10/03/2026
সিন্ধু -হিন্দোল
কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর ' সিন্ধু -হিন্দোল' কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৭ সালে। এটিকে কবির কাব্যজীবনের এক অন্তর্মুখী ও আবেগময় অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা যায়। 'অগ্নিবীণা' কাব্যগ্রন্থে কবির অগ্নিময় উচ্চারণের পর এই কাব্যে দৃশ্যমান হয় এক গভীর প্রেমিক মানসের আত্মবেদনা। অর্থাৎ বিদ্রোহী কবি নজরুল যে গভীর প্রেমেরও কবি তা এই কাব্যগ্রন্থে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।‘বিদ্রোহী’ কবিতার দ্রোহী উচ্চারণের পর এখানে সন্ধান মেলে এক গভীর প্রেমিক কবির। এই কাব্যগ্রন্থে প্রেমের প্রকাশ স্থির নয় বরং সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উত্তাল, দোলায়মান। কবিতাগুলো বহুমাত্রিক। এর বিষয়ও বিস্তৃত।ব্যক্তিগত বেদনা থেকে আধ্যাত্মিক উত্তরণের পথেও তার যাত্রা। কেউ কেউ নজরুলের ব্যক্তিগত জীবনের প্রসঙ্গের উল্লেখ করতে চান। নজরুলের কবিতায় আবেগপ্রবণতা একটি নিয়মিত প্রবণতা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেটি ঠিক মোহনীয় নয়৷ আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার, আলংকারিক ও সঙ্গীতময় ভাষা কবিতাগুলোর অনন্য বৈশিষ্ট্য। শুরুর কবিতাগুলো চট্টগ্রামে বসে লেখা। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে ' নাহার' ও 'বাহারকে'। ২০২৭ সালে বইটি প্রকাশের শতবর্ষ পূর্ণ করবে। নজরুলের কবিতাপাঠের ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিবেচনাযোগ্য,তা হলো নজরুলকে তাঁর সৃষ্টির অখন্ডতায় বিশ্লেষণ করতে হবে। নাহলে নজরুলকে কোথাও কোথাও ম্লান মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
© ইয়াসির আরাফাত
13/02/2026
কবিতা সংগ্রহ ১- মাসুদার রহমান : সংক্ষিপ্ত পাঠপ্রতিক্রিয়া
সমকালীন বাংলা কবিতার জগতে মাসুদার রহমান এক উজ্জ্বল নাম।তাঁর কবিতা বহুপথ গামী, বহুস্বরের মেলবন্ধন তার মধ্যে লক্ষ্যণীয়। সহজসরল বাক্যে গভীর ভাবের উড়াল তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। কবিতায় অন্তর্জাগতিকতা ও সামাজিক বাস্তবতার সমান্তরাল উপস্থিতি। কবিতায় একদিকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সংযোগ ও স্মৃতির আলোছায়া, অন্যদিকে সময়,সমাজ ও মানুষের ভাঙাচোরার ছবিও তাতে ফুটে ওঠে। মাসুদার রহমান দৃশ্যকল্পের কবি। তাঁর কবিতায় একের পর এক দৃশ্য হাজির হয় জাদুবস্তবতার ছদ্মবেশে।কবিতার সাথে, জীবনের সাথে ছুটতে থাকে ইতিহাসের ঘোড়া৷ 'ঘোড়া ' শব্দটিও তাঁর কবিতায় গতিময় কালের প্রতীক হয়ে ফুটে থাকে।মাসুদার রহমানের কাব্যভাষা সংযত, স্বচ্ছ ও আবেগনিয়ন্ত্রিত। তিনি অপ্রয়োজনীয় অলংকার বা উচ্চকিত উচ্চারণ এড়িয়ে চলেন।বরং নীরবতা, বিরতি এবং সংক্ষিপ্ত চিত্রকল্পের মাধ্যমে গভীর অনুভূতি প্রকাশ করেন। প্রেমও তাঁর কবিতায় বহুমাত্রিক। এখানে প্রেম কেবল রোমান্টিক আকর্ষণ নয়; বরং স্মৃতি, বিচ্ছেদ, অপূর্ণতা ও অস্তিত্ববোধের সঙ্গে জড়িত। মাসুদার রহমানের কবিতা সমকালীন বাংলা কবিতায় এক সংযত কিন্তু দৃঢ় স্বর—যেখানে শব্দের চেয়ে অনুভবের গভীরতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কবিতা পাঠককে তীব্র আবেগে আঘাত না করে, ধীরে ধীরে চিন্তার ভেতর প্রবেশ করে এবং দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন সৃষ্টি করে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই মাসুদার রহমানের কবিতা অবশ্যপাঠ্য।
-ইয়াসির আরাফাত
বই: কবিতা সংগ্রহ ১- মাসুদার রহমান
বিষয়: বাংলা কবিতা
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২০৮
প্রকাশনী: বেহুলাবাংলা, ঢাকা
সাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৫
মূল্য:৫০০ টাকা
© ইয়াসির আরাফাত
20/01/2026
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর 'চার অধ্যায় ' উপন্যাস প্রসঙ্গে :
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'চার অধ্যায়' বাংলা উপন্যাসের ধারায় যেমন একটি ব্যতিক্রমী সৃষ্টি, তেমনি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যধারায়ও এটি ভিন্নভাবে চিহ্নিত হয়ে থাকে।সাহিত্য সমালোচক শ্রী শ্রীশচন্দ্র দাশ এটিকে সামাজিক উপন্যাস শ্রেণিভুক্ত করেছেন।এ ধরনের উপন্যাসে সমাজের রাষ্ট্রিক,অর্থনৈতিক বা ধর্মীয় বিষয়বস্তুর অবতারণা থাকে৷ সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের 'চার অধ্যায়' উপন্যাসের সমগোত্রীয় উপন্যাসগুলো - বঙ্কিমচন্দ্রের বিষবৃক্ষ, কৃষ্ণকান্তের উইল;শরৎচন্দ্রের গৃহদাহ, পল্লী সমাজ, পথের দাবী, প্রফুল্ল সরকারের 'বিদ্যুৎ -লেখায়' প্রভৃতি। এই উপন্যাসটিকে যদি আরও নির্দিষ্ট করে রাজনৈতিক উপন্যাস বলা যায় সেক্ষেত্রে প্রথমেই শরৎচন্দ্রের 'পথের দাবী ' উপন্যাসের কথা মাথায় আসে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক উপন্যাস নয়, বরং রাজনীতি ও মানবিকতার দ্বন্দ্ব, প্রেম ও আদর্শের সংঘর্ষ, এবং নৈতিকতার সূক্ষ্ম সংকট এখানে প্রতিফলিত হয়েছে। শরৎচন্দ্রের 'পথের দাবী ' প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৬ সালে,রবীন্দ্রনাথের 'চার অধ্যায়' প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৪ সালে। পথের দাবী বৃটিশ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হলেও, চার অধ্যায় কিন্তু বাজেয়াপ্ত হয়নি।তবে যথেষ্ট বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।
'চার অধ্যায়' উপন্যাসটিকে রবীন্দ্রনাথ নিজেই রাজনৈতিক উপন্যাস হিসেবে মানতে চাননি। রবীন্দ্রনাথ “চার অধ্যায়” সম্পর্কে বলেন, “এই উপন্যাস রচনায় কোনো বিশেষ মত বা উপদেশ আছে কিনা সে-তর্ক সাহিত্যবিচারে অনাবশ্যক। স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে এর মূল অবলম্বন কোনো আধুনিক বাঙালি নায়ক-নায়িকার প্রেমের ইতিহাস।”
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করেন যে, উপন্যাসটি সাহিত্য হিসেবে বিচার্য এবং এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গৌণ।তবে আমরা এটিকে সামাজিক-রাজনৈতিক উপন্যাস হিসেবে বিবেচনা করব।চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত এই রচনায় বিপ্লবী রাজনীতি যেন ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে মানুষের অন্তর্গত অন্ধকার, যেখানে আদর্শ ক্রমে হয়ে ওঠে ক্ষমতার হাতিয়ার।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ইন্দ্রনাথ—একজন দৃঢ়চেতা, আত্মবিশ্বাসী এবং সর্বজ্ঞতার আবরণে আবদ্ধ নেতা। লেখক তাঁকে সাধারণ মানুষের সীমা ছাপিয়ে এক ধরনের অতিমানবীয় অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ইউরোপে শিক্ষা ও পেশাগত প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তিনি সেই নিশ্চিন্ত জীবনের প্রলোভন পরিত্যাগ করে স্বদেশের বিপ্লবী আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে ফিরে আসেন।
ইন্দ্রনাথকে ঘিরে গড়ে ওঠে একদল তরুণের সমষ্টি-এলা, অতীন্দ্র প্রমুখ—যাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও মানসিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই কাহিনির বিস্তার ঘটে। বিপ্লবী আদর্শে অবিচল ইন্দ্রনাথ নিজেকে কেবল একজন চিন্তাবিদ হিসেবে নয়, বরং সক্রিয় নেতৃত্বদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রত্যক্ষ পরিচালনায় তরুণেরা বিপ্লবের পথে অগ্রসর হয় এবং দলের কার্যক্রম চালিয়ে নিতে তারা সহিংস ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকেও বৈধ বলে মেনে নেয়।
এই আদর্শের নিষ্ঠুর পরিণতি প্রকাশ পায় তখনই, যখন দলের স্বার্থে ইন্দ্রনাথ অতীন্দ্রকে এলার জীবন শেষ করার নির্দেশ দেন। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে গল্পটি এক নির্মম ও অন্ধকার সমাপ্তির দিকে গড়িয়ে যায়, যেখানে বিপ্লবের নামে মানবিক সম্পর্ক ও নৈতিকতা সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
উপন্যাসে অতীন্দ্র ও এলার সম্পর্ক কেবল প্রেমকাহিনি নয়, বরং বিপ্লবী রাজনীতির অন্তর্লোকের সংকটকে উন্মোচনের এক শক্তিশালী মাধ্যম। ব্যক্তিগত টান ও আদর্শিক কর্তব্যের সংঘর্ষে এই সম্পর্ক ক্রমে এক ট্র্যাজিক রূপ নেয়।
এলার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মাতা এবং নিষ্পাপ, বাস্তববিমুখ এক মনোবিজ্ঞানী পিতার ছায়ায়। সেই আশ্রয় ভেঙে পড়ে আত্মীয়স্বজনের স্বার্থপর পরিবেশে গিয়ে, অবশেষে দেশসেবার নামে সে নিজেকে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত করে। এলার প্রতি আকর্ষণ থেকেই অতীন্দ্রও ইন্দ্রনাথের নেতৃত্বাধীন একই দলে যোগ দেয়। এলা ও অতীন্দ্র—যারা পরস্পরকে আদর করে এলী ও অন্তু বলে—পাঠকের সামনে বিপ্লবের আদর্শগত ক্ষয় ও মানবিক বিপর্যয়ের এক করুণ চিত্র তুলে ধরে।
অতীন্দ্র ধীরে ধীরে উপলব্ধি করে যে এই পথ আর ন্যায়সংগত নয়; হয়তো কোনো এক সময় তা অর্থবহ ছিল, কিন্তু এখন তা মানবিক মূল্যবোধকে গ্রাস করছে। তবু সে সরে দাঁড়াতে পারে না, কারণ এলাই তাকে দেশের কাজে নিজেকে উৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। অন্যদিকে, এলা গভীর মানসিক টানাপোড়েনে ভেঙে পড়তে থাকে—বারবার অতীন্দ্রের কাছে ফিরে যেতে চাইলেও ইন্দ্রনাথের শাসন ও বিপ্লবের প্রয়োজন সেই পথ বন্ধ করে দেয়।
এই জটিল সম্পর্কের মাঝে বটু নামের এক পার্শ্বচরিত্রের আবির্ভাব ঘটে। সে বাইরে থেকে বিপ্লবের সহযাত্রী হলেও আসলে পুলিশের গুপ্তচর। এলার প্রতি তার মোহ প্রবল, আর তার মুখে বিপ্লবী বুলি কেবল ফাঁপা কথার প্রদর্শনী। এলাকে কেন্দ্র করেই অতীন্দ্রের প্রতি তার বিদ্বেষ জন্ম নেয়। পরিস্থিতির শেষপ্রান্তে এসে বটু এলাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়—এই শর্তে যে, বিয়ে করলে সে পুলিশের হাত থেকে রেহাই পাবে। এলার প্রত্যুত্তর ছিল নির্মম ও স্পষ্ট: একটি চিঠিতে সে শুধু এক শব্দ লিখে দেয়—“পিশাচ”।
এলার প্রতি অতীন্দ্রের নিঃশর্ত ভালোবাসা এবং ইন্দ্রনাথের কঠোর কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব উপন্যাসকে একটি স্বতন্ত্র মাত্রা দেয়। প্রথম অধ্যায়ে ইন্দ্রনাথ ও এলার কথোপকথনের মধ্য দিয়ে জানা যায়, এলার আবেগ ও দুর্বলতা ইন্দ্রনাথের অজানা নয়। দ্বিতীয় অধ্যায়ের কেন্দ্রে আসে এলা-অতীন্দ্রের প্রেমসংকট, যেখানে অতীন্দ্রের কণ্ঠে উচ্চারিত এক বিখ্যাত চার পঙ্ক্তির কবিতার স্মৃতি প্রেমের অনিবার্য সর্বনাশের ইঙ্গিত দেয়। তৃতীয় অধ্যায়ে ইন্দ্রনাথের আদেশে অতীন্দ্র আত্মগোপনে যায়; এলার উপস্থিতিতেই সে আবার এলাকেই প্রত্যাখ্যান করে। আর চতুর্থ অধ্যায়—এলা ও অন্তুর শেষ পর্ব—সবচেয়ে নির্মম। ক্লোরোফর্ম হাতে অতীন্দ্র আসে হত্যার আদেশ নিয়ে। জন্মদিনে পাওয়া এলার প্রথম চুম্বনের স্মৃতিই হয়ে ওঠে শেষ চুম্বনের অবসান; সেই চুম্বন সম্পূর্ণ করেই সে নিজের কর্তব্যকে শেষ করে দেয়।
রবীন্দ্রনাথ এই উপন্যাসে প্রেমের সূক্ষ্ম অনুভব, বিপ্লবের নিষ্ঠুর বাস্তবতা এবং মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বকে গভীর শিল্পবোধে মেলাতে পেরেছেন। বুদ্ধদেব বসুর ভাষায়, "এলা ও অন্তুর প্রেমকাহিনিতেই চার অধ্যায় উপন্যাসের প্রকৃত মহিমা নিহিত—যে লিরিক তীব্রতা রবীন্দ্রনাথের বহু উপন্যাসেও এত গভীরভাবে ধরা পড়েনি৷" তবে আমার ব্যক্তিগতভাবে এই উপন্যাসকে দুর্বল বলে মনে হয়েছে।
শরৎচন্দ্রের পথের দাবীর পাশাপাশি রাখলে 'চার অধ্যায়' কে কিছুটা ফিকে বলে মনে হয়। ইন্দ্রনাথ, সব্যসাচীর আদলেই গড়া বলে মনে হতে পারে। বিপ্লবী রাজনীতির যে আখ্যান শরৎচন্দ্রের পথের দাবীতে ফুটে উঠেছে, চার অধ্যায়ে সেটা অতটা প্রবল হতে পারেনি। 'চার অধ্যায়' এ রবীন্দ্রনাথ বৃটিশ সরকারকে যতটা না শত্রু হিসেবে দেখিয়েছেন, তার থেকে বেশি ফুটে উঠেছে বিপ্লবী রাজনীতির সংকট ও অন্তঃসারশূন্যতা। এলা ও অতীন্দ্রের প্রেমের দ্বন্দ্বকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে বিপ্লবী রাজনীতিকে রোমান্টিকতায় হারিয়ে ফেলেছেন।শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় চার অধ্যায়-কে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন,“চার অধ্যায় রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে নির্দয় উপন্যাস—এখানে তিনি কোনো মোহ রাখেননি, বিপ্লবী রাজনীতির রোমান্টিক পর্দা ছিঁড়ে দিয়েছেন।”কিন্তু আমার ধারণা রবীন্দ্রনাথ রোমান্টিকতা থেকে বের হতে পারেননি।উপন্যাসটি স্বল্পদৈর্ঘ্য। এর মধ্যে নাটকীয় গুণের পরিচয় রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের নাটকে যেমন প্রতীকের ব্যবহার লক্ষ করা যায় তার প্রভাব উপন্যাসটিতে লক্ষ্যণীয়। কেউ কেউ ইন্দ্রনাথকে কেন্দ্রীয় চরিত্র মনে করলেও এখানে 'এলা' চরিত্রটিকেই প্রধান ও প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচনা করতে চাই। উপন্যাসটি বৃটিশ সরকার ও বিপ্লবী রাজনীতি উভয় শিবিরেই সমালোচিত হয়েছিল। ভয় ছিল নিষিদ্ধ হওয়ার। অন্যদিকে বিপ্লবী রাজনীতির সংকটকে তিনি যেভাবে তুলে ধরেছিলেন তাতে বিপ্লবী গোষ্ঠীও চটেছিল।রবীন্দ্রনাথের নিজের মনেই সম্ভবত উপন্যাসটি নিয়ে দ্বিধা ছিল।উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ করার সময় রবীন্দ্রনাথ অমিয় চক্রবর্তীকে লেখেন, “এটা কেবলমাত্র চলনসইয়ের চেয়ে বেশি নয়, অথবা তার চেয়েও কম, তাহলে ছাপতে দিয়ো না।” আমার কাছে এটি রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস না হলেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য।
© ইয়াসির আরাফাত
30/12/2023
বই তো সবসময় পড়া হয়, কিন্তু আগে কখনো তার তালিকা করা হয়নি৷ প্রয়োজনও মনে করিনি৷ কিন্তু কেউ কেউ জানতে চায়, সাজেশন চায়; অথচ কাউকে বই সাজেস্ট করাও আমার কাজ না। প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক আহমদ ছফাকে যা বলেছিলেন, আমিও সেটাই মেনে চলি। লাইব্রেরিতে যাও, নিজের মতো বেছে নাও৷ যদিও আমি এখনও বেছে বেছে বই পড়া শুরু করিনি, সামনে যা পাই পড়ি৷ নিজের সংগ্রহে যা আছে, সেগুলোও একটা একটা করে পড়ে ফেলা সম্ভব নয়। আমি সংখ্যার হিসাবে নেই, কোনো লক্ষ্যমাত্রাও ঠিক করিনি। যতদিন ভালো লাগবে পড়ব। ভালো না লাগলে থামিয়ে দেব। এখানে গত ছয় মাসে পড়া বইয়ের তালিকা দেয়া হলো:
জুন- জুলাই,২০২৩
১. আত্মপরিচয় ( প্রবন্ধ) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
২. আত্মশক্তি( প্রবন্ধ) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৩. গল্প সমগ্র ( ছোট ও বড় গল্প) - লিও তলস্তয়।
৪. শ্রেষ্ঠ গল্প ( ছোটগল্প) - নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়।
৫ The Sun and Her Flower ( Poetry)- Rupi Kaur.
৬. মাতাল শহরের গল্প ( কবিতা)- কামরুল হুদা পথিক।
৭. আকাশ রাজ্য ( ভ্রমণ কাহিনি) - মঈনুস সুলতান।
৮. জলের মিনার জাগাও ( আত্মজীবনী) - দেবেশ রায়।
আগস্ট,২০২৩
১. কত অজানারে ( উপন্যাস) - শংকর।
২. চৌরঙ্গী ( উপন্যাস) - শংকর ।
৩. ভারত শিল্পের ষড়ঙ্গ ( প্রবন্ধ) - অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৪. আধুনিক সাহিত্য ( প্রবন্ধ) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৫. চুরি করা কবিতা ( কবিতা)- মুম রহমান।
৬. সোহোতে মার্কস( অনুবাদ নাটক)- হাওয়ার্ড জিন।
৭. অবনীন্দ্রনাথ ( জীবনীগ্রন্থ) - অনির্বাণ রায়।
৮. মুক্তিযুদ্ধের অর্থনৈতিক পটভূমি ( প্রবন্ধ) - এম এম আকাশ।
৯.অখিলেশ সিরিজ ( কবিতা) - মোহাম্মদ জসিম।
১০. বুদ্ধদেব ( প্রবন্ধ) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
১১. রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র ( ইতিহাস / জীবনীগ্রন্থ)।
সেপ্টেম্বর,২০২৩
১. অব্যক্ত ( প্রবন্ধ) - জগদীশচন্দ্র বসু।
২. কফিনের ডালা খুলে উড়ে যাবে সব প্রজাপতি ( কবিতা) - কামরুল হুদা পথিক।
৩. মির্জা গালিবের গজল ( অনুবাদ কবিতা) - জাভেদ হুসেন।
৪. হুহুপাখি আমার প্রাণরাক্ষস ( কবিতা) - নির্ঝর নৈঃশব্দ।
৫. আশ্রমের রূপ ও বিকাশ ( প্রবন্ধ) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৬. মার্কসের ক্যাপিটাল ( প্রবন্ধ) - সুপ্রকাশ রায়।
৭. নির্বাচিত কবিতা ( কবিতা)- জুয়েল মাজহার।
৮. জগদীশচন্দ্র বসু ( জীবনী)- নিখিলেশ ঘোষ।
৯. এইসব মকারি ( কবিতা) - পিয়াস মজিদ।
১০. সাতটি তারার তিমির ( কবিতা) - জীবনানন্দ দাশ।
অক্টোবর, ২০২৩
১. কর্তার ইচ্ছায় কর্ম( প্রবন্ধ) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
২. শারদোৎসব ( নাটক) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৩. ইতিহাস ( প্রবন্ধ) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৪. বউ ঠাকুরাণীর হাট( উপন্যাস) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৫. খৃস্ট ( প্রবন্ধ) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৬. রাজা ( নাটক) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৭. জীবনবৃত্ত( আত্মজীবনী) - সনজীদা খাতুন।
৮. আপন কথা ( আত্মজীবনী) - অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৯. জলসাঘর ( ছোটগল্প) - তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।
১০. আমি তুমি সে (প্রবন্ধ) - সলিমুল্লাহ খান।
নভেম্বর, ২০২৩
১। শ্রেষ্ঠ কবিতা( কবিতা) - প্রেমেন্দ্র মিত্র
২। রকি রোড সানডে( ফিকশন) - নাদিয়া ইসলাম
৩। বসন্ত, কোকিলের কর্তব্য(কবিতা) - পিয়াস মজিদ
৪। রাগিণী(উপন্যাস) - আল মাহমুদ
৫। নির্বাচিত প্রবন্ধ(প্রবন্ধ) - মহিবুল আজিজ
৬। পাশ্চাত্যে নারী আন্দোলন( প্রবন্ধ) - ঊর্মি রহমান
ডিসেম্বর, ২০২৩
১.জাপানে( ভ্রমণ কাহিনি) - অন্নদাশঙ্কর রায়।
২. ভবঘুরে শাস্ত্র ( প্রবন্ধ) - রাহুল সায়ংকৃত্যায়ন।
৩. নির্বাচিত প্রবন্ধ ( প্রবন্ধ) - রণেশ দাশগুপ্ত।
৪. নিজের বিরুদ্ধে ( কবিতা)- জয় গোস্বামী।
৫. সহোদরা ( উপন্যাস) - আল মাহমুদ।
৬. শফাত শাহের লাঠি ( কবিতা)- মোহাম্মদ সাদিক।
৭. বিসর্গতে দুঃখ ( ফিকশন)- শাহাদুজ্জামান।
৮. হোয়াট আ বিউটিফুল ডেড বডি ( কবিতা) - জুয়েল মোস্তাফিজ।
৯. সুখ ( উপন্যাস) - পান্না কায়সার।
১০. আরবী কবিতা ( অনুবাদ কবিতা)- আবদুস সাত্তার।
বই তো সবসময় পড়া হয়, কিন্তু আগে কখনো তার তালিকা করা হয়নি৷ প্রয়োজনও মনে করিনি৷ কিন্তু কেউ কেউ জানতে চায়, সাজেশন চায়; অথচ কাউকে বই সাজেস্ট করাও আমার কাজ না। প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক আহমদ ছফাকে যা বলেছিলেন, আমিও সেটাই মেনে চলি। লাইব্রেরিতে যাও, নিজের মতো বেছে নাও৷ যদিও আমি এখনও বেছে বেছে বই পড়া শুরু করিনি, সামনে যা পাই পড়ি৷ নিজের সংগ্রহে যা আছে, সেগুলোও একটা একটা করে পড়ে ফেলা সম্ভব নয়। আমি সংখ্যার হিসাবে নেই, কোনো লক্ষ্যমাত্রাও ঠিক করিনি। যতদিন ভালো লাগবে পড়ব। ভালো না লাগলে থামিয়ে দেব। এখানে গত ছয় মাসে পড়া বইয়ের তালিকা দেয়া হলো:
জুন- জুলাই,২০২৩
১. আত্মপরিচয় ( প্রবন্ধ) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
২. আত্মশক্তি( প্রবন্ধ) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৩. গল্প সমগ্র ( ছোট ও বড় গল্প) - লিও তলস্তয়।
৪. শ্রেষ্ঠ গল্প ( ছোটগল্প) - নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়।
৫ The Sun and Her Flower ( Poetry)- Rupi Kaur.
৬. মাতাল শহরের গল্প ( কবিতা)- কামরুল হুদা পথিক।
৭. আকাশ রাজ্য ( ভ্রমণ কাহিনি) - মঈনুস সুলতান।
৮. জলের মিনার জাগাও ( আত্মজীবনী) - দেবেশ রায়।
আগস্ট,২০২৩
১. কত অজানারে ( উপন্যাস) - শংকর।
২. চৌরঙ্গী ( উপন্যাস) - শংকর ।
৩. ভারত শিল্পের ষড়ঙ্গ ( প্রবন্ধ) - অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৪. আধুনিক সাহিত্য ( প্রবন্ধ) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৫. চুরি করা কবিতা ( কবিতা)- মুম রহমান।
৬. সোহোতে মার্কস( অনুবাদ নাটক)- হাওয়ার্ড জিন।
৭. অবনীন্দ্রনাথ ( জীবনীগ্রন্থ) - অনির্বাণ রায়।
৮. মুক্তিযুদ্ধের অর্থনৈতিক পটভূমি ( প্রবন্ধ) - এম এম আকাশ।
৯.অখিলেশ সিরিজ ( কবিতা) - মোহাম্মদ জসিম।
১০. বুদ্ধদেব ( প্রবন্ধ) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
১১. রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র ( ইতিহাস / জীবনীগ্রন্থ)।
সেপ্টেম্বর,২০২৩
১. অব্যক্ত ( প্রবন্ধ) - জগদীশচন্দ্র বসু।
২. কফিনের ডালা খুলে উড়ে যাবে সব প্রজাপতি ( কবিতা) - কামরুল হুদা পথিক।
৩. মির্জা গালিবের গজল ( অনুবাদ কবিতা) - জাভেদ হুসেন।
৪. হুহুপাখি আমার প্রাণরাক্ষস ( কবিতা) - নির্ঝর নৈঃশব্দ।
৫. আশ্রমের রূপ ও বিকাশ ( প্রবন্ধ) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৬. মার্কসের ক্যাপিটাল ( প্রবন্ধ) - সুপ্রকাশ রায়।
৭. নির্বাচিত কবিতা ( কবিতা)- জুয়েল মাজহার।
৮. জগদীশচন্দ্র বসু ( জীবনী)- নিখিলেশ ঘোষ।
৯. এইসব মকারি ( কবিতা) - পিয়াস মজিদ।
১০. সাতটি তারার তিমির ( কবিতা) - জীবনানন্দ দাশ।
অক্টোবর, ২০২৩
১. কর্তার ইচ্ছায় কর্ম( প্রবন্ধ) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
২. শারদোৎসব ( নাটক) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৩. ইতিহাস ( প্রবন্ধ) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৪. বউ ঠাকুরাণীর হাট( উপন্যাস) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৫. খৃস্ট ( প্রবন্ধ) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৬. রাজা ( নাটক) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৭. জীবনবৃত্ত( আত্মজীবনী) - সনজীদা খাতুন।
৮. আপন কথা ( আত্মজীবনী) - অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৯. জলসাঘর ( ছোটগল্প) - তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।
১০. আমি তুমি সে (প্রবন্ধ) - সলিমুল্লাহ খান।
নভেম্বর, ২০২৩
১। শ্রেষ্ঠ কবিতা( কবিতা) - প্রেমেন্দ্র মিত্র
২। রকি রোড সানডে( ফিকশন) - নাদিয়া ইসলাম
৩। বসন্ত, কোকিলের কর্তব্য(কবিতা) - পিয়াস মজিদ
৪। রাগিণী(উপন্যাস) - আল মাহমুদ
৫। নির্বাচিত প্রবন্ধ(প্রবন্ধ) - মহিবুল আজিজ
৬। পাশ্চাত্যে নারী আন্দোলন( প্রবন্ধ) - ঊর্মি রহমান
ডিসেম্বর, ২০২৩
১.জাপানে( ভ্রমণ কাহিনি) - অন্নদাশঙ্কর রায়।
২. ভবঘুরে শাস্ত্র ( প্রবন্ধ) - রাহুল সায়ংকৃত্যায়ন।
৩. নির্বাচিত প্রবন্ধ ( প্রবন্ধ) - রণেশ দাশগুপ্ত।
৪. নিজের বিরুদ্ধে ( কবিতা)- জয় গোস্বামী।
৫. সহোদরা ( উপন্যাস) - আল মাহমুদ।
৬. শফাত শাহের লাঠি ( কবিতা)- মোহাম্মদ সাদিক।
৭. বিসর্গতে দুঃখ ( ফিকশন)- শাহাদুজ্জামান।
৮. হোয়াট আ বিউটিফুল ডেড বডি ( কবিতা) - জুয়েল মোস্তাফিজ।
৯. সুখ ( উপন্যাস) - পান্না কায়সার।
১০. আরবী কবিতা ( অনুবাদ কবিতা)- আবদুস সাত্তার।
©ইয়াসির আরাফাত
05/09/2023
#পাঠপ্রতিক্রিয়া
মোহাম্মদ জসিম এর কবিতা বই' অখিলেশ সিরিজ'। অনুভূতির টালমাটাল শিরোনামে তিন পাগলের সাথে কথপোকথন হলো৷ বিশদ বিবরণ আপাতত তোলা থাকলো৷ ৬৭ টি কবিতার মধ্যে বেশি ভালো লেগেছে ' দশমিক ',' পর সমাচার এই যে', ' মহামড়কের শুভসন্ধ্যাবেলা', তিন একে তিন', ' প্রেম মরে গেলে প্রেমপত্র ছিঁড়ে ফেলতে হয়', ' পুষ্প অথবা প্রকৃত মিথ্যেবাদ', 'ব্লার, নট ব্লাইন্ড', 'রোজনামচা', ' সুইসাইড নোট ', 'পোস্টমর্টেম রিপোর্ট ', 'হেমন্তকালীন পত্র ', 'ওল্ড মঙ্ক' 'নিপোষাক নর্তক ও আয়নামুখি রাত', ' ব্রেক দ্য সাইলেন্স'। এছাড়া আরও কিছু ছোট ছোট লাইন৷ মোহাম্মদ জসিম এর কবিতা ' পরীক্ষানির্ভর'। প্রতিটি বইয়ে নতুনত্বের প্রচেষ্টা থাকে। সেটা বিন্যাস ও প্রকাশভঙ্গি উভয় ক্ষেত্রে। একারণে কবিতাগুলো টানা পড়ে গেলে সবটা ভালো লাগে না কখনো কখনো। অন্তত কয়েকবার পাঠ করা প্রয়োজন। অখিলেশ সিরিজ থেকে একটি কবিতা পাঠ করা যাক-
তিন একে তিন
তিনটি রোগের নাম এরকম...
ডিপ্রেশন- মনখারাপ - মন ভালো নেই;
তিন রকমের বেঁচে থাকা,
আলো আছে- অন্ধকার - আলো নেই...
তিন রকমের মানুষের নাম যদি বলি
আমি এক- অখিলেশ দুই- শমীক তিন;
খাঁজকাটা - তুলোওঠা- ভীষণ মসৃণ
তিনটি দুঃখের কথা জানি -
জানি, তিনটি রঙের নাম লাল- গাঢ়লাল- ফিকে!
তুমি - তোমার - তোমাকে
এই তিন দিকে
পৃথিবী ছড়িয়ে আছে ডানা-
তিনটি নিষেধাজ্ঞা এই- ওড়ো, উড়ো না
এখানে উড়াল লেখা মানা!
তিনভাবে বেঁচে থাকা - কাত, উপুড়
ও চিত-
স্বমেহন; আত্মমৈথুন আর স্বরচিত মিথ
কামসূত্রের তিনটি অধ্যায় ;
জীবন মানেই এক- একা- একাকীত্বতায়-
শনি থেকে মঙ্গল সপ্তাহে আরও তিনটে দিন!
ভালো আছি পাগলেরা, মিথ্যেবাদী এবং স্বাধীন।
*
শেষ হলেও রেশ থেকে যায়। কি পাওয়া গেলো, কি পাওয়া গেলো না তার হিসেব পরে করা যাবে। কেবল নিখাদ কবিতাযাপন করতে চাইলে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যাওয়া যেতে পারে অখিলেশ সিরিজে।
বই: অখিলেশ সিরিজ
কবি: মোহাম্মদ জসিম
ধরন: বাংলা কবিতা
প্রকাশক: বাউণ্ডুলে প্রকাশনী
প্রকাশকাল: অমর একুশে বইমেলা, ২০২৩।
মূল্য: ২৫০ টাকা।
ইয়াসির আরাফাত
04/09/2023
#চলতিপাঠ
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে স্বল্প আয়াসে জানার জন্য বইটি দেখা যেতে পারে।বিশেষত যারা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে জানেন না তাদের জন্য বইটি বেশ ভালো হবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহের এই ভ্রাতুষ্পুত্র ভারতীয় শিল্পদৃষ্টি ও তার পঠন- পাঠনকে নিয়ে গিয়েছিলেন অন্যতম উচ্চতায়। ' ভারত শিল্পর ষড়ঙ্গ ", " শিল্পায়ন", বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধ " নামক শিল্প তত্ত্বের কালজয়ী বইগুলো পড়ার আগে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে সাধারণ জানাশোনার দরকার আছে৷ তাঁর আত্মজীবনী " আপন কথা" ও বাংলাদেশে পাওয়া যায়৷ সেটি নিয়ে নাহয় পরে কথা বলা যাবে।
বই: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
ধরন: জীবনী।
লেখক: অনির্বাণ রায়।
প্রকাশক: প্যাপিরাস( কলকাতা)।
মূল্য: ৮০ রুপি।
@ইয়াসির
16/08/2023
#পাঠপ্রতিক্রিয়া
শরৎচন্দ্রের ' নারীর মূল্য ' প্রবন্ধ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া
নারী মণি- মাণিক্যের মতো সমাজে দুষ্প্রাপ্য নন, এ-কারণেই তার মূল্য বেশী নয়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ' নারীর মূল্য ' প্রবন্ধটি শুরু করেন এই তুলনা দিয়ে। সমাজে নারীর ভূমিকা ' মাতা, ভগিনী, প্রেয়সী, বধূ....' ইত্যাদি বিভিন্ন রূপে হলেও ঠিক কোন অবস্থায় পুরুষের নিকট তার কতটুকু মূল্য সেই অনুসন্ধানই প্রবন্ধটির বৃহৎ অংশ জুড়ে। হিন্দু সমাজে সহমরণ প্রথা থেকে শুরু করে বিবিধ আদিম অধিবাসীদের সমাজে নারী যে পুরুষের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত এবং নারীকে সর্বত্র ধর্মের নামে, বিধানের নামে নিষ্পেষিত করা হয়েছে - সেসবের বিবিধ উদাহরণ ছড়িয়ে আছে এখানে ওখানে। বাদ যায়নি ইউরোপের কথাও। শাস্ত্র নারীকে সকল সময় ঠেলে দিয়েছে নিম্নতর অবস্থানে। একদা যে নারী বেদ রচনা করেছেন, পরবর্তীতে তার জন্য বেদ ছোঁয়া নিষিদ্ধ হয়েছে। ' সতীত্বের নামে নারীকে করা হয়েছে অবরুদ্ধ। বিধবা বিবাহের সপক্ষে বলতে গিয়ে, বলা হলো বিধবা নারীরা কুলত্যাগিনী হচ্ছেন, যারা বিধবা বিবাহ বিরোধী তারাও নারীদের প্রতি এই অপবাদ মেনে নিচ্ছেন। প্রবন্ধকার উপাত্ত দেখাচ্ছেন, কুলত্যাগিনীদের শতকরা সত্তর জন বিধবা নয় বরং বিবাহিত নারী। প্রধান কারণ যৌন লালসা নয় বরং অভাব, অনাহার ও স্বামীর নির্যাতন। ভারতবর্ষের কোনো কোনো সমাজে নারীরা কর্ত্রীস্থানীয় কিংবা পরিবার পরিচালনার ভূমিকায় অধিষ্ঠিত হয়ে থাকেন। অন্যান্য সমাজেও এরূপ কখনো সখনো ঘটলেও লেখক দেখাচ্ছেন বাস্তব ক্ষেত্রে নারীর হাতে ক্ষমতা থাকে না। সারা পৃথিবীতে তুচ্ছ কারণে স্ত্রী হত্যা এবং স্ত্রী পরিত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। লেখক বলেন, নারীর অবস্থান নিম্ন হওয়ার সাথে সাথে সন্তানের অবস্থান নিম্ন হওয়ায় সম্পর্ক আছে৷ কন্যাশিশুকে হত্যার বিবরণ উল্লেখ করে তিনি সেই নির্মমতার চিত্র দেখিয়েছেন৷ আদিম অধিবাসীদের বিভৎস সংস্কৃতির কথাও বাদ যায়নি। বিবাহের মতো সম্পর্কে নারীর অবমাননার প্রসঙ্গেও আলোচনা আছে। লেখক উদাহরণের পর উদাহরণ দিয়ে গেছেন। এতে করে প্রবন্ধের মূল বক্তব্য চাপা পড়ে গেছে। তিনি কোনো নির্দিষ্ট মত না দিয়ে পাঠকের উপর বিবেচনার ভার দিয়েছেন৷ ইসলাম ধর্মে নারীর অবস্থান নিয়েও ক্ষুদ্র আলোচনা আছে৷ সেখানে নারীর অবস্থান কিছুটা ভালো মনে হলেও বিস্তারিত আলোচনা করেননি তার ইসলামী শাস্ত্র সম্পর্কে সীমিত জানাশোনার কারণে। জেন্ডার রোল নিয়ে আলোচনায় তিনি দেখিয়েছেন বিভিন্ন আদিবাসী/ গোত্রে নারী পুরুষের কাজ একই নয়৷ এক্ষেত্রে লেখক নারীর কাজ পুরুষ করবে এমন ধারণাকে সায় দিতে চান না বলে মনে হলো৷ নারী পুরুষের সম্পর্কে এবং পারিবারিক জীবনে এক ধরনের সমোঝোতার দৃষ্টি লক্ষ্য করা গেলো। প্রবন্ধ পাঠে সর্বত্র মনে হয়েছে লেখক একজন নারী। সম্ভবত প্রবন্ধটি শরৎচন্দ্র নারী ছদ্মনামে লিখে থাকবেন। প্রথম প্রকাশের তারিখ জানতে পারিনি তাই ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা সম্ভব হয়নি৷ তবে এতটুকু বলা যায় প্রবন্ধটি যে সময় রচিত হয়েছিল তখনও নারী সমাজে উপেক্ষিত এবং নারীকে নিষ্পেষণের প্রাচীন নিয়ম তখনও বিলুপ্ত হয়নি৷ নারীর মূল্য সমাজে কতটুকু তার একটি তুলনামূলক আলোচনা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় করতে চেয়েছেন। সেখানে কিছু অসংগতি আছে সত্য কিন্তু তা অতীতের নারীর অবস্থানের একটা চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। তার সাথে তুলনা করে বর্তমান সমাজে নারীর অবস্থা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা যেতে পারে। নারী কতোটা এগোলো নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টভঙ্গি কতটা এগোলো তা বিশ্লেষণ না করলে সমাজের অগ্রগতি পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
বইঃ নারীর মূল্য।
লেখকঃ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
প্রকাশকঃ কথাপ্রকাশ
মূল্যঃ ৬০ টাকা।
পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ ইয়াসির আরাফাত
26/08/2022
সেমিনারে বসে মানস চৌধুরীর " দৃশ্যগত নৃবিজ্ঞান " বইটি পড়ছিলাম। গতরাতে পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছি, বইটি শেষ করা হয়নি। বইটির পুরো নাম সম্ভবত "দৃশ্যগত নৃবিজ্ঞান দৃশ্যের সাথে আমার সম্পর্ক"। ২০১৮ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে দেয়া একটি বক্তৃতার লিখিত রূপ বলা যায় বইটিকে। মানস চৌধুরী শুরু করেছেন তার শৈশবের একটি গল্প দিয়ে। মূলত একজন নৃবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে ছবির রাজ্যে তার প্রবেশ এবং ছবির বাস্তবের সাথে বাস্তবের সম্পর্ক বোঝাতেই তিনি এর অবতারণা করেছেন। দেশজ নৃবিজ্ঞান ও তার পঠন পাঠনে দেশীয় সাংস্কৃতিক উপাদান সম্পর্কে ঠিক বিস্তৃত গবেষণা না হোক, সে সম্পর্কে খোঁজ খবর রাখাটা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেবিষয়টি তার আলোচনায় উঠে এসেছে। নৃবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে তার ছবি নিয়ে কাজের গল্পের ভেতরে ছবির সাথে সমাজবিজ্ঞানের সংযোগ ও সমাজবিজ্ঞানের চর্চায় ভিজুয়ালের ব্যবহার নিয়ে কথা আছে। সেই সাথে এই বক্তৃতার মধ্যে শাস্ত্রের সীমানা ও শাস্ত্রীয় চর্চার জটিলতার বিষয় যেমন প্রচলিত ক্যাটাগরি মেনে কারিকুলাম তৈরি ও টেনে দেয়া সীমারেখার বাইরে গিয়ে চর্চার অসুবিধা নিয়ে তার অভিজ্ঞতার নিরিখে আর্গুমেন্ট করেছেন। এই বইয়ে মানস চৌধুরীর একটা বড় আর্গুমেন্ট আছে প্রত্যক্ষণবাদী উপলব্ধির সঙ্কট নিয়ে। নৃবিজ্ঞানের গবেষণার কাজে ছবির ব্যবহার তথ্যের প্রামাণ্যতা নিশ্চিত করে নাকি করে না এই বিতর্ক। মানস চৌধুরীর ভাষাটা সহজ, তিনি বলছেন ছবি ডাটার পাহারাদার কি না৷ তার যুক্তি ছবি আসলে ডাটার পাহারাদার না৷ কারণ ছবির রেপ্রিজেন্টেশন অনুযায়ী সত্যের অবস্থান বদলাতে পারে। বেশ কিছু মজার উদাহারণ আছে। তবে তিনি নৃবিজ্ঞানে ভিজুয়ালের ব্যবহারের বিরোধী একেবারেই নন সেটাও বোঝা গেলো। তাত্ত্বিক বিষয়গুলোর এমন সোজাসাপটা, চমকপ্রদ সহজ বিশ্লেষণে চমৎকৃত হতে হয়েছে। আমার মতো অল্পজানা নৃবিজ্ঞানপ্রেমী মানুষের জন্য এই ছোট্ট বইটি বিভিন্ন চিন্তার উদ্রেক করেছে। বইটি নিয়ে একটি পাঠপ্রতিক্রিয়া লেখা গেলে ভালো হত। সে সময়টা এখন নেই। আগ্রহ বোধ করলে বইটি পড়তে পারেন।
বইঃ দৃশ্যগত নৃবিজ্ঞান
লেখকঃ মানস চৌধুরী
প্রকাশিকঃ ম্যাজিক লন্ঠন
মূল্যঃ৭০ টাকা।
লেখাঃ ইয়াসির আরাফাত
📷 Sathi Akter
18/04/2022
অনুপ চণ্ডালের Haiku In Autumn Days সম্পর্কে প্রতিক্রিয়াঃ
হাইকুর মধ্যে দিয়ে যে এত গভীর অনুভূতির প্রকাশ ঘটানো সম্ভব তা অনুপ চণ্ডালের Haiku In Autumn Days না পড়লে বুঝতে পারতাম না। Autumn এর ভেতর বুঝি বাংলা শরৎ - হেমন্ত দু'টো ঋতু পড়ে! মাসের হিসেব করলে ভাদ্র থেকে নিয়ে অগ্রহায়ণ পর্যন্ত! ইংরেজিতে যাকে বলে Late Autumn বাংলায় তো সেটাই হেমন্ত।এই শুষ্কতার এমন সতেজ ও জীবন্ত প্রকাশ হাইকুর লাইনগুলোতে ছড়িয়ে আছে - বিস্ময়! বিস্ময়! এই যে Autumn কে বাংলায় বাঁধলেন, এর সবটুকুই বাংলার সৌন্দর্য। ইংরেজি ঋতু বলে তাতে এতটুকু বাইরের( বিদেশি) বিষয় নেই। শরতের কাশফুল কোথাও পাইনি।তাই ধরে নিচ্ছি এই উপাচার হেমন্তের। কিন্তু বিস্তৃতি বাংলার দুটো ঋতুর পুরোটা সময়। ঋতু বন্দনার বাইরে যে ব্যক্তিগত ও গৃহস্থালি মানুষের টুকরো টুকরো ছবি, সেগুলোর মধ্যেও রয়েছে মুগ্ধতার কারসাজি। আকাশের সৌন্দর্য থেকে নিয়ে পাকা ফসলের হলুদ পর্যন্ত এই সবকিছু তো আমাদের শৈশবের ফেলে আসা স্মৃতির মতোই মধু ঝড়াচ্ছে। আকাশে রঙের ক্যানভাসে বার্তা এসেছে কোথাও মরেছে কেউ, অথবা কার বুঝি উৎসব। গর্ভে বেড়ে উঠছে প্রিয় সন্তান। দূরে কোনো কুকুর মাতার জন্য কি নিবিড় মমতা। এই শুষ্কতা বুঝি পুড়িয়ে দিচ্ছে চোখ! ব্যাপারীর সাইকেলে মুরগীর খাঁচায় চুপচাপ মুরগীরা চলে যাচ্ছে । দুপুরের নিস্তব্ধতা ভাঙে এমন পাপ হতে দেয়া যাচ্ছে না, তাই পড়ে আসে বাইকের গতি। কুয়াশা কুয়াশা গ্রাম। ঋতুচক্রের বহু বহু উপহার এখানে আছে, যেন থাকাটা স্বাভাবিক। না থাকলে এই বন্দনা পূর্ণতা পাবেনা। এই যে জীবন্ত জীবন। যা অনুপ চন্ডালের অন্য লেখাগুলোতে পেয়েছি, রয়েছে এখানেও। অগ্রহায়ণের ঘ্রাণ নিয়ে যে রাত আসে।যে রাত প্রার্থনার মতো।এই হাইকুগুলো সেই প্রার্থনার উচ্চারণ।চাইলেই লেখা যায় না।
You can just wait
helplessly-
Never no when Haiku comes.
অনুপ চণ্ডাল বইটি উৎসর্গ করেছেন Jack Kerouac কে। তাঁর হাইকু বুঝি প্রিয়! আমার প্রিয় হয়ে গেছে অনুপ চণ্ডালের হাইকুগুলো। অনুভূতি লিখতে গিয়ে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছি....
ইয়াসির আরাফাত
Book:Haiku In Autumn Days.
Writer: Anup Chandal
Publisher: Protishilpo.
Year:2015.
Price: 90 BDT.
Distributors:
Ulukhor, Concord Emporium, Katabon,Dhaka.
Dhyanbindu,Kolkata.
15/03/2022
১
আমাদের এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবনে সবকিছু অভিজ্ঞতায় প্রত্যক্ষ করবার সুযোগ হয় না। নিজের বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও জ্ঞানের পরাকাষ্ঠাও কখনো কখনো কাজ করে না। তখনই মহা জীবনের কাছে ফিরে যেতে হয়। জীবনীগ্রন্থ আমাদের সেই মহা জীবনের কাছে নিয়ে যায়। এক্ষেত্রে আত্মজীবনীকে অন্য লেখকের লিখিত জীবনীগ্রন্থের থেকে বেশি মর্যাদা দিয়ে থাকি। মহাজনের জীবনী পাঠের ভেতর দিয়ে আমাদের পুনর্জন্ম হয়। আত্মজীবনী না হলেও সব্যসাচী রায়চৌধুরী লিখিত " অন্নদাশঙ্কর রায়" জীবনীগ্রন্থটি আমাকে অন্নদাশঙ্কর রায়ের বর্ণাঢ্য জীবনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। আমার জানা " অন্নদাশঙ্কর রায় " যে আরও বড় মাপের লেখক ও চিন্তক এই উপলব্ধি সম্ভব হয়েছে এই বইয়ের পাঠের মাধ্যমে। সেদিক থেকে এই ক্ষুদ্র বই থেকে যা পেয়েছি তার কোনো মূল্য নির্ধারণ সম্ভব নয়।
২
অন্নদাশঙ্কর রায়ের জন্ম ওড়িশার ঢেঙ্কানাল ১৫ ই মার্চ ১৯০৪ সালে। সম্রাট আকবরের সময়কালে তাঁর পূর্বপুরুষ চাকরি সূত্রে বঙ্গ থেকে কলিঙ্গে চলে যান, তারপর থেকে তাদের বাস মূলত ওড়িশায়। অন্নদার পিতামহ শ্রীনাথ রায় বাস করতেন ওড়িশারই বালেশ্বর জেলার রামেশ্বরপুরে। পরিবারে দারিদ্র্য আসায় ভাগ্যের সন্ধানে তিনি সপরিবারে বালেশ্বর ত্যাগ করেন এবং ওড়িশার পাহাড়ি অঞ্চল গড়জাত এ বসবাস আরম্ভ করেন। শ্রীনাথের পুত্র নিমাইচরণ রায় প্রথমে বৃটিশ সরকারের অধীনে চাকরি লাভ করেন।পরে সেখানার চাকরি ছেড়ে ওড়িশার ঢেঙ্কানালে দেশীয় রাজার অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন। নিমাইচরণ বিয়ে হয় কটকের বিখ্যাত উকিল দীনবন্ধু পালিতের কন্যা হেমনলিনী পালিতের সঙ্গে। নিমাইচরণ ও হেমনলিনীর পাঁচ সন্তানের মধ্যে অন্নদাশঙ্কর ছিলেন সবার বড়।
৩
এই পর্যন্ত লেখার পর মনে হলো উপরে যে ক'টি বাক্য লিখেছি, দীর্ঘ আলোচনা লিখলে তাঁর উজ্জ্বলতা ম্লান হয়ে যেতে পারে। একজন মহৎ লেখকের শারিরীক বেড়ে ওঠার কাহিনির থেকে তার চিন্তার বিবর্তন ও বিস্তৃতির আলোচনা এবং তার সময়কালের চিন্তা কাঠামোকে ধরতে পারাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমার মতো সামান্য ও স্বল্প বিদ্যা ধারী মানুষের পক্ষে যে সেটা সম্ভব নয় সে অপারগতা আগেই স্বীকার করছি। অন্নদাশঙ্কর রায় ছিলেন বিংশ শতাব্দীর বিরলতম মনীষীদের একজন। জিনি অল্পবয়সেই গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ও রঁম্যা রঁল্যার অনুরাগী হয়েছিলেন৷ গান্ধীর স্বদেশী আন্দোলনে প্রভাবিত হয়ে ভেবেছিলেন কলেজে পড়বেন না। পরবর্তীতে কলেজে পড়েছিলেন অবশ্য। শৈশব থেকে সেরা ছাত্র ছিলেন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভালো ফলাফল করেছেন। ছাত্রাবস্থায়ই তাঁর সাহিত্য সম্পর্কে গভীর পড়াশোনার সূচনা হয়েছিল। তার স্বপ্নের নায়ক গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ, রঁম্যা রঁল্যা। পরবর্তীতে তাঁদের সাহচর্যও পেয়েছিলেন। কৈশোরে থেকে তিনি লেখক হতে চেয়েছিলেন। রঁম্যা রঁল্যার " জাঁ ক্রিস্তফ" ও দস্তয়েভস্কি'র " আন্না কারেনিনা", তলস্তয়ের " ওয়্যার অ্যান্ড পিস" এর মতো গ্রন্থ রচনার বাসনা তাঁর হয়েছিল। পরবর্তীতে "সত্যাসত্য" ( ৬ খন্ডে), " রত্ন ও শ্রীমতী " ( ৩ খন্ডে), " ক্রান্তদর্শী"( ৪ খন্ডে) এর মতো উপন্যাস রচনা করেছেন। আইসিএস পরীক্ষায় প্রথম হয়ে শিক্ষানবিশীর জন্য বিলেতে গিয়েছিলেন৷ এই সময়েই লিখেছেন " পথে প্রবাসে" এর মতো কালজয়ী গ্রন্থ। বিলেতে শিক্ষানবিশীর কালে সারা ইউরোপ ভ্রমণের সুযোগ অর্জন করেছেন বিপুল জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। তার সারাৎসার আমরা পাই তাঁর সাহিত্য, সমাজ ভাবনা ও চিন্তা দর্শনে, তাঁর লেখার পরতে পরতে। আজীবন প্রেমিক এই মানুষটি বার-বার প্রেমে পড়েছেন। শৈশবে খেলার সঙ্গী একটি মেয়ের প্রতি অনুরাগ ছিল তাঁর। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে অন্মদাকে গভীর দুঃখ দিয়ে সেই মেয়েটি হারিয়ে গেল। " সেই ছেলেবেলাতে আর একটি বালিকা মনোহরণ করেছিল অন্নদার। সে ছিল কলকাতার মেয়ে, অন্নদার কবিতা লেখার প্রথম প্রেরণাময়ী। তাকে ভালোবাসার কথা জানিয়ে কবিতা লিখে অন্নদা এমন জায়গায় টানিয়ে রাখত যাতে তার চোখে পড়ে। কিন্তু হায়' খুকুমণি তার কবিতার দিকে ফিরেও চায়নি!" সরলা দেবীর নামের এক পরস্ত্রীর সাথে অন্নদার গভীর প্রণয় হয়েছিল কিন্তু অন্নদার সাথে তার প্রণয় পরিপূর্ণতা লাভ করেনি। এই নারীর প্রেরণায় তিনি আইসিএস যোগ দিয়েছিলেন।পরবর্তীতে বিলেতে শিক্ষানবিশী করতে গিয়ে জয়স নামে আরেক নারীর সাথে প্রণয়াবদ্ধ হয়েছিলেন। ইউরোপের অনেক স্থানে একত্রে ঘুরেছিলেন।শেষ পর্যন্ত তাকেও পাওয়া হয়নি অন্নদার। দেশে ফিরে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজে যোগ দিয়েছিলেন। এসময় অ্যালিস ভার্জিনিয়া অর্নডোর্ফ নামের এক আমেরিকান নারীর সাথে তাঁর প্রণয় হয়েছিল। পরবর্তীতে অ্যালিস ভার্জিনিয়া শ্রীমতী লীলা রায় হয়ে তাঁর জীবনে এসেছেন।তাঁদের এই বিবাহবন্ধন স্থায়ী হয়েছিল ৬২ বছর। লীলা রায় তাঁর জীবনের এক অংশ জুড়ে ছিলেন। অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর জীবনে লীলার অবদান অকুণ্ঠচিত্তে স্মরণ করতেন।
৪
ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের চাকরির সুবাদে যুক্তবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে তিনি প্রশাসক ও বিচারক হিসেবে কাজ করেছেন। মানুষের সাথে মিশেছেন খুব গভীর ভাবে। ইংল্যান্ডে যখন প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিলেন তখবি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন খুব বেশিদিন আমলাগিরি করবেন না। কৈশোরে থেকেই তাঁর লেখক হবার স্বপ্ন। কিন্তু সহসা চাকরি ছেড়ে দিতে পারলেন না। পরিবার পরিচালনা ও সাহিত্যচর্চার জন্য তার চাকরিটা প্রয়োজন। কর্মব্যস্তার ফাঁকে নিয়মিতভাবে চলছিল সাহিত্য সাধনা। একদা গান্ধীজীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি সিভিল সার্ভিসের চাকরি ছাড়বেন কি না! গান্ধীজী কোনো উত্তর দেননি। পরবর্তীতে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে চাকরি ছাড়লেন পুরোদস্তুর লেখক হবেন বলে।পরবর্তী ৫১ বছর লিখে গেছেন বিপুল উৎসাহে। কবিতা ও ছড়ার বই ২৩ টি, গল্পের বই ( শ্রেষ্ঠ গল্প ও গল্প সমগ্র সহ) ১২ টি, উপন্যাস ( সকল খন্ড আলাদা হিসাবসহ) ২২ টি, প্রবন্ধের বই ৬১ টি, বিবিধ ( ভ্রমণ সহ) ১৩ টি। লেখালেখির ক্ষেত্রে ছাত্রাবস্থায় প্রথম চৌধুরীর কাছ থেকে প্রশংসা পেয়েছিলেন। লেখক হিসেবে পেয়েছেন বর্ধমান ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি. লিট। সাহিত্য অকাদেমি পুরষ্কার, বিদ্যাসাগর পুরষ্কার, আনন্দ পুরষ্কার, জগত্তারিনী পুরষ্কার, শরৎ চট্টোপাধ্যায় পুরষ্কার, শরৎ স্মৃতি পুরুষ্কার, পদ্মভূষণ সহ অনেক মর্যাদাপূর্ণ সরকারি ও অসরকারি পুরষ্কার। সম্মাননা ও পুরষ্কার তিনি বর্জন করেননি। তাঁর লেখা ও চিন্তার মাধ্যমে তিনি পুরষ্কারকে অতিক্রম করে পরিণত হয়েছেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষায়।
৫
যুক্তবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে তিনি প্রশাসক ও বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুবাদে মিশেছেন সাধারণ মানুষের সাথে। পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহী, নওগাঁ, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহে তিনি কর্মরত ছিলেন। বাংলার সাধনা মানুষের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ ছিল। সাম্প্রদায়িকতাকে অপছন্দ করতেন। দেশ ভাগকে মেনে নিতে পারেননি। তাঁর ছড়ায় ব্যঙ্গ করেছেন " তেলের শিশি ভাঙলো বলে খুকুর পরে রাগ করো, তোমরা যে সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙে ভাগ করো! তার বেলা!" দাঙ্গা প্রত্যক্ষ করে ব্যথিত হয়েছেন। রাজ্যসরকার তাঁকে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান তাড়ানোর কার্য করাতে পারেননি।পাকিস্তান হওয়ার পর যখন পাকিস্তান সরকার দুই বাংলার মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ করতে চেয়েছে তখন তিনি চেষ্টা করেছেন সাংস্কৃতিক যোগাযোগ তৈরি করতে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম আরম্ভ হলে তিনি অকুন্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কলম ধরেছেন। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল। ১৯৭৫ সালে যখন শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয় তখন তিনি ব্যথিত হয়েছেন।" দেশ, তুমি কাঁদো" প্রবন্ধে সেটা প্রকাশ করেছেন। লিখেছেন " যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরি মেঘনা বহমান/ ততকাল রবে কীর্তি তোমার, শেখ মুজিবুর রহমান। ".
পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য শান্তিনিকেতনে " সাহিত্যমেলা" এর আয়োজন করেছিলেন।
৬
৩৫ বছরের বেঁশি বাঁচবেন না বলে তাঁর ভয় ছিল। এজন্য সবসময় ব্যাকুল থাকতেন এর আগেই তাঁকে লেখক হতে হবে বলে। জীবন তাঁকে ৩৫ বছরে নিঃশেষ করেনি। তিনি ৯৮ বছর পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন এবং লিখেছেন অজস্র লেখা। সারাজীবন তিনি " আর্ট" এর প্রেমিক ছিলেন। " যে আর্টের জন্য তাঁর আজীবন ব্যাকুলতা, তাঁর সারাজীবন সেই আর্ট মন্ডিত। তিনিই বলতে পারেন, আর্ট হচ্ছে আপনি আপনার উদ্দেশ্য, আপনি আপনার উপায়। আর্টের চেয়ে মহত্তর আর কিছু উপায় নয়।" নব্বুই পেরেয়ি আলো নিভে আসে। তিনি আওড়ান-
"এপারেই যারা জীবন্মুক্ত
সত্যের সাথে নিত্যযুক্ত
সমান তাদের ইহ পরকাল
যেমন সকাল তেমনি বিকাল
আমার মুক্তি নীরব নিজনে
অপ্রতিমের প্রতিমা সৃজনে।"
২০০২ সালের ২৮ অক্টোবর প্রায় এক শতাব্দীর বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান হয় বিংশ শতাব্দীর মহান এই মনীষার।
বইঃ অন্নদাশঙ্কর রায়।
লেখকঃ সব্যসাচী রায়চৌধুরী।
প্রকাশনীঃ গ্রন্থতীর্থ, কলকাতা।
প্রকাশের সালঃ জানুয়ারি, ২০১৩।
মূল্যঃ ৪৮ রুপি
©ইয়াসির আরাফাত
#পাঠপ্রতিক্রিয়া