02/11/2026
কোনো আশা ছিল না। ভাল ফুটবল খেলতেন। অভিনয় জানতেন। এটুকু বুঝেছিলেন মুম্বাইয়ের এই কঠিন জগতে বাবা-কাকা ছাড়া বাঁচা মুশকিল। আর তাই ভদ্রলোক ঠিক সেটাই করেছিলেন যেটা ছাড়া টিঁকে থাকা অসম্ভব। অন্যের হেলায় ফেলে দেওয়া ভূমিকায় একের পর এক অভিনয় করে গেছেন, আর নিজের একশো শতাংশ ঢেলে দিয়েছেন তাতে। শাহরুখ খানের উত্থান এক নায়কের উত্থানের গল্প,রক্ত ঘাম ঝরানো পারফরমেন্সের গল্প, আবার একই সঙ্গে পপার টু প্রিন্সের গল্প, স্টুডিও ঘরানার শেষ মহানায়কের গল্প।
বলিউড সিনেমার ইতিহাস লেখা হলে আশির দশক এক অদ্ভুত টালমাটাল জায়গায় থাকবে। এই দশকের মাঝামাঝি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির মেন স্ট্রিম নায়করা বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন, তবু মেনে নিতে চাইছেন না। একের পর এক সিনেমায় কলেজ বয় সাজছেন আর ডুবাচ্ছেন। কোম্ফোর্ট জোন থেকে বেড়িয়ে আসার বিন্দুমাত্র চেষ্টাটুকু করছেন না। অন্যদিকে এই দশকে উঠে আসা তরুণ নায়করা, আমীর খান, সলমন খান, কুমার গৌরব, অনিল কাপুর-ও একেবারে ছকে বাঁধা হিরোর বাইরে বেরোচ্ছেন না। ফলতঃ গোটা বলিউড একটা আবদ্ধ কুয়োতে ঘুরপাক খাচ্ছে। যেন একতু অন্য রকম হলেই ফ্যানরা মুখ ঘুড়িয়ে নেবেন। আর এখানেই একেবারে বহিরাগত হয়ে শাহরুখের আবির্ভাব। দিল্লী থেকে আসা, সিরিয়ালে অভিনয়, In Which Annie Gives It Those Ones এর মত অন্যধারার ছবিতে অভিনয়, হাতে আসা যে কোন কাজের জন্য হাপিত্যেশ- এই সবকটাই তার বিরুদ্ধে ছিল হয়তো। আর সেই অভিশাপই আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছিল তার জীবনে। জানতেন তার চেহারায় হিরো হতে পারবেন না। তাই অভিনেতা হতে চেয়েছিলেন মনেপ্রাণে। সেই পথেই প্রায় এক দশক ধরে অস্থির প্রেম, পাগলামো আর প্রতিশোধের মুখ হয়ে উঠলেন একেবারে সাধারণ চেহারার এই ছেলেটি, যে আপনি আমি যে কেউ হতে পারে।
গোটা বাজিগর ছবিতে তার জীবনের ওয়ান পয়েন্ট অ্যাজেন্ডা। যে মদন চোপড়া তার পরিবারের দুর্দশার জন্য দায়ী, তাকে ধ্বংস করা। যেন তেন প্রকারে। মদন চোপড়ার জন্যেই তার মা আজ পাগল, বোন আর বাবা মৃত। এই ধরনের প্রতিশোধের ছবি আগেও বলিউড দেখেছে। দিওয়ার, জঞ্জির কিংবা ইয়াদো কি বারাত- তো এই ধরনের প্রতিশোধেরই ছবি। তাহলে বাজিগর আলাদা কোথায়? এই প্রথমবার হিন্দি ছবির কোন হিরো প্রতিশোধের জন্য একেবারে নির্দোষ কাউকে খুন করল। মদন চোপড়ার মেয়ে সীমাকে সে শুধু খুনই করে না, খুন করে অদ্ভুত স্যাডিস্টিক প্লেজার-ও পায়। এ জিনিস দর্শক আগে কখনও দেখে নি। হিরো যে একেবারে বিবেকশূন্য খুনিও হতে পারে, তা ভেবে দর্শকের শিরদাঁড়ায় যে শীতল স্রোত বয়ে যায়। শুধু তাই নয়, সীমার দুই বন্ধু যারা অজয়রূপী শাহরুখকে সন্দেহ করে, দুইজনকেই নৃশংসভাবে খুন করে সে। একেবারে বিবেকশূন্যতার চরমে গিয়ে। গীতার সেই “জানামি ধর্ম ন চ মে প্রবৃত্তি/ জানাম অধর্ম ন চ মে নিবৃত্তি”-র মত অজয় জানে ঠিক কি, ভুলই বা কি। কিন্তু সে অন্যায় না করে পারে না। আর এই পাগলামোকে কি নিখুঁত ফুটিয়ে তোলেন শাহরুখ। সীমার পার্টির যে ছবিতে তাকে দেখা গেছিল, সেই ফটোকে পুড়িয়ে না ফেলে সে গিলে ফেলে। সাইকোপ্যাথ হিরোর অবতারণা হিন্দি ছবিতে এইভাবে আগে কোনদিন দেখা যায় নি। কিন্তু তার পরেই ছবি কিছুটা জাস্টিফিকেশান আর প্রিচিং-এর দিকে ঝুঁকে যায়। সিনেমার সবচেয়ে দুর্বল অংশ সেইটাই। অনন্ত মহাদেবন (যিনি ছবিতে শাহরুখের বাবা) এক সাক্ষাতকারে জানিয়েছিলেন আব্বাস- মস্তান সিনেমা শেষের পর আবিষ্কার করেন, তার হিরো প্রায় অকারণেই একের পর এক খুন করে যাচ্ছে। তখনই নাকি অজয়ের বাবা- মা ইত্যাদির ক্যারেক্টার আর্কগুলো নিয়ে আসা হয়। শেষে মদন চোপড়াকে খুন করে মায়ের কোলে মাথা রেখে অজয় মারা যায়। অপরাধী, সে যদি নায়কও হয়, তবুও শাস্তি পায়। আর শাহরুখ পান সেই বছরের সেরা অভিনেতার ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার।
বাজিগরের ঠিক পরে পরেই শাহরুখ একই ধরনের দুটো নেগেটিভ রোল করলেন। ডর ছবির রাহুল মেহরা আর আঞ্জামের বিজয় অগ্নিহোত্রী। এখানে আর প্রতিশোধ না, বরং অবসেশন। দুটো ছবিতেই চরিত্ররা নায়িকার প্রতি অবসেশড আর সেই অবসেশন এই পর্যায়ে যায়, যে সে ধীরে ধীরে সাইকোপ্যাথ হয়ে ওঠে। ডর-এ তার চরিত্রের মালটিপল পারসোনালিটি ডিজর্ডার আছে। আমি না, সিনেমায় ডাক্তারই বলেছেন। সে নিজের মরা মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে, মায়ের মৃত্যুর জন্য বাবাকে দায়ী করে, আর নিজেই ভেবে নেয় কলেজের সহপাঠী কিরণ (জুহি চাওলা) তাকে ভালবাসে। এই ছবিতে সে সুইসাইডাল, সে স্যাডিস্টিক। বুক চিরে কিরণ লিখতে তার হাত বিন্দুমাত্র কাঁপে না। যেমন অনায়াসে সে ভাবতে পারে কিরণের প্রেমিক সুনীলকে (সানি দেওল) খুনের কথা। এই পাগল মা-হারা ছেলেটার প্রতি ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের করুণাও হয়। কিন্তু ওই যে। সে অপরাধী। তাকে মরতেই হবে শেষে। এখানে একটা কথাই বলার। আগে শাহরুখের রোলটা সানিকে অফার করা হয়েছিল। তিনি নেন নি। হিরো নাকি নেগেটিভ রোলে মানায় না। ভাগ্যিস!!!
আনজাম ছবিটা এই ধারার শেষ ছবি। আর তিনটের মধ্যে সবচেয়ে ডার্ক-ও বটে। বিবেকের মধ্যে অদ্ভুত এক শয়তানী খেলা করে, যার সে অর্থে কোন কারণ নেই। সে যেন এক দুরন্ত শিশু, যে সুন্দর কোন খেলনাকে ভেঙেই স্যাডিস্টিক প্লেজার পায়। শুধু অপরাধের আনন্দেই অপরাধ। ব্যাটম্যানের জোকারের সঙ্গে এই জায়গায় বিজয়ের অদ্ভুত মিল। নায়িকা শিবানীকে (মাধুরী দীক্ষিত) সে পেতে চেষ্টা করে। যখন বোঝে পাবে না, তখন প্রথমে হাতের শিরা কেটে আত্মহত্যা করতে চায়, বিফল হয়ে খুনের এক অদ্ভুত খেলায় মেতে ওঠে। সত্যি বলতে শিবানীর স্বামীকে হত্যা, শিবানীকে সেই হত্যার জন্য ফাঁসানো, তার দুনিয়াকে একেবারে শেষ করে দেবার পিছনে আপাত কোন মোটিভই নেই। এই ছবিতে শাহরুখ আদ্যন্ত এক বলি-মেগালোম্যানিয়াক ভিলেন। একমাত্র এই ছবিতেই দর্শকদের বিন্দুমাত্র সহানুভূতি সে পায় না। এই প্রথম দর্শক মনে প্রাণে চায় শাহরুখ মরুক।
এই তিনটে সিনেমা করে শাহরুখ খান বলিউডি নায়কের চিরাচরিত ধারণাকে একেবারে চুলের মুঠি ধরে নেড়ে দিলেন। জানি না, তার দেখাদেখি কিনা, কাজল-ও গুপ্ত ছবিতে আদ্যন্ত এক ভিলেনের ভূমিকায় চমকে দিলেন দর্শককে। শুধু ভেবে দেখুন আগের তিনটে ছবি বাদেও জীবনের শুরুর দিকে কি সব ভূমিকায় অভিনয় করছেন শাহরুখ! রাম জানের চরম ম্যানারিজম, মায়া মেমসাবের অস্থির তরুণ, কভি হাঁ কভি না-তে হতাশ একপেশে প্রেমিক। শাহরুখ খান মানেই তখন নিত্য নতুন চমক। এক একটা ছবি, এক এক ঘরানার, এক এক স্বাদের। কোন বলিউড অভিনেতা জীবনের শুরুতেই প্রায় সব জঁরের সিনেমায় অভিনয় করেছেন, এমন উদাহরণ আর দুটি নেই।
তারপর কোথা থেকে কি হইয়া গেল, দিলওয়ালে দুলহনিয়া রিলিজ হইল।
আমার মতে অভিনেতা শাহরুখ ঠিক এখানেই দশ গোল খেয়ে গেলেন নায়ক, রোম্যান্টিক হিরো শারুক খানের কাছে। জানি না, কে বা কারা তাঁকে বুঝিয়ে দিল এবার এতদিনে তুমি তোমার জায়গা খুঁজে পেয়েছ। কম্ফোর্ট জোন চিনে নিয়েছ। এবার সেই কম্ফোর্টেই খেলে যাও। শাহরুখের বয়স বাড়ছিল। আমার বিশ্বাস তিনিও ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছিলেন নিজেকে প্রমাণ করতে করতে। থিতু হবার জন্যে এবার চলল লাইন ধরে একই রকম ছবি একই ম্যানারিজমে বানিয়ে চলা। স্বদেশ কিংবা চক দে- যতবার তাঁর জীবনে এসেছে, আমরা ভেবেছি এই তো পুরোনো ছন্দে ফিরছেন শাহরুখ। আমাদের একেবারে ভ্রান্ত প্রমাণ করে আবার তিনি ফিরে গেছেন মন্নতের আরামদায়ক ওমে। উদাহরণ তাঁর সামনে ছিল। ছিল বিরাট লম্বা একদা সব হারানো অমিতাভ বচ্চন, যিনি এই বয়সেও নিজের আগের ইমেজকে পর্দায় ধ্বংস করছেন নিজের হাতে।
একমাত্র শাহরুখ খান এটা পারেন। জানি না কেন করেন না। তিনি এই অভাগা দেশের শেষ সুপারহিরো। এই মিডিওকারদের দলের শেষ গলিয়াথ। প্রায় ষাটের কোঠায় চলে এসেছেন তিনি। বিজয় সেথুপথি, পঙ্কজ ত্রিপাঠিরা এর অনেক কম বয়েসেই ভারতীয় সিনেমাকে সেরা কিছু প্রৌঢ় উপহার দিয়েছেন। শাহরুখ এখনও পাঠান বানিয়ে হল কাঁপাচ্ছেন, যেখানে আমরা সেই পুরোনো শাহরুখের চর্বিত চর্বন করছি। নতুন কাউকে পাচ্ছি না।
উত্তমকুমার একবার সৌমিত্রকে বলেছিলেন "বুড়ো হলে চুটিয়ে সিনেমা করব, বুঝলি পুলু। তুই আর আমি। এখানে ভাল বুড়ো নেই"। উত্তম নিজে পারেন নি।জীবন তাঁকে পারতে দেয় নি; যদিও শেষদিকে মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন। সিনেমায় ভাল বুড়োদের দরকার।
চিৎকার করে সবাই বলতে চাইল হিরো না...আবার অভিনেতা শাহরুখের জন্ম হোক। শাহরুখ হাসলেন। কে বলেছে দুটোই একসঙ্গে হয় না!! জওয়ান এল। শাহরুখ এলেন। দেখলেন। জয় করলেন।
বাকিটা আবার নতুন করে ইতিহাস লেখা শুরু। লোকটা এত্তবার সবাইকে বোকা বানায় কি বলব... জন্মদিনে ভাল থেকো শাহরুখ।
Courtesy- koushik majumdaar