13/03/2016
যান তামিমের ওপেনিং সঙ্গী।
গ্যালারিতে ‘ম্যারি মি সাব্বির’ প্ল্যাকার্ড নিয়ে আসা
তরুণীকে হতাশ করে সাব্বিরও তাঁকে ছেড়ে গেলেন কিছুক্ষণ পরই। অন্য প্রান্তে ব্যাটসম্যানদের সেই যাওয়া-আসা
চলতেই থাকল। এর মধ্যেও অবিচল থেকে ঠান্ডা মাথায়
বাংলাদেশকে যেভাবে উদ্ধার করলেন তামিম ইকবাল,
এটির সঙ্গে কি তাঁর পিতৃত্বের কোনো সম্পর্ক আছে?
প্রশ্নটাতে তামিম ইকবাল খুব মজা পেলেন। তাঁর হাসি
ছড়িয়ে পড়ল সাংবাদিকদের মধ্যেও। উত্তরটা অবশ্য সিরিয়াস ভঙ্গিতেই দিলেন, ‘আমার এমন কিছু মনে হয় না।
গত বিপিএল, পিএসএলেও তো আমি এভাবেই ব্যাটিং
করেছি। তখনো তো আমি বাবা হইনি।’ পরিণতিবোধ বলুন বা দায়িত্ববোধ, এটি যোগ হয়ে বেশ
কিছুদিন ধরেই তিনি একটু বদলে যাওয়া তামিম ইকবাল।
কাল ধর্মশালায় তাতে আরেকটি অধ্যায় যোগ হলো। অন্য
ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার মধ্যে সদর্পে দাঁড়িয়ে থাকা
তামিম ইকবাল যেন মাঠের পশ্চাৎপট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা
ওই পাহাড়। ‘সদর্প’ শব্দটা অবশ্য ভুল বোঝাতে পারে। ৫৮ বলে ৮৩ রানের ইনিংসে ৬টি চার ও ৩টি ছয় কি আর
‘তামিমীয়’ ইনিংস নাকি! যে তামিম টেস্টের প্রথম দিন
লাঞ্চের আগেই প্রায় সেঞ্চুরি করে ফেলেছিলেন, স্ট্রোক
প্লের সেই দর্প সেভাবে কোথায় দেখা গেল কাল?
এখানেই তামিমের কালকের ইনিংসটি ভিন্ন মহিমা পেয়ে
যাচ্ছে। সহজাত আক্রমণাত্মক খেলার বদলে পরিস্থিতি তাঁর কাছে শেষ পর্যন্ত থাকার দাবি তুলছিল। কী
দারুণভাবেই না তা মেটালেন! উইকেটও অবশ্য একটা
কারণ। নেমেই বুঝে ফেলেছেন, এত দিন যা শুনে এনেছেন,
ধর্মশালার উইকেট তেমন নয়। তখনই তাই ঠিক করে ফেলেন,
এখানে একটু ধরে খেলতে হবে।
টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের অনেক আক্ষেপের মধ্যে এটিও একটি যে, এখানে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের
এখনো কোনো সেঞ্চুরি নেই। কালও যে সেই আক্ষেপ দূর
হলো না, তাতে তামিমেরই বেশি আক্ষেপ থাকার কথা।
শেষ ওভার যখন শুরু হলো, ক্ষীণতম হলেও সম্ভাবনাটা
বেঁচে ছিল। তামিম তখন ৭৬ রানে। প্রথম বলেই ছক্কা
মেরে সেঞ্চুরিটা খুবই সম্ভব বলে মনে করালেন। কিন্তু পরের বলে ১ রান নিয়ে নেওয়ায় আর স্ট্রাইকই পেলেন না।
টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বারের মতো পুরো
২০ ওভার ব্যাটিং করলেন। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ঢাকায় তাঁর অপরাজিত ৮৮ টি-
টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ। সেদিন
হয়তো সম্ভাবনাটা আরও বেশি ছিল। কিন্তু শেষ ওভারে একবারের জন্যও স্ট্রাইকই পাননি।
তা নিয়ে একটু আক্ষেপ থাকলেও থাকতে পারে, কাল তা
একদমই নেই। সেঞ্চুরির কথা নাকি কখনো ভাবেনইনি!
কেন ভাবেননি? ওই যে পরিস্থিতির দাবি! ‘১৫ নম্বর
ওভারে যখন রিয়াদ ভাই (মাহমুদউল্লাহ) ও মুশফিক আউট
হয়ে গেল, এর পর আমার মাথায় একটাই চিন্তা ছিল, স্কোরটা কমপক্ষে ১৫০ করতে হবে। ওই সময় দুটি উইকেট
পড়ে না গেলে হয়তো অন্যভাবে খেলতাম’—বলার সময়
তামিমের মুখে সেঞ্চুরি না পাওয়ার আক্ষেপের বদলে দলকে
লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারার তৃপ্তি।
তিন ধরনের ক্রিকেটেই বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ
ইনিংস তাঁর। তবে টেস্ট আর ওয়ানডের তুলনায় টি- টোয়েন্টির তামিম বরাবরই একটু অনুজ্জ্বল থেকেছেন।
অথচ তামিমের ব্যাটিংয়ের ধরনে উল্টোটা হওয়াই ছিল
স্বাভাবিক। সুসময় একটা এসেছিল, যখন পাঁচ ম্যাচে ৩টি
ফিফটি করে ফেলেছিলেন। এর প্রথম দুটি এই হল্যান্ডের
বিপক্ষেই টানা দুই ম্যাচে। শেষটি ওয়েস্ট ইন্ডিজের
বিপক্ষে ওই অপরাজিত ৮৮। এর পর দীর্ঘ খরা। টি-টোয়েন্টিতে আবারও ফিফটির
দেখা পেতে মাঝখানে কেটে গেছে প্রায় সোয়া তিন বছর
ও ২২টি ইনিংস। টি-টোয়েন্টির ব্যাটিংটা ধরতে তাঁর
একটু বেশিই সময় লেগে গেছে বলে স্বীকার করছেন নিজেও,
‘টি-টোয়েন্টিতে আমি আমার প্রতিভার প্রতি সুবিচার
করিনি। এ নিয়ে আমি কোচিং স্টাফ, দলের সিনিয়র খেলোয়াড় অনেকের সঙ্গেই কথা বলেছি। গত কিছুদিন
ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টগুলোতে ভালোও
খেলেছি।’
১৫০ করার যে লক্ষ্য ছিল, তা থেকে ৩ রান বেশিই হয়েছে।
তার পরও ম্যাচটা বাংলাদেশের হাত থেকে প্রায়
বেরিয়েই যাচ্ছিল। এই জয়ে তাই সম্মিলিত প্রচেষ্টার জয়গান শুনছেন তামিম। মাশরাফির করা ম্যাচের সবচেয়ে
আলোচিত ওভারটির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন, তাসকিন ও
আল আমিনের জন্যও বরাদ্দ থাকল পিঠ চাপড়ানো, ‘আমাদের
পেসাররা যেভাবে বোলিং করেছে, তাতে যা-ই বলি না
কেন, কম হয়ে যাবে।’
পাশে বসে মাশরাফি বিন মতুর্জা তখন হাসছেন। যতটা না আনন্দের হাসি, তার চেয়ে বেশি স্বস্তির।
হল্যান্ডকে পেরোনো মানেই যে সুপার টেনে এক পা
দিয়ে রাখা! স্কোরকার্ড টস: হল্যান্ড
বাংলাদেশ
রান বল ৪ ৬
তামিম অপরাজিত ৮৩ ৫৮ ৬ ৩
সৌম্য ক বারেসি ব ফন মিকেরেন ১৫ ১৩ ২ ০
সাব্বির এলবিডব্লু ব ফন ডার মারউই ১৫ ১৫ ১ ১ সাকিব ক মাইবুর্গ ব বোরেন ৫ ৭ ০ ০
মাহমুদউল্লাহ ব ফন ডার গুগটেন ১০ ৯ ১ ০
মুশফিক ব ফন ডার গুগটেন ০ ২ ০ ০
নাসির ক বুখারি ব ফন মিকেরেন ৩ ৭ ০ ০
মাশরাফি ক কুপার ব ফন ডার গুগটেন ৭ ৫ ০ ১
আরাফাত অপরাজিত ৮ ৪ ০ ১ অতিরিক্ত (লেবা ৪, ও ৩) ৭
মোট (২০ ওভারে, ৭ উইকেটে) ১৫৩
উইকেট পতন: ১-১৮ (সৌম্য, ৩.১ ওভার), ২-৬০ (সাব্বির,
৮.৩), ৩-৭৮ (সাকিব, ১০.৫), ৪-১১১ (মাহমুদউল্লাহ, ১৪.৩),
৫-১১২ (মুশফিক, ১৪.৫), ৬-১২৭ (নাসির, ১৭.৪), ৭-১৩৭
(মাশরাফি, ১৮.৫)। বোলিং: বুখারি ৪-০-৩১-০, ফন ডার গুগটেন ৪-০-২১-৩ (ও
১), ফন মিকেরেন ৪-০-১৭-২ (ও ১), ফন ডার মারউই
৩-০-২৮-১ (ও ১), ফন বিক ৪-০-৪৩-০, বোরেন ১-০-৯-১।
হল্যান্ড
মাইবুর্গ ব নাসির ২৯ ২৯ ৫ ০
বারেসি ক সাব্বির ব আল আমিন ৯ ১১ ১ ০ বেন কুপার ব সাকিব ২০ ১৫ ৩ ০
বোরেন ক নাসির ব সাকিব ৩০ ২৮ ৩ ০
টম কুপার ক আরাফাত ব আল আমিন ১৫ ১৮ ২ ০
ফন ডার মারউই ক মুশফিক ব মাশরাফি ১ ৩ ০ ০
সিলার অপরাজিত ৭ ৮ ১ ০
বুখারি রানআউট ১৪ ৫ ১ ১ ফন বিক অপরাজিত ৪ ৩ ০ ০
অতিরিক্ত (বা ৫, লেবা ১০, ও ১) ১৬
মোট (২০ ওভারে, ৭ উইকেটে) ১৪৫
উইকেট পতন: ১-২১ (বারেসি, ৪.৩), ২-৫৩ (মাইবুর্গ, ৮.১),
৩-৭৭ (বেন কুপার, ১১.২), ৪-১১২ (বোরেন, ১৫.৬), ৫-১১৪
(ফন ডার মারউই, ১৬.৪), ৬-১২১ (টম কুপার, ১৮.১), ৭-১৪০ (বুখারি, ১৯.২)।
বোলিং: তাসকিন ৪-০-২১-০, আল আমিন ৩-০-২৪-২ (ও ১),
আরাফাত ২-০-১০-০, নাসির ২-০-২৪-১, মাহমুদউল্লাহ
১-০-৮-০, মাশরাফি ৪-০-১৪-১, সাকিব ৪-০-২৯-২।
ফল: বাংলাদেশ ৮ রানে জয়ী।
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: তামিম ইকবাল।