নাবিল… তোর তো বউ আছে। তোর জন্য আর কী দরকার?”
এক মুহূর্তের নীরবতা।
তারপর ঘরটা হাসিতে ভরে গেল।
আমার দুই জা তো হাসতে হাসতে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিল।
একজন বলল,
“ছোট ভাইয়ের তো সবচেয়ে বড় সম্পদ আছেই!”
আরেকজন হেসে বলল,
“ভাবি তো আছেনই, আর কী চাই!”
সবাই মজা করছিল।
কিন্তু আমি দেখলাম, আমার স্বামীর মুখের হাসিটা কেমন যেন শুকিয়ে গেল।
সে কিছু বলল না।
শুধু বাবার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“আমি কিছু চাই না আব্বা। আপনি ভালো থাকলেই হবে।”
তারপর উঠে বাবার হাতে চুমু খেয়ে বেরিয়ে এলো।
আমি তার পেছন পেছন ঘর থেকে বের হলাম।
সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় দেখলাম, নাবিল একবারও আমার দিকে তাকাচ্ছে না।
বাইরে এসে আমি বললাম,
“মন খারাপ করেছ?”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“না।”
আমি বুঝেছিলাম, কথাটা সত্যি না।
তারপরও আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি।
কারণ আমি জানতাম, সে বাবাকে কষ্ট দিতে চায় না।
কিন্তু সেদিনের পর থেকেই আমাদের জীবনটা একটু একটু করে বদলে গেল।
আমার দুই জা যখনই আমাদের সামনে পড়ত, কথার মধ্যে খোঁচা থাকত।
একদিন বড় জা রুবাইয়া আমার পাশে এসে বলল,
“সায়মা, তোমার জায়গায় আমি হলে কিন্তু চুপ করে থাকতাম না।”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
“কেন?”
সে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“আরে, তোমাদের তো কিছুই হলো না! একটা বাড়ির ভাড়ার টাকা দিয়ে কত কিছু করা যায় জানো? তুমি তোমার শ্বশুরকে একটু বুঝিয়ে বলো না?”
আমি শান্তভাবে বলেছিলাম,
“আমাদের যা আছে, আল্লাহর রহমতে তাতেই তো চলে যাচ্ছে।”
সে হেসে বলেছিল,
“চলে যাওয়া আর ভালোভাবে চলা এক জিনিস না, ভাবি।”
পাশ থেকে মেজো জা নুসরাতও হেসে উঠেছিল।
“তা ঠিক। এত বড় বাড়ি দুই ভাই পেল, আর নাবিল পেল কী? বউ!”
দুজনেই আবার হেসেছিল।
আমি মুখে কিছু বলিনি।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।
কারণ সম্পত্তি না পাওয়ার কষ্ট যতটা ছিল, তার চেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছিল—আমার স্বামীকে এভাবে ছোট করা হচ্ছে দেখে।
নাবিল অবশ্য এসব নিয়ে কাউকে কিছু বলত না।
বরং বাড়িতে ফিরে আমাকে বলত,
“তুমি এসব কথায় মন দিও না। আব্বা যা করেছেন, নিশ্চয়ই ভেবেচিন্তেই করেছেন।”
আমি জিজ্ঞেস করতাম,
“তুমি কি সত্যিই কষ্ট পাওনি?”
সে অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলত,
“বাবার কাছ থেকে আমি কিছু চাইনি। শুধু চাইছিলাম, উনি যেন আমাকে নিজের ছেলে হিসেবেই দেখেন।”
সেই কথাটা শুনে আমার বুকটা কেমন করে উঠত।
কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাতটা এল আমাদের দশ বছরের ছেলে ইহানের কাছ থেকে।
একদিন বিকেলে আমি রান্নাঘরে কাজ করছিলাম।
হঠাৎ দেখি ইহান চোখ মুছতে মুছতে আমার কাছে এসেছে।
আমি সঙ্গে সঙ্গে কাজ ফেলে তার কাছে গেলাম।
“কী হয়েছে বাবা? কাঁদছ কেন?”
ইহান আমার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“আম্মু… দাদা কি আমাদের ভালোবাসে না?”
আমার বুকটা ধক করে উঠল।
আমি ওর মুখটা নিজের দিকে তুলে বললাম,
“এ কথা কে বলেছে?”
ইহান চোখের পানি মুছে বলল,
“চাচাতো ভাইরা বলেছে।”
“কী বলেছে?”
ইহান এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
“ওরা বলেছে, দাদা বড় চাচা আর মেজো চাচাকে বাড়ি দেবে। আমাদের কিছু দেবে না। দাদা নাকি আমাদের পছন্দই করে না।”
আমি কিছুক্ষণ কথা বলতে পারিনি।
দশ বছরের একটা বাচ্চার মুখে এমন কথা শুনে মনে হচ্ছিল কেউ যেন আমার বুকের ভেতর ছুরি চালিয়ে দিয়েছে।
আমি ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললাম,
“কে বলেছে তোমাকে এসব? তোমার দাদা তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। আর এসব কথা আর কখনো বলবে না। দাদা এখনো বেঁচে আছেন, আল্লাহ তাকে সুস্থ রাখুন। কার কী হবে, এসব নিয়ে কথা বলা ঠিক না।”
ইহান চোখ মুছতে মুছতে বলল,
“কিন্তু আম্মু, আমি কি খারাপ?”
আমি সঙ্গে সঙ্গে ওর মুখ চেপে ধরে বললাম,
“না বাবা। তুমি খুব ভালো ছেলে। কেউ কিছু বললে তুমি বিশ্বাস করবে না।”
সেদিন রাতে ইহান ঘুমিয়ে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ আমি চুপ করে বসে ছিলাম।
আমার মনে শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—
শ্বশুর কেন এমন করলেন?
তিনি কি সত্যিই নাবিলকে কিছু দিতে চাননি?
নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে?
আমি জানতাম না।
আর নাবিল?
সে আগের মতোই বাবার খোঁজ নিত।
প্রতিদিন ফোন করত।
প্রয়োজনে ছুটে যেত।
যেন কিছুই হয়নি।
কিন্তু আমি জানতাম, ভেতরে কোথাও একটা ক্ষত তৈরি হয়েছে।
এরপর বেশি সময় আর কাটেনি।
শ্বশুরের শরীর আরও খারাপ হয়ে গেল।
একদিন ভোরের দিকে তিনি আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন।
সেদিন আমাদের বাড়িটা কান্নায় ভরে গিয়েছিল।
কিন্তু সেই কান্নার মধ্যেও আমি কিছু মানুষের চোখে অন্যরকম হিসাব দেখতে পাচ্ছিলাম।
আমার দুই জা বারবার নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছিল।
বড় ভাই আর মেজো ভাইও যেন বারবার সম্পত্তির কাগজপত্রের কথা বলছিল।
আমি কাউকে দোষ দিচ্ছি না।
মানুষের মন কে জানে?
তবু আমার স্বামীর অবস্থা ছিল একেবারে আলাদা।
সে বাবার লাশের পাশে বসে শুধু কাঁদছিল।
বারবার বাবার হাতটা ধরে বলছিল,
“আব্বা, আমাকে মাফ করে দিয়েন।”
আমি পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে ভাবছিলাম—
যে মানুষটা জীবনে বাবার কাছে কিছু চায়নি, আজ তার চাওয়া শুধু একটাই—বাবার ক্ষমা।
জানাজা, দাফন, আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা—সব মিলিয়ে কয়েকটা দিন কেটে গেল।
বাড়ির মানুষ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করল।
কিন্তু আমাদের জন্য তখনও একটা অদৃশ্য ভার রয়ে গেল।
শ্বশুরের মৃত্যুর দুই সপ্তাহ পর, এক সকালে হঠাৎ এমন একটা ঘটনা ঘটল, যার পর পুরো বাড়ির পরিবেশ বদলে গেল।
ফারহান আর মাহিন দুজনেই তখন নিজেদের নতুন সম্পত্তি নিয়ে ব্যস্ত।
ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে কথা বলছে, কাগজপত্র দেখছে, কে কত ভাড়া দেয়—এসব হিসাব করছে।
আমরা কেউই বুঝতে পারিনি, আসল ঝড়টা তখনও আসেনি।
সেদিন দুপুরে একটা খবর এলো।
খবরটা শোনার পর প্রথমে কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না।
তারপর যখন কাগজটা সবার সামনে রাখা হলো, ঘরের মধ্যে এমন নীরবতা নেমে এলো যে কারও নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছিল।
আমি নাবিলের দিকে তাকালাম।
নাবিলও স্থির হয়ে সেই কাগজটার দিকে তাকিয়ে ছিল।
আর ঠিক তখনই আমার মনে পড়ল শ্বশুরের সেই কথাটা—
“তোর তো বউ আছে। তোর জন্য আর কী দরকার?”
সেদিন সবাই হেসেছিল।
কিন্তু এখন মনে হচ্ছিল…
ওই কথার আড়ালে এমন কিছু লুকিয়ে ছিল, যা আমরা কেউই বুঝতে পারিনি।
সেদিন প্রথমবার মনে হলো, আমার শ্বশুর হয়তো নাবিলকে কিছুই না দিয়ে যাননি।
বরং তিনি যা রেখে গেছেন, তার আসল অর্থ আমরা এতদিন কেউ বুঝতেই পারিনি।
আর সেই সত্যিটা সামনে আসার পর…
সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছিল আমার দুই জা।
চলবে…
নীরব_ইশারা
[লেখক গল্প_ঘর ]
১ম_পর্ব