16/07/2026
আসুন একটা ছোট্ট গল্প বলি রাজা, সারথি ও রথের।
এক দেশে একজন জ্ঞানী রাজা ছিলেন। তিনি তাঁর সারথিকে বললেন, "আজ আমাকে শান্তির রাজ্যে নিয়ে চলো।"
সারথি রথ চালাতে শুরু করল। কিন্তু রথের পাঁচটি ঘোড়া ছিল খুবই চঞ্চল। একটি ফুলের গন্ধের দিকে ছুটছে, একটি মিষ্টি সুরের দিকে, একটি সুন্দর দৃশ্যের দিকে, একটি সুস্বাদু খাবারের দিকে, আরেকটি নরম জিনিস স্পর্শ করতে চাইছে। ফলে রথ কখনো ডানে, কখনো বাঁয়ে ছুটছে। রাজা যতই বলছেন, "শান্তির রাজ্যে নিয়ে চলো", রথ ততই পথ হারিয়ে ফেলছে।
সারথি বুঝল, আগে ঘোড়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সে ধীরে ধীরে লাগাম টেনে সব ঘোড়াকে একসঙ্গে একই পথে আনল। এবার রথ সোজা পথে চলতে লাগল।
প্রথমে চারপাশের আকর্ষণ থেকে ঘোড়াগুলোকে ফিরিয়ে আনা হলো—এটাই প্রত্যাহার (Pratyahara)।
এরপর ঘোড়াগুলোকে একটি নির্দিষ্ট পথে ধরে রাখা হলো—এটাই ধারণা (Dharana)।
অনেকক্ষণ একই পথে, একই গতিতে, বাধাহীনভাবে চলতে চলতে রাজা অবশেষে শান্তির রাজ্যে পৌঁছালেন—এটাই ধ্যান (Dhyana)।
এবার অন্তর্নিহিত অর্থ বলা যাক।
পাঁচটি ঘোড়া = আমাদের পাঁচ ইন্দ্রিয় (চোখ, কান, নাক, জিহ্বা, ত্বক)
লাগাম = মন
সারথি = বুদ্ধি
রাজা = আত্মা বা প্রকৃত সত্তা
প্রত্যাহার = ইন্দ্রিয়কে বাইরের বিষয় থেকে ফিরিয়ে আনা।
ধারণা = মনকে একটি বিষয়ের উপর স্থির রাখা।
ধ্যান = সেই স্থির মন যখন অবিরাম এক বিষয়ের উপর প্রবাহিত হয়।
অনুমতি না নিয়ে নাম মেনসন না করে কপি করলে রাগ করবো না কিন্তু রিপোর্ট করে দেবো।🙂
Nayan Mallick খুব জলদি একটি সরল কিন্তু কার্যকরী যোগ সাধনের অনলাইন ক্লাস শুরু করতে চলেছি যেখানে আপনারা নিজের প্রাণায়াম, মুদ্রা, বন্ধ এবং ধ্যানের অভ্যাসকে আরও গভীর গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন।যুক্ত থাকুন আপডেট পাওয়ার জন্য।ধন্যবাদ।
11/07/2026
কেন ওম যোগ ইনস্টিটিউটে সঠিক অ্যালাইনমেন্টের
(Alignment) ওপর আসন করানোয় এত গুরুত্ব দেওয়া হয়?
অনেকেই মনে করেন, যোগাসনের উদ্দেশ্য শুধু শরীরকে কঠিন ভাবে বাঁকানো বা কঠিন আসন করা। কিন্তু ওম যোগ ইনস্টিটিউটে আমরা বিশ্বাস করি, আসনের সৌন্দর্য তার জটিলতায় নয়, বরং তার সঠিক অ্যালাইনমেন্টে।
সঠিক অ্যালাইনমেন্ট মানে শরীরের প্রতিটি অংশকে এমনভাবে স্থাপন করা, যাতে হাড়, সন্ধি, পেশী ও মেরুদণ্ড তাদের স্বাভাবিক অবস্থানে থেকে কাজ করতে পারে। এর ফলে শরীরে অপ্রয়োজনীয় চাপ পড়ে না, আঘাতের সম্ভাবনা কমে এবং আসনের প্রকৃত উপকারিতা পাওয়া যায়।
যোগে বলা হয়েছে, "স্থিরসুখম্ আসনম্"—যে আসনে স্থিরতা ও স্বাচ্ছন্দ্য থাকে, সেটিই প্রকৃত আসন। এই স্থিরতা আসে সঠিক অ্যালাইনমেন্টের মাধ্যমে। যখন শরীর সুষমভাবে স্থিত হয়, তখন শ্বাস স্বাভাবিক, গভীর ও ছন্দময় হয়ে ওঠে।
এই কারণেই আসন, প্রাণায়াম ও ধ্যান একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। শরীর যদি সঠিকভাবে স্থিত না হয়, তাহলে শ্বাসের প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হয়। আর শ্বাস যদি অস্থির হয়, তাহলে প্রাণায়ামের গভীরতা আসে না। প্রাণায়াম গভীর না হলে মনও সহজে একাগ্র হয় না, ফলে ধ্যানেও স্থিরতা আসে না।
ভুল অ্যালাইনমেন্টে হয়তো বাইরে থেকে আসনটি সুন্দর দেখাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তা করলে হাঁটু, কোমর, কাঁধ বা মেরুদণ্ডে অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে বুক সংকুচিত হয়ে শ্বাসের স্বাভাবিক প্রবাহও ব্যাহত হতে পারে, যা প্রাণায়াম ও ধ্যানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ওম যোগ ইনস্টিটিউটে তাই শুধু আসনের বাহ্যিক রূপ শেখানো হয়না; শেখানো হয় এমনভাবে শরীরকে স্থাপন করতে, যাতে শরীর, শ্বাস ও মন একই সুরে কাজ করে। কারণ আমাদের লক্ষ্য শুধু শরীরচর্চা নয়—আসন থেকে প্রাণায়াম, প্রাণায়াম থেকে ধ্যান, আর ধ্যান থেকে আত্মসচেতনতার পথে একজন সাধককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
05/07/2026
যোগের প্রকৃত পরিচয় শুধু ম্যাটের উপর নয়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে।
বাঃ! খুব ভালো। আপনি ওম যোগ ইনস্টিটিউটে যোগ দিয়েছেন। যোগ শেখার এবং নিয়মিত সাধনা করার একটি সুন্দর সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু একটি প্রশ্ন—এই সাধনার সঙ্গে সঙ্গে আপনার সচেতনতাও কি বৃদ্ধি পাচ্ছে?
ইনস্টিটিউটে প্রবেশ করার সময় জুতো দুটি কি ছুঁড়ে ফেলে ঢোকেন, নাকি সুন্দর করে সাজিয়ে রাখেন?
ম্যাটটি কি শব্দ করে মাটিতে আছাড় মেরে পাতেন, নাকি ধীরে ধীরে যত্নের সঙ্গে বিছিয়ে দেন?
অভ্যাস শেষ হলে নিজের ম্যাটটি কি সুন্দর করে গুছিয়ে রেখে যান?
ম্যাট রাখতে গিয়ে যদি অসাবধানতাবশত অন্যের ম্যাট নড়ে যায়, সেটিকেও কি আগের মতো গুছিয়ে রেখে যান?
আসন, প্রাণায়াম ও ধ্যান ভালোভাবে করতে পারার কারণে কি এখনও ভিতরে ভিতরে সূক্ষ্ম অহংকার জেগে ওঠে? নাকি অহংকার এলেও সঙ্গে সঙ্গে সচেতন হয়ে তাকে চিনতে ও ছেড়ে দিতে পারেন?
ধ্যানের সময় নানা অনুভূতি হতে পারে। কিন্তু ধ্যান শেষ হওয়ার পর সেই সচেতনতা কি আপনার কথা, আচরণ ও ব্যবহারে প্রকাশ পায়?
একটু সচেতন হয়ে নিজের দিকে তাকান। দেখবেন, সারাদিনের অনেক কাজই আমরা অচেতনভাবে করে চলেছি। ওম যোগ ইনস্টিটিউট-এ আমাদের চেষ্টা শুধু আসন, প্রাণায়াম ও ধ্যান শেখানো নয়; জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে সচেতনতার অভ্যাস গড়ে তোলা।
-এ বলেছেন—
उद्धरेदात्मनाऽत्मानं नात्मानमवसादयेत्।
आत्मैव ह्यात्मनो बन्धुरात्मैव रिपुरात्मनः॥ (অধ্যায় ৬, শ্লোক ৫)
অর্থ: নিজের দ্বারা নিজেকেই উন্নত করো, নিজেকে অধঃপতিত হতে দিও না। কারণ, মানুষ নিজেই নিজের বন্ধু, আবার নিজেই নিজের শত্রু।
আমার কাজ আপনার ভুল ধরা নয়; আমার কাজ আপনাকে আরও সচেতন হতে সাহায্য করা। কারণ, সচেতনতাই যোগসাধনার প্রাণ, আর সেই সচেতনতার দিকেই ওম যোগ ইনস্টিটিউটের প্রতিটি প্রয়াস।
28/06/2026
The journey 🪷
সময় কীভাবে বয়ে যায়, তা মাঝে মাঝে ভেবে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাই। মনে হয় যেন সেদিনেরই কথা, অথচ দেখতে দেখতে দশ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে।
আজও মনে পড়ে সেই ছেলেটির কথা, যে এক অদম্য তৃষ্ণা নিয়ে আশ্রমে আশ্রমে, মঠে মঠে, কখনও গ্রামে গঞ্জে, সাধু-মহাত্মাদের সান্নিধ্যে ঘুরে বেড়াত। তার একটাই প্রশ্ন ছিল—যোগ কী? যোগ কীভাবে সম্ভব? কীভাবে মানুষের শরীর, মন ও চেতনার মধ্যে সেই রূপান্তর ঘটে, যার কথা শাস্ত্র বলে? কীভাবে মানুষ প্রকৃত অর্থে যোগযুক্ত হতে পারে এবং দুঃখ, সুখ, জরা ও সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারে?
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই চলত নিরন্তর অধ্যয়ন। শাস্ত্রের পর শাস্ত্র, মহাপুরুষদের জীবনী, সাধকদের অভিজ্ঞতা—যা কিছু হাতে পেতাম, পড়তাম। হয়তো কোথাও কোনো সংকেত লুকিয়ে আছে, যা পথ দেখাবে। তখন দিন-রাতের হিসাব যেন ছিল না। প্রায়ই তিন-চার ঘণ্টার বেশি ঘুম হতো না। ধ্যান, সাধনা ও অধ্যয়নেই কেটে যেত অধিকাংশ সময়।
এরপর একদিন শ্রীঅরবিন্দের একটি উক্তি পড়লাম—"Anything can be done if God's touch is there." সেই একটি বাক্য যেন আমার অন্তরের গভীরে আলো জ্বালিয়ে দিল। ঈশ্বরের কৃপা এবং গুরুদেবের আশীর্বাদে ধীরে ধীরে পথ খুলতে শুরু করল। তবে পথ কখনও সহজ ছিল না। নানা ঝড়, প্রতিকূলতা, ব্যর্থতা ও পরীক্ষার মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হয়েছে, এখনও সেই পথচলা অব্যাহত রয়েছে।
এই দীর্ঘ যাত্রায় আমি যে সবচেয়ে বড় সম্পদ লাভ করেছি, তা হলো আত্মবিশ্বাস এবং ঈশ্বরের প্রতি অটল বিশ্বাস। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, "যার নিজের উপর বিশ্বাস নেই, সে ঈশ্বরেও বিশ্বাস করতে পারে না।" যোগ আমাকে সেই আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। শাস্ত্রে বলা হয়েছে—"নাস্তি যোগসমং বলম্"—যোগের সমান বল আর নেই। যোগ মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগ্রত করে, তাকে দৃঢ়, স্থির ও নির্ভীক করে তোলে।
আমার পরম শ্রদ্ধেয় গুরুদেব ও আচার্যদের কৃপায় আমি এই শিক্ষার পথে চলার সুযোগ পেয়েছি। তাঁদেরই আদেশ ও আশীর্বাদে আমি যোগ শিক্ষা দিতে শুরু করি। কারণ গুরু-পরম্পরার শিক্ষা কেবল নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য নয়; তা মানুষের কল্যাণে প্রবাহিত হওয়ার জন্য।
আজও আমি নিজেকে শিক্ষক নয়, একজন চিরন্তন ছাত্র বলেই মনে করি। প্রতিদিন নতুন কিছু শিখছি, সাধনা করছি এবং সেই শিক্ষাই যথাসাধ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি।
অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করেন—যোগ ইনস্টিটিউটের নাম "ওম" কেন? সেই গল্পটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কীভাবে এই প্রতিষ্ঠানের নাম "ওম যোগ ইনস্টিটিউট" হলো, সেই ঘটনাটি পরবর্তী লেখায় আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নেব।
এই অধমের যাত্রার কিছু কথা আজ আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে ইচ্ছে হলো। তাই হৃদয়ের কিছু অনুভূতি শব্দে প্রকাশ করার একটি ছোট্ট চেষ্টা করলাম। যদি এই লেখার কোনো অংশ একজন মানুষকেও তার সাধনার পথে অনুপ্রাণিত করে, তাহলেই এই প্রয়াস সার্থক বলে মনে করব।
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।
23/06/2026
🕉️ যোগা নয়, যোগ — আসুন একটা ভুল শুধরে নেওয়া যাক।
বর্তমানে আমরা অনেকেই অভ্যাসবশত "যোগা" শব্দটি ব্যবহার করি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শাস্ত্রসম্মত, ভাষাগত এবং সংস্কৃতিগত দৃষ্টিতে সঠিক শব্দ হলো "যোগ", "যোগা" নয়।
"যোগ" শব্দটি সংস্কৃত "যুজ্ (युज्)" ধাতু থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ যুক্ত হওয়া, সংযোগ স্থাপন করা বা একীভূত হওয়া। পতঞ্জলির যোগসূত্রসহ সমস্ত প্রাচীন যোগশাস্ত্রে "যোগ (योग)" শব্দটিই ব্যবহৃত হয়েছে, "যোগা" নয়। যেমন পতঞ্জলি বলেছেন—
> योगश्चित्तवृत्तिनिरोधः
যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ
অর্থাৎ, চিত্তবৃত্তির নিরোধই যোগ।
তাহলে "যোগা" শব্দটি এলো কোথা থেকে? আসলে সংস্কৃত "योग" শব্দটি যখন ইংরেজিতে লেখা হয়, তখন তা Yoga হিসেবে লেখা হয়। ইংরেজি ভাষাভাষীরা এর উচ্চারণ করেন "ইয়োগা" বা "যোগা"। কিন্তু এটি মূল শব্দ নয়, কেবল একটি ইংরেজি উচ্চারণ।
যেমন আমরা Krishna-কে "কৃষ্ণ" বলি, "কৃষ্ণা" বলি না; Buddha-কে "বুদ্ধ" বলি, "বুদ্ধা" বলি না; Karma-কে "কর্ম" বলি, "কর্মা" বলি না। ঠিক তেমনই Yoga-এর সঠিক বাংলা ও সংস্কৃত নাম "যোগ", "যোগা" নয়।
তাই যারা "যোগা" শব্দটি ব্যবহার করছেন, তাঁদের প্রতি বিনীত অনুরোধ— অনুগ্রহ করে শব্দটি একবার ভেবে দেখুন। আমরা যখন বাংলা বা ভারতীয় ভাষায় কথা বলি, তখন ইংরেজি উচ্চারণের পরিবর্তে মূল শব্দটি ব্যবহার করাই অধিক যুক্তিযুক্ত ও সম্মানজনক। "যোগা শিক্ষক" নয়, "যোগ শিক্ষক"; "যোগা ক্লাস" নয়, "যোগ ক্লাস"; "যোগা দিবস" নয়, "আন্তর্জাতিক যোগ দিবস"।
শব্দ শুধু উচ্চারণ নয়, শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস, সংস্কৃতি, দর্শন ও ঐতিহ্য। তাই আসুন, আমরা আমাদের প্রাচীন জ্ঞান-পরম্পরার প্রতি সম্মান জানিয়ে "যোগা" নয়, "যোগ" বলি এবং অন্যকেও সঠিক শব্দটি ব্যবহার করতে উৎসাহিত করি।
মনে থাকবে তো?
যোগা নয়, যোগ।🙏 Nayan Mallick
09/06/2026
কেন “যোগ ব্যায়াম” বলে কিছু নেই? আছে যোগাসন।
আজকাল প্রায় সর্বত্র “যোগ ব্যায়াম” কথাটি শোনা যায়। কিন্তু যোগশাস্ত্রের দৃষ্টিতে এই শব্দবন্ধটি যথার্থ নয়। কারণ ব্যায়াম এবং যোগাসন এক বিষয় নয়। ব্যায়াম একটি শারীরিক অনুশীলন, আর যোগাসন যোগের একটি অঙ্গ, যার উদ্দেশ্য শরীরকে শুধু শক্তিশালী করা নয়, বরং শরীর, প্রাণ ও মনকে একসূত্রে বেঁধে উচ্চতর সাধনার জন্য প্রস্তুত করা।
পতঞ্জলি যোগসূত্রে বলেছেন—
> “স্থিরসুখমাসনম্”
অর্থাৎ, যে অবস্থায় স্থির ও স্বচ্ছন্দে থাকা যায়, সেটাই আসন।
লক্ষ্য করুন, এখানে কোথাও শরীরকে ক্লান্ত করা, ঘাম ঝরানো বা পেশী ফুলিয়ে তোলার কথা বলা হয়নি। আসনের মূল উদ্দেশ্য হলো এমন এক স্থিতি অর্জন করা, যেখানে শরীর ধ্যানের সহায়ক হয়, বাধা নয়।
ব্যায়াম ও আসনের আকাশ-পাতাল পার্থক্য
🔹 ব্যায়ামের উদ্দেশ্য শরীরের শক্তি, সহনশীলতা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
🔹 আসনের উদ্দেশ্য শরীর, শ্বাস, প্রাণ ও মনকে সুষম ও স্থির করা।
🔹 ব্যায়ামে গুরুত্ব পায় গতি, পুনরাবৃত্তি ও শারীরিক পরিশ্রম।
🔹 আসনে গুরুত্ব পায় স্থিরতা, সচেতনতা, শ্বাসের সমন্বয় এবং অন্তর্মুখী মনোযোগ।
🔹 ব্যায়াম প্রধানত পেশী, অস্থি, সন্ধি ও শরীরের বাহ্যিক কাঠামোর উপর কাজ করে।
🔹 আসন শুধু পেশীর উপর কাজ করে না; এটি স্নায়ুতন্ত্র, নাড়ীমণ্ডল, অন্তঃকরণ এবং প্রাণশক্তির প্রবাহের উপরও গভীর প্রভাব ফেলে। সঠিক শ্বাস, মুদ্রা, বন্ধ ও দৃষ্টির সঙ্গে অভ্যাস করলে আসন শরীরের সূক্ষ্ম স্তরগুলিকেও স্পর্শ করে।
বাইরে থেকে একটি জিমের স্ট্রেচিং আর একটি যোগাসন দেখতে একই রকম হতে পারে। কিন্তু যদি সেখানে সচেতন শ্বাস, প্রাণের অনুভব ও মনের উপস্থিতি না থাকে, তাহলে তা যোগাসন নয়; কেবল শরীরচর্চা।
পঞ্চকোষের আলোকে পার্থক্য
যোগশাস্ত্র বলে, মানুষ কেবল একটি শরীর নয়। আমাদের অস্তিত্ব পাঁচটি কোষ বা আবরণের সমষ্টি—
অন্নময় কোষ — শারীরিক দেহ
প্রাণময় কোষ — প্রাণশক্তির স্তর
মনোময় কোষ — মন ও অনুভূতি
বিজ্ঞানময় কোষ — বিবেক ও প্রজ্ঞা
আনন্দময় কোষ — অন্তর্নিহিত আনন্দ ও চৈতন্য
ব্যায়াম কোথায় কাজ করে?
ব্যায়াম প্রধানত অন্নময় কোষে কাজ করে। অর্থাৎ পেশী, অস্থি, হৃদযন্ত্র, ফুসফুস ও শরীরের সামগ্রিক সক্ষমতাকে উন্নত করে। এর কিছু প্রভাব প্রাণময় স্তরেও পড়তে পারে, কিন্তু সেটি তার মূল উদ্দেশ্য নয়।
আসন কোথায় কাজ করে?
যোগাসন প্রথমে অন্নময় কোষকে স্থিতিশীল করে, তারপর প্রাণময় কোষে প্রাণপ্রবাহকে সুষম করে, মনোময় কোষকে শান্ত করে এবং ধীরে ধীরে সাধককে বিজ্ঞানময় ও আনন্দময় কোষের অভিজ্ঞতার জন্য প্রস্তুত করে।
এই কারণেই একজন ব্যক্তি ব্যায়াম করে শক্তিশালী হতে পারেন, কিন্তু যোগাসনের মাধ্যমে তিনি একই সঙ্গে স্থির, সচেতন ও অন্তর্মুখীও হয়ে উঠতে পারেন।
মনে রাখুন
ব্যায়াম শরীরকে গড়ে তোলে।
যোগাসন শরীরকে স্থির করে।
ব্যায়াম বাহ্যিক শক্তি বাড়ায়।
যোগাসন অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য সৃষ্টি করে।
ব্যায়াম প্রধানত অন্নময় কোষে কাজ করে।
যোগাসন অন্নময়, প্রাণময় ও মনোময় কোষকে পরিশীলিত করে।
আর যখন আসনের সঙ্গে প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা ও ধ্যান যুক্ত হয়, তখন যোগসাধনা মানুষকে বিজ্ঞানময় ও আনন্দময় কোষের উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়।
তাই যোগকে শুধুমাত্র “ব্যায়াম” বলে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়। ব্যায়াম শরীরের জন্য, কিন্তু যোগাসন শরীর, প্রাণ ও মনের জন্য। আর যোগ—মানুষকে তার প্রকৃত স্বরূপের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি বিজ্ঞান। 🕉️🙏
তাই বলুন “যোগাসন”, “যোগ ব্যায়াম” নয়।-- নয়ন মল্লিক
26/05/2026
অনেকে মনে করেন অনলাইনে যোগ শেখা সম্ভব নয়। আমি সেই ধারণার সঙ্গে একমত নই। কারণ যোগ শেখার ক্ষেত্রে বয়স, স্থান বা শারীরিক সীমাবদ্ধতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আপনার ইচ্ছাশক্তি এবং ডিসিপ্লিন।
যোগ শুরু হয় ডিসিপ্লিনে, আর গভীরতাও আসে নিয়মিত অভ্যাসের মাধ্যমে। গত দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের যোগের বিষয়ে আগ্রহী মানুষদের অনলাইন ও অফলাইনে যোগ শিক্ষা দিয়ে চলেছি। তাই আমি মনে করি না যে অনলাইন কোনো সীমাবদ্ধতা। আসল সীমাবদ্ধতা অনেক সময় আমাদের অলসতা এবং শুরু না করার মানসিকতা।
আপনি যদি সত্যিই শুরু করতে পারেন, তাহলে ধীরে ধীরে বাকি পথ নিজেই প্রসস্থ হতে শুরু করবে। আপনি যদি সময় দিতে প্রস্তুত থাকেন, আমি প্রস্তুত আপনাকে যোগ শিক্ষা দেওয়ার জন্য।
যোগাযোগ করতে পারেন নীচে দেওয়া WhatsApp নাম্বারে
082400 22633
24/05/2026
অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেন— “আপনি কি ধ্যান শেখান?”
আমি তাদের বলি, ধ্যান আসলে শেখানোর বিষয় নয়। ধ্যান কোনো কৌশল বা শুধুমাত্র একটি প্র্যাকটিস নয়, ধ্যান হলো একটি অবস্থা।
প্রত্যাহার ও ধারণার অভ্যাস করা যায়, কিন্তু ধ্যানকে জোর করে করা যায় না। যখন প্রত্যাহার ও ধারণার অভ্যাসে মন ধীরে ধীরে স্থিত, সংহত ও শান্ত হয়, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধ্যানের অবস্থা প্রকাশ পায়।
তাই ধ্যান আপনাকে কেউ “করিয়ে” দিতে পারবে না। ধ্যান হলো নিজের অন্তরে অর্জিত একটি অবস্থা, যা নিজের সাধনা ও অন্তর্মুখীতার মাধ্যমে লাভ করতে হয়।
অনেকেই মনে করেন, “মন শান্ত করার জন্য ধ্যান করতে হয়।” কিন্তু প্রকৃত অর্থে বিষয়টি উল্টো।
মন শান্ত করার জন্য ধ্যান নয়; বরং মন যখন শান্ত ও স্থির হয়, তখনই ধ্যান সম্ভব হয়। আর সেই মনকে শান্ত ও সংহত করার পথ হলো প্রত্যাহার ও ধারণার নিয়মিত অভ্যাস।
অর্থাৎ, প্রত্যাহার মনকে বাহ্যবিষয় থেকে ফিরিয়ে আনে, ধারণা মনকে একাগ্র করে, আর সেই একাগ্র ও শান্ত মনের স্বাভাবিক পরিণতিই হলো ধ্যান।--- নয়ন🪷
20/05/2026
যোগ শুধু দিনে আধঘণ্টা বা এক ঘণ্টা আসনে বসে ধ্যান করার নাম নয়। তুমি আধঘণ্টা যোগধ্যান করলে খুব ভালো, কিন্তু দিনের বাকি সময় যদি অচেতনভাবে কাটাও—নিজের শরীর, শ্বাস-প্রশ্বাস, চলাফেরা, খাদ্যগ্রহণ, জলপান কিংবা মানুষের সঙ্গে ব্যবহার সম্পর্কে যদি কোনো সচেতনতা না থাকে, তবে সেটি প্রকৃত যোগাভ্যাস নয়।
যোগ আমাদের শেখায় প্রতি মুহূর্তে সচেতন থাকার অভ্যাস।
কীভাবে হাঁটছো, কীভাবে কথা বলছো, কীভাবে খাচ্ছো, কীভাবে শ্বাস নিচ্ছো—জীবনের প্রতিটি ক্ষুদ্র কর্মকাণ্ডে চেতনার উপস্থিতি আনা, এটাই যোগের মূল সাধনা।
সবাই চিত্তের বৃত্তিগুলি দমনের কথা বলেছেন, কিন্তু খুব কম মানুষই বলছেন—তার আগে চিত্তের বৃত্তিগুলি সম্বন্ধে সচেতন হওয়ার কথা। তুমি যদি নিজের সম্বন্ধেই সচেতন না হও, তাহলে তোমার ভিতর থেকে কী ঢেউ উঠছে, কোন চিন্তা, কোন আসক্তি, কোন রাগ, কোন ভয় তোমাকে পরিচালিত করছে, তা তুমি জানতেই পারবে না।
তাই প্রথমে দরকার সচেতনতার অভ্যাস।
তারপর নিজের মন, নিজের চিত্তের বৃত্তিগুলিকে প্রত্যক্ষ করা।
আর সেই বৃত্তিগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ বা নিরোধ করার যে অভ্যাস—সেটাই প্রকৃত যোগসাধনা।
শুধু চোখ বন্ধ করে বসে থাকাই ধ্যান নয়, বরং চোখ খুলে জীবনকে সচেতনভাবে দেখা—এটাই প্রকৃত ধ্যান।
ধীরে ধীরে তুমি বুঝতে পারবে, এই সচেতনতার মধ্যেই এক গভীর আনন্দ লুকিয়ে আছে। কারণ ঈশ্বরের যে তিনটি গুণ বলা হয়—সৎ, চিত, আনন্দ—
সৎ অর্থাৎ চিরসত্য অস্তিত্ব
চিত অর্থাৎ চৈতন্য বা সর্বব্যাপী সচেতনতা
আনন্দ অর্থাৎ সেই চৈতন্যের স্বাভাবিক পরিতৃপ্তি
এই “চিত” বা চৈতন্য সর্বদা সর্বত্র বিরাজমান। কিন্তু সেই সর্বব্যাপী চেতনাকে উপলব্ধি করতে হলে প্রথমে তোমাকে নিজের শরীর, নিজের অস্তিত্ব, নিজের ভিতরের চলমান প্রাণপ্রবাহ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।
নিজের মধ্যেই যদি জাগ্রত না হও, তবে সর্বব্যাপী ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের সেই Ever-Existing, Omnipresent Nature অনুভব করা সম্ভব নয়।
যোগ তাই কোনো এক ঘণ্টার অনুশীলন নয়—
যোগ হলো প্রতিটি শ্বাসে, প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি মুহূর্তে জেগে থাকার কৌশল।----- নয়ন।