মোহনবাগানি সংষ্কৃতি

মোহনবাগানি সংষ্কৃতি সবার ওপর মোহনবাগান সত্য তাহার ওপর নাই?

*অরুন ঘোষ আর প্যানাস* *লেখক -অর্ঘ্য ব্যানার্জী* (সাংবাদিক)১৯৭৫ এবং ২০২৬! অরুণ ঘোষ এবং পানোস!  ‘মোহনবাগান মনে হচ্ছে ভুল ক...
24/08/2026

*অরুন ঘোষ আর প্যানাস*

*লেখক -অর্ঘ্য ব্যানার্জী* (সাংবাদিক)

১৯৭৫ এবং ২০২৬! অরুণ ঘোষ এবং পানোস!
‘মোহনবাগান মনে হচ্ছে ভুল করল। পানোসকে কেন কোচ করতে গেল? সাফল্যই তো নেই!’

মরসুম শুরুর আগে যখন পানোসের নাম ঘোষণা করা হয়েছিল, এই কথাগুলো বলেছিল আমাদের সাংবাদিক পার্থ দত্ত। পানোস সাফল্য আনতে পারবেন কি পারবেন না, এই নিয়ে কাগজে লিখেও দিল।

পাশে বসে কাজ করি। আমি বললাম, ‘আরে একজন সবে দায়িত্ব নিয়েছে। কাজই শুরু করল না। তুমি এখনই এত নেগেটিভ লিখে দিলে।’
পার্থদার উত্তর ছিল, ‘দেখে নিস, কী হয়। পরে বলিস আমায়।’

পার্থদা দীর্ঘদিন ধরে ফুটবল করছে। অসংখ্য ডার্বি ম্যাচ কভার করেছে। ডুরান্ড কভারের তালিকা হলে প্রথম পাঁচে থাকবে। তাই, এই সব ভেবে তখন আর কথা বাড়াইনি।

রবিবার রাতে পার্থদার কথাগুলো হঠাৎ বাস্তব মনে হলো। মোহনবাগানের গ্রিক কোচ দেখতে দারুন। ইংলিশও বলেন অসাধারণ। কিন্তু স্ট্র্যাটেজি?

টিম লিস্টে প্রথম একাদশে সাহলের নাম নেই! সবচেয়ে ভালো ফর্মে থাকা সাহলই নেই। প্রেসবক্সে সম্পূর্ণা বলল, ‘এটা কী করল গো! সাহলকে ছাড়া টিম!’ আমি বললাম, ‘আরে, কোচ তো তোমার-আমার চেয়ে বেশি বোঝে নাকি! খেলাটা দেখো না।’ ও মানল না। ম্লান হেসে বলল, ‘জানি না, মনটা কু ডাকছে।’

ম্যাচ শেষে পানোস মিডিয়ার সামনে আসেননি। তাই, প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল না।

কিন্তু দুটো জিনিস বলতেই হচ্ছে। ইস্টবেঙ্গল যে আজ পাঁচ গোল দিতে পারল না, সেটা তাদের ব্যর্থতা। আর দুই, মোহনবাগানের চরম ক্লান্তি।

এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই, শিলং থেকে যে ভাবে সেমিফাইনাল ম্যাচ খেলিয়ে এনে একদিনের ব্যবধানে মোহনবাগানকে ফাইনালে একেবারে ডার্বি খেলিয়ে দেওয়া হলো, ডুরান্ড কমিটির দিকে আঙুল উঠবেই। শিডিউল থেকে শুরু করে সব কিছুই একেবারে অবৈজ্ঞানিক। ডুরান্ড পারলে দুটো কেন, তিনটে ডার্বি খেলিয়ে দিত! মোহনবাগান কর্তাদের এ নিয়ে অবশ্যই প্রতিবাদ জানানো উচিত।

আর এখানেই আমার প্রশ্ন।
টিমের যখন এমন অবস্থা, বৃষ্টির মাঠে খেলতে হয়েছে। বিমান বিভ্রাটে অনেক রাতে ঢুকতে হয়েছে, সেখানে ডার্বির আগের দিনে বিকেলে প্র্যাক্টিস করানোটা কি খুব দরকার ছিল? ইস্টবেঙ্গল কোচ আবাস তো বৃষ্টি ভেজা মাঠ দেখে প্র্যাক্টিস রেখেও করালেন না। মাঠে নামার আগেই স্ট্র্যাটেজিতে বাজিমাৎ।

মনে পড়ে যাচ্ছে, ১৯৭৫ সালের কথা। পাঁচ গোল হজম করেছিল মোহনবাগান। যা ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের কাছে চিরকালীন গর্বের। সেই ম্যাচের আগেও বাগান কোচ প্রাক্তন অলিম্পিয়ান অরুণ ঘোষ টিম নিয়ে চলে গিয়েছিলেন ডায়মন্ডহারবারে, বালিতে প্র্যাক্টিস করাবেন বলে!

লজ়ঝড়া মিনি বাসে করে কলকাতা থেকে ডামন্ডহারবারে গিয়ে বালিতে প্র্যাক্টিস করে আবার ফিরে আসা। এমনিতে পা ভারী হয়ে গিয়েছিল। তার উপরে দুপুরে এক মোহনবাগান কর্তার বাড়ি কব্জি ডুবিয়ে চিংড়ি, ইলিশ, মাটন খেয়ে মাঠে নেমেছিলেন ফুটবলাররা। ফলে, সে দিন যাঁরা মাঠে ছিলেন, তাঁরা অনেকেই পরে আমায় বলেছেন, মাঠে আর পা চলছিল না মোহনবাগান ফুটবলারদের। ক্লান্তিতে ডুবে গিয়েছিল টিম। বাকিটা ইতিহাস। সে দিন উল্টোদিকের কোচের নাম ছিল পিকে ব্যানার্জি। আজ আন্তেনিও আবাস।

ঠিক এত বছর পরেও সেই ছবি! কিন্তু কেন? ’৭৫ সাল আর ২০২৬ তো এক নয়! ফুটবল বিজ্ঞান কোথায় এগিয়ে গিয়েছে এখন।

কড়া হেডস্যার নন। ফুটবলারদের বন্ধু হয়ে উঠুন পানোস। না হলে আপনার কেরিয়ারে এক বছরের বেশি কোনও ক্লাবে কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা যে আর বাড়বে না!

28/07/2026

ভারতে আমরাই গর্ব, আমরাই অহঙ্কার,আমরাই মোহনবাগান
সবাই গলা চিড়ে ধর সবুজ মেরুন গান…

⚫ ইউরোপের বুকে ভারতের জয়ধ্বনি! চণ্ডীগড়ের মিনার্ভা অ্যাকাডেমির অনূর্ধ্ব-১২ দল গোথিয়া কাপের ফাইনালে ব্রাজিলের আরএস স্পোর...
18/07/2026

⚫ ইউরোপের বুকে ভারতের জয়ধ্বনি! চণ্ডীগড়ের মিনার্ভা অ্যাকাডেমির অনূর্ধ্ব-১২ দল গোথিয়া কাপের ফাইনালে ব্রাজিলের আরএস স্পোর্টস ইয়েলোকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এর কয়েক দিন আগেই তারা ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি কাপও জিতেছিল। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে ইউরোপের দু'টি বড় টুর্নামেন্টের শিরোপা জিতে ভারতীয় ফুটবলের মুখোজ্জ্বল করেছে মিনার্ভার খুদে ফুটবলাররা।

◾সুইডেনে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ১০ মিনিটেই কিপগেন থাংসাংলেন মিনার্ভাকে এগিয়ে দেয়। ব্রাজিলিয়ান দল সমতা ফেরালেও ৪৯ মিনিটে মেখামখরাও নংরেমের দুর্দান্ত ফ্রিকিকে ব্যবধান বাড়ায় ভারতীয় দল। এরপর ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে আরএস স্পোর্টস। যদিও শেষ পর্যন্ত ভারতীয় ক্লাবের রক্ষণের বজ্রআঁটুনিতে বারবার আটকে যায় ব্রাজিলের ক্লাব। আর তাতেই চ্যাম্পিয়ন হয় ভারতীয় দল।

◾গোটা টুর্নামেন্টেই ছিল মিনার্ভার দাপট। গ্রুপ পর্বে ইংল্যান্ডের প্রেপ স্কুলস পুমাস ব্লুকে ১২-০, নরওয়ের লিলেস্ট্রম এসকে-৩-কে ১৩-১ এবং আয়োজক সুইডেনের সুরতে আইএস এফকেকে ১৬-০ গোলে হারায় তারা। এরপর নকআউট পর্বে কেনিয়ার লিগ্যাসি অ্যাকাডেমিকে ৬-২, ইংল্যান্ডের প্রেপ স্কুলস লায়ন্সকে ১০-১, ফ্রান্সের ওএফসি কুরোনেসকে ১৭-১ এবং বলিভিয়ার ক্যানচেরিতোস এফসিকে ৮-০ গোলে উড়িয়ে দেয় মিনার্ভা।

◾সেমিফাইনালে ইউক্রেনের এফসি লোকোমোটিভ কিয়েভের বিরুদ্ধে কঠিন লড়াইয়ে ৩-২ গোলে জিতে ফাইনালে ওঠে ভারতীয় দল। এরপর শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে ব্রাজিলের শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারিয়ে ফের চ্যাম্পিয়ন হয় মিনার্ভা। ২০২৩ সালে প্রথম ভারতীয় দল হিসাবে গোথিয়া কাপ জিতে ইতিহাস তৈরি করেছিল মিনার্ভা। গত বছর আর্জেন্টিনার সিইএফ ১৮ টুকুমানকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দ্বিতীয়বার এই টুর্নামেন্টের শিরোপা জেতা মিনার্ভা অ্যাকাডেমি নেমেছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসাবে। তাই ভারতীয় দলকে নিয়ে প্রত্যাশার চাপও ছিল প্রবল। সেই চাপ সামলেই বাজিমাত মিনার্ভার।

◾গত দু’বছরে ইউরোপের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক যুব প্রতিযোগিতায় দুর্দান্ত সাফল্য পেয়েছে মিনার্ভা। নরওয়ে কাপ ও ডানা কাপ জয়ের পাশাপাশি চলতি বছর মেডিটেরেনিয়ান ইন্টারন্যাশনাল কাপে লিভারপুলের অনূর্ধ্ব-১৫ দলকে ৬-০ গোলে হারিয়েও নজর কেড়েছিল তারা। ইউরোপের মাটিতে একের পর এক ট্রফি জিতে মিনার্ভা অ্যাকাডেমিকে ভারতীয় যুব ফুটবলের মুখ বললে অত্যুক্তি হবে না।

(সংবাদ প্রতিদিন)
©️ Faruk Mallick 👈

ক্রিকেট ও ফুটবল সম্পর্কিত সমস্ত রকমের খবর , লেখালেখি ও ম্যাচের আপডেট পাওয়ার জন্য Page টির সাথেই থাকুন ধন্যবাদ..🥰

18/07/2026

*এক ইস্টবেঙ্গল সমর্থকের মোহনবাগানি হওয়ার কথা *
*সংগৃহীত - দেবার্ঘ্য ভট্টাচার্য্য*
এক খাঁটি ইস্টবেঙ্গলের মোহনবাগান হয়ে যাওয়া...
দলবদল কথাটা ময়দানে খুব চলে। তবে, খেলোয়াড়দের নিয়ে। সমর্থকদের নিয়ে নয়। তবু যদি কোনও সমর্থক চিরশত্রুকে বরণ করে নেন, তা হলে লেখা হয় ইতিহাস। অভিমানের ও যন্ত্রণার ব্যক্তিগত ইতিহাস
এক খাঁটি ইস্টবেঙ্গলের মোহনবাগান হয়ে যাওয়া...
ধাক্কা দিয়ে আমাকে দুপুর-বিকেলের ঘুম থেকে তুলে ঠাকুমার ঘর থেকে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন আমার দাদা, মানে ঠাকুরদা। ওঁর ঘরে রেডিয়োয় কোনও এক ফুটবল ম্যাচের ধারাভাষ্য চলছে, টাইব্রেকার হবে।

যদ্দূর মনে পড়ছে, আমি তখন কিন্ডারগার্টেনে। ১৯৮১। ফুটবল মানে সেই সময়ে আমার কাছে বল নিয়ে এক পড়শির বাড়ির বড় উঠোনে একটু-আধটু লাথালাথি। বাবা পেশায় ক্রীড়া সাংবাদিক এবং ছোটকাকা অ্যাথলিট ও অ্যাথলেটিক্সের কোচ, বাড়ির এমন পরিমণ্ডলে খেলাধুলো নিয়ে প্রায় সর্বক্ষণ আড্ডা-আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্কে ফুটবলের প্রসঙ্গে মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল, এই দুটো শব্দ কি কখনও শুনিনি? নিশ্চয়ই শুনেছিলাম, তবে সেই বিকেলের আগে শব্দগুলো আমার এক কান দিয়ে ঢুকে আর এক কান দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। মনে বা মাথায়, হৃদয়ে কিংবা মস্তিষ্কে সেগুলো থেকে যায়নি, যা থেকে গেল সেই বিকেলে।
যেটুকু এখনও চোখে ভাসছে, বলি। খেলাটা হচ্ছিল পশ্চিমবঙ্গের বাইরে। মনে হয়, রোভার্স কাপ, সেমিফাইনাল। মোহনবাগানের বিরুদ্ধে কোন দল খেলছিল, মনে পড়ছে না সেটাও। তবে নিশ্চিত ভাবে বলা যায়, ইস্টবেঙ্গল নয়। টাইব্রেকার শুরু হওয়ার আগে ‘শোনো ভাই’ বলে দাদা ওঁর সামনে বসিয়ে আমাকে যা বললেন, তা এই রকম— মোহনবাগান খেলছে, মোহনবাগান আমাদের দল। আমরা সব সময়ে মোহনবাগানের সাপোর্টার। কলকাতায় ইস্টবেঙ্গল নামে একটা ক্লাব আছে, যারা মোহনবাগানের প্রধান প্রতিপক্ষ, অর্থাৎ আমাদের প্রধান প্রতিপক্ষ। ওরা ভালো নয়। ওদের হয়ে কখনও কথা বলা যাবে না, ওই টিমকে সাপোর্ট করা যাবে না। আজ ম্যাচটা টাইব্রেকারে গড়াল বলে আমরা, মোহনবাগান এগিয়ে থাকছি। কারণ, আমাদের টিমের গোলকিপার পেনাল্টি শট আটকানোর রাজা। শিবাজি ব্যানার্জি। ও-রকম পেনাল্টি শট আটকানোর ক্ষমতা ভারতের আর কোনও গোলকিপারের নেই।
টাইব্রেকারে ওই ম্যাচ জিতে ফাইনালে উঠল মোহনবাগান। শিবাজি ব্যানার্জি দুটো পেনাল্টি শট বাঁচিয়েছিলেন। আমার দাদার মুখে চওড়া হাসি। সেই বিকেলে দাদার কাছে মোহনবাগান মন্ত্রে আমার দীক্ষা হয়ে গেল। দাদার মন্ত্রের প্রভাবে সেই বিকেল থেকেই আমি ‘মোহনবাগানের ছেলে’। দক্ষিণ শহরতলির যাদবপুর এলাকার শ্রীকলোনি নামে একশো শতাংশ পূর্ববঙ্গীয় উদ্বাস্তু এবং ৯৯.৮ শতাংশ ইস্টবেঙ্গল সমর্থকে থিকথিক করা মহল্লায় থেকেও গর্বিত মোহনবাগানি।
এখন তো বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৩৬৬ দিনই বহু বাড়িতে চিকেন হয়। তখন চিকেন কিন্তু সহজলভ্য ছিল না, সস্তাও ছিল না এবং মুরগি বা মাংস খাওয়াটা জলভাত হয়ে যায়নি। তবু সে কালেও, মোহনবাগান মন্ত্রে আমি দীক্ষিত হওয়ার পরে, সবুজ-মেরুন দল কোনও টুর্নামেন্ট জিতলে কিংবা ইস্টবেঙ্গল বা মহামেডান স্পোর্টিংকে হারিয়ে বড় ম্যাচ জিতলে সেই জয় উদ্‌যাপনে দাদা পরের দিন সকালে বাজারে গিয়ে মুরগি আনতেন বাড়ির সকলের জন্য। রাজ্য পুলিশে চাকরি করতেন আমার দাদা জিতেন্দ্রনাথ বিশ্বাস। কনস্টেবল হিসেবে চাকরিতে ঢুকে আইবি (ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ)-র সাব-ইনস্পেক্টর হয়ে তিনি অবসর নেন। গত শতাব্দীর আটের দশকের গোড়ায় পেনশন পেতেন ২০০-২৫০ টাকা। তবু মাসের শেষ হোক বা শুরু, মোহনবাগানের জয়ের পরে বাজার থেকে মুরগি কিনে এনে ওই উদ্‌যাপনে দাদার কোনও কার্পণ্য ছিল না। যত দিন গিয়েছে, দাদু-নাতির মোহনবাগানীয় যুগলবন্দি আরও বেশি করে আঁটসাঁট হয়েছে। ক্লাস টু-তে এক বিকেলে পাড়ায় বল লাথাচ্ছি, এমন সময়ে বাড়ির সদর দরজা থেকে বেরিয়ে আসা দাদার চিৎকার, ‘তাড়াতাড়ি এসো, তাড়াতাড়ি এসো ভাই। আমাদের বিদেশ বোস গোল করেছে।’ পিয়ারলেস ট্রফির মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ। ক্লাস ফোরে পড়ার বছরে ডুরান্ড কাপ ফাইনালে মোহনবাগান-জেসিটি ম্যাচের দিন বাড়ির কাছে টিউশন নিতে গিয়েছি, পড়া প্রায় শেষ, ঝড়ের গতিতে দাদা এসে বললেন, ‘বাড়ি চলো এখনই। আমরা ডুরান্ড চ্যাম্পিয়ন। টাইব্রেকারে তনুময় বোস দুটো পেনাল্টি শট বাঁচিয়ে আমাদের জিতিয়ে দিলো। এখন প্রাইজ় ডিস্ট্রিবিউশন হবে। দেখতে হবে, ওঠো তাড়াতাড়ি।’

তবে আমাদের শিকড় পূর্ববঙ্গের খুলনা জেলায়। এ পারে ঠাকুরদার চাকরি ও কর্মস্থলের সূত্রে তাঁর এবং আমার বাবা-জ্যাঠাদের কলকাতায় চলে আসা। ক্লাস থ্রি বা ফোরে পড়ার সময়ে স্কুলে জনাকয়েক বন্ধুর প্রশ্নের মুখে পড়ে বাড়ি ফিরে এসে দাদাকে জিজ্ঞেস করি, ‘আমরা বাঙাল হয়েও মোহনবাগানকে কেন সাপোর্ট করি? বন্ধুরা যে বলল, বাঙালদের দল ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান ঘটিদের দল!’ প্রশ্নটা শুনে দাদা কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকালেন, তার পরে একটু যেন কেটে কেটে বললেন, ‘যা ফেলে এসেছি, তা ফেলে এসেছি। বাংলাদেশ এখন আমার কাছে অতীত। আমার কোনও পিছুটান নেই। ইস্টবেঙ্গল মানে তো বাংলাদেশ। ওই টিমকে কেন সাপোর্ট করতে যাব? আমরা এখন এখানকার লোক। আমাদের দল মোহনবাগান। আর ভাই, তোমার জন্ম এখানে। ইস্টবেঙ্গলকে সাপোর্ট করার কথা তুমি ভুলেও ভাববে না।’

আমার দাদা না-ফেরার দেশে চলে যান ১৯৯৪-এর অগস্টে। কলেজে আমার ভর্তি হওয়ার কিছু দিন আগে। বিদায় নেওয়ার আগে যত দিন তিনি নিজে হেঁটে-চলে বাজার করতে পেরেছেন, তত দিন পর্যন্ত বড় ম্যাচে মোহনবাগান জিতলে বা কোনও টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হলে বাড়ির সকলের জন্য মুরগি কিনে আনার ট্র্যাডিশনে দাদা ছেদ পড়তে দেননি। কিন্তু তখন জানতাম না যে, আমার দাদাই এক সময়ে ছিলেন পাঁড় ইস্টবেঙ্গল সাপোর্টার।

মানে কী? অসম্ভব! হ্যাঁ, ঘটনাটা জানার পরে আমার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল এ রকমই। দাদা যখন এক বিকেলে অল্প কয়েক মিনিটের মধ্যেই মন্ত্র দিয়ে আমাকে মোহনবাগানি করেন, তখন আমি সাড়ে পাঁচ-ছ’বছরের। আর দাদার ব্যাপারে নিষ্ঠুর সত্যিটা আমি জানলাম আমার ৫০ বছর বয়সে এসে।

গত বছর অগস্টের কথা। ডুরান্ড কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সবুজ-মেরুনকে ২-১ গোলে হারাল লাল-হলুদ। সম্ভবত সেটা ছিল ডার্বিতে বহু দিন পরে ইস্টবেঙ্গলের জয়। যথারীতি আমি মুষড়ে পড়েছি। রাতে বাবার ফোন এবং বরাবরের ইস্টবেঙ্গল সাপোর্টার বাবার গলায় যেন খুশি ঝরে পড়ছে। বাবার প্রথম কথা, ‘কী রে, তোর দল তো হেরে গেল! এখন কী করছিস?’ বললাম, ‘টিম ভালো খেলতে পারেনি, হেরেছি, কী আর করা যাবে?’ বাবার উত্তর, ‘হ্যাঁ, তা ঠিক। দেখি, বিশেকে (বাঘাযতীন বাজারের খুব বড় মাছ ব্যবসায়ী) ফোন করে জিজ্ঞেস করি, কাল ইলিশ দিয়ে যেতে পারবে কি না। দিলে তোকেও পাঠাব। দুঃখ করতে করতেও একটু খাস। মোহনবাগানকে হারিয়ে ইস্টবেঙ্গলের জেতা সেলিব্রেট করতে হয় ইলিশ কিনে খেয়ে। এটা বাবাই আমাদের শিখিয়েছিল।’ চমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘দাদা শিখিয়েছিল?’ বাবা বলে চললেন, ‘শোন না। তোর জেঠু আর আমাকে বাবা নিয়ে গিয়েছিল ময়দানে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের খেলা দেখাতে। আমরা দু’জন তখন স্কুলে পড়ি। ১৯৫০ সাল। ইস্টবেঙ্গল জিতে গেল। এসপ্ল্যানেড থেকে ট্রামে করে আমরা গড়িয়াহাট মার্কেটের কাছে এসে নামলাম। দাদা আর আমাকে ফুটপাথে দাঁড় করিয়ে রেখে বাবা গড়িয়াহাট মার্কেটে ঢুকে বড় একটা ইলিশ কিনে ল্যাজা আর মুড়ো দড়ি দিয়ে বেঁধে হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে এল। বাবা বলেছিল, আজ আমাদের উৎসবের দিন। ঘটি ফুটো হয়ে গেল। আমরা জিতলাম। ইলিশ মাছ আজ এই ভাবেই বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খেতে হয়। ঘটিদের দেখিয়ে দেখিয়ে। তোর জেঠু একটু কিন্তু কিন্তু করছিল, মাছ কেটে রান্না করতে রাত হয়ে যাবে। তবে বাবা বলেছিল, রাত হলে রাত হবে, আজ উৎসবের দিন।’

আমার মুখ থেকে কয়েক সেকেন্ড কথা সরলো না। তখনও বিশ্বাস করতে পারছি না? যে দাদার প্রভাবে আমি মোহনবাগান সাপোর্টার, সেই দাদা কি না ইস্টবেঙ্গলের জয় সেলিব্রেট করেছিলেন ও-ভাবে ইলিশ কিনে? বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, তা হলে সেই দাদাই পরে মোহনবাগা‌ন হলো কী ভাবে? বাবার জবাব, ‘সে তো তোর পাল্লায় পড়ে। তুই-ই তো বাবাকে জোর করে মোহনবাগান‌ করলি। তোর জন্যই বাবা ইস্টবেঙ্গ‌ল থেকে মোহনবাগান হয়ে গে‌ল।’ এবার আমি খুব বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘তুমি তা হলে ঘটনাটাই জানো না। দাদার জন্য আমি মোহনবাগান হয়েছি। আমার জন্য দাদা মোহনবাগান হয়নি।’ তখন বাবার প্রশ্ন, ‘কী বলছিস? তোর জন্য বাবা মোহনবাগান হয়নি? তা হলে বাবা কেন মোহনবাগান হলো?’

এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর শুধু দাদাই দিতে পারতেন। কিন্তু সেটা তো এখন সম্ভব নয়। আমি শুধু অনুমান করেছি, স্রেফ অনুমান। এবং আমার অনুমানটা তথ্য-নির্ভর বলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম। যতটুকু জেনেছি, তা হলো, আমার ঠাকুরদা দল বদল করেন গত শতাব্দীর সাতের দশকে। তীব্র অভিমান ও দুঃখ থেকে। বাংলাদেশে দাদার সামান্য যেটুকু জমিজমা-সহ সম্পত্তি ছিল, সেটা হাসিল করার জন্য বাংলাদেশে থাকা আমাদের এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় সেই সময়ে ওখানে চাউর করে দেন যে, দাদা ও দাদার পরিবারের কেউই বেঁচে নেই এবং তার জন্য সকল সম্পত্তির দাবিদার তিনি। এই খবর কোনও ভাবে দাদার কাছে এসে পৌঁছয়। সরাসরি রক্তের সম্পর্কের একজন স্রেফ সম্পত্তি পাওয়ার লোভে এ রকম রটিয়েছে, সেটা জানতে পেরে দাদা ভয়ঙ্কর মানসিক আঘাত পান। সেই ইস্তক তিনি আর বাংলাদেশে যাননি, আগে বছরে বা দু’বছরে একবার নিয়ম করে যেতেন পৈতৃক ভিটে দেখতে। বাংলাদেশ বা পূর্ববঙ্গের সঙ্গে সব ধরনের সংস্রব কাটাতে হলে ইস্টবেঙ্গল নামে ফুটবল দলকে আর সমর্থন না করে তার চির প্রতিদ্বন্দ্বী ঘটিদের সঙ্গে সমার্থক দলকে সমর্থন করা যে খুব দরকার, দাদা সম্ভবত সেটা ভেবেছিলেন। তবে শিকড়টা ইস্টবেঙ্গলে প্রোথিত বলেই বোধ হয় মোহনবাগানের জয় উদ্‌যাপনে বাজার থেকে চিংড়ি কখনও আনতে পারেননি, মুরগি কিনে এনেছেন।

প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পাওয়ার পরিণাম এক-একজনের ক্ষেত্রে এক-এক রকম হয়। কেউ শারীরিক ভাবে অসুস্থ হন, কেউ বা আক্রান্ত হন মনোরোগে। আমার ঠাকুরদার সে সব কিছু হয়নি। তিনি দলবদল করেছিলেন। রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য বা অন্য কোনও কারণে আমরা বেশ কয়েক বছর ধরে অভ্যস্ত। তবে আমার ঠাকুরদা মোহনবাগানি হয়েছিলেন ইস্টবেঙ্গলকে ভুলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু সেই স্বেচ্ছা-বিস্মৃতির জন্য শুধু নিজে মোহনবাগান হলে তো হবে না, বাড়ির অন্দরে তাঁর এক জন সহযোগীর দরকার ছিল, খুব দরকার। যার কাছ থেকে তিনি জোর পাবেন, মোহনবাগানকে সমর্থনের জোর। অথচ নিজের ছেলে-ভাইপোরা সবাই ইস্টবেঙ্গল। অতএব, নাতিকে মোহনবাগান মন্ত্রে দীক্ষিত করা।

দাদাকে যে দিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, পূর্ববঙ্গীয় হয়েও কেন আমরা মোহনবাগান সাপোর্টার, কেন ইস্টবেঙ্গলের নই, সে দিন আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি একটা চাপা দীর্ঘশ্বাসও ফেলেছিলেন, যেটা আমি বুঝতে পারিনি। দল বদলের পিছনে কখনও কখনও শুধু নিজের স্বার্থসিদ্ধি, অর্থলোভ বা আখের গোছানো থাকে না। এ রকম অভিমান আর না দেখতে পাওয়া চোখের জলও থাকে। আমার দাদার মতো।

আগামীকাল সকাল ৭টায় কলকাতায় আসছেন মোহনবাগানের নতুন হেডস্যার, প্যানাগিওটিস ডিলম্পেরিস! { Joy Mohun Bagan ]
18/07/2026

আগামীকাল সকাল ৭টায় কলকাতায় আসছেন মোহনবাগানের নতুন হেডস্যার, প্যানাগিওটিস ডিলম্পেরিস!

{ Joy Mohun Bagan ]

16/07/2026
প্রয়াত হলেন ময়দানের প্রিয় 'টুটু বসু'। ক্রীড়া প্রশাসনে তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর প্রয়াণে আমরা ...
13/05/2026

প্রয়াত হলেন ময়দানের প্রিয় 'টুটু বসু'। ক্রীড়া প্রশাসনে তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর প্রয়াণে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। ওম শান্তি

Address

Kolkata

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when মোহনবাগানি সংষ্কৃতি posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to মোহনবাগানি সংষ্কৃতি:

Shortcuts

Share