07/10/2020
#ঘূর্ণির_রাজপুত্র
সাল ২০০৫ , এজব্যাস্টনে প্রথম ইনিংসে লিড নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমেছে ইংল্যান্ড। সামনে ওপেনার অ্যান্ডু স্ট্রস , এমন সময় অজি ক্যাপ্টেন রিকি পন্টিং এর আস্থাভাজন হলেন শেন ওয়ার্ন । জীবন ঘূর্ণির পিচে শেনের ডেলিভারি অফ স্টাম্পের অনেক বাইরে থেকে টার্ন নিয়ে , ব্যাটসম্যানের ফ্রনফুট ডিফেন্সকে নাস্তানাবুদ করে আঁচড়ে পড়ল লেগ স্টাম্পে । উল্লাসে ফেটে পড়লো অজি প্লেয়ারেরা । সাময়িকভাবে মাথায় হাত পড়ে গেলেও উঠে দাঁড়িয়ে হাততালির মাধ্যমে অভিবাদন জানালো ইংল্যান্ড দর্শক ও । সাহস , প্রতিভা , জেদ জীবনের এই তিনটি অংশকে হয়তো বারবার তিনটে স্টাম্পেই দেখতে পেতেন শেন ওয়ার্ন , আর বারংবার আঘাত হানতেন তাদের উপর যাতে জীবনযুদ্ধের প্রতি ময়দানে আরও প্রখর থেকে প্রখরতর হয়ে ওঠা যায় । রূপকথা কখনও সত্যি হয় কিনা জানিনা , তবে হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার সুর যেমন লালিত্য ঝংকারে বেঁধে দিত তার বাঁশি তেমনি , ওয়ার্নের হাতের ঘূর্ণির সুর তাল একাধিকবার বাইশ গজে বেঁধে দিয়েছে ক্রিকেট বলটা ।
সাল ৮৩-৮৪ হবে , মেলবোর্ন ক্রিকেট ক্লাবের ইউনিভার্সিটি গ্রাউন্ডের বাইরে ম্যাচ জেতার আনন্দে বাকি ক্রিকেটারদের নিয়ে পার্টিতে মজে আছে জুনিয়র টিমের বছর ষোলোর ব্রাউন চুলের এক যুবক । সেই নাকি দলের অধিনায়ক , স্থানীয় ছেলে তবে আশ্চর্য এটা নয় ছেলেটি স্পিন বোলিং করে এবং বোলিং এরকমের ভ্যারিয়েশনটাই বিস্ময়কর । লেগ স্পিন , অফ স্পিন দুটোতেই সমান পারদর্শী । অস্ট্রেলিয়ার পেস বোলিং এর পিচে স্পিনের এরকম প্রতিভা থাকাটাই দুঃস্কর । তখন হয়তো বিশ্বক্রিক্রেট জানতো না , ক্যাঙারুদের দেশে সবার অলক্ষ্যেই বেড়ে উঠছে ঘূর্ণির জাদুকর । সেদিনের সেই পার্টিতে উদ্দাম নাচতে থাকা ছেলেটাই আজকের কিংবদন্তি স্পিনার শেন কিথ ওয়ার্ন ।
এরপর একটার পর একটা প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেট ম্যাচ খেলতে থাকেন তিনি , পারফরম্যান্স অবিশ্বাস্য না হলেও পাতে রাখার মতন । তাছাড়া এর আগেও অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ডে তাঁর নাম নিয়ে আলোচনা হয়েছে । ১৯৯২ তে ইন্ডিয়া ট্যুর ঘোষিত হলে , দলে ব্যাটিং এবং বোলিং এর ভারসাম্য রক্ষার জন্য নাম ঘোষনা করা হয় তরুণ স্পিনার শেন ওয়ার্নের । অভিজ্ঞতার ঝুলি এমন কিছুই ছিল না তার সাথে , সঙ্গে ছিল একমুঠো প্রতিভা আর এক পৃথিবী স্বপ্ন আর তাকেই পুঁজি করে অভিষেক হয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে । পারফরম্যান্স মনে রাখার মতন নয় , তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রথম শিকার ছিল রবি শাস্ত্রী । বোলিং ফিগার ১৫০/১ । এরপরও সুযোগ এল অ্যাডিলেডের চতুর্থ টেস্টের জন্য কিন্তু আবারও সেই হতাশাজনক পারফরম্যান্স , পেলেন না একটিও উইকেট । সিরিজের পঞ্চম টেস্টের আগে তাঁর বোলিং ফিগার ছিল ২২৮/১ । আশাতীত খারাপ পারফরম্যান্সের জন্য বাদ পড়লেন পার্থ টেস্ট থেকে । ওয়ার্ন বুঝতে পেরেছিলেন , হঠাৎ করে চলে আসা সুযোগ তিনি কাজে লাগাতে ব্যর্থ , এরপরের পথে তাঁর জন্য আরোও কাঁটা ছড়িয়ে রাখা হবে । হতাশা তাকে চারপাশে ঘিরে ফেললেও গ্রাস করতে পারেনি কোনোদিন , তিনি এতটাই খোশমেজাজে থাকার চেষ্টা করতেন সবসময় । আবার ফিরে গেলেন প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে , এবার পরিশ্রম করলেন কঠোরভাবে , পারফরম্যান্স করলেন ভালো এবং আবার এলো সেই মোক্ষম সুযোগ '৯২ এর শেষের দিকে শ্রীলঙ্কা ট্যুরের জন্য উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হলো ওয়ার্নকে । আবারও এলো খেলার সুযোগ কলোম্বো টেস্টে । কিন্তু আবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি শুরু হয়েছিল , উইকেটের দেখা নেই , তাঁর বোলিং ফিগার হয়ে দাঁড়িয়েছিল ১০৭/০ । কিন্তু নাটকীয় মুহূর্ত ঘটে ম্যাচের শেষ পর্যায়ে দ্বিতীয় ইনিংসে কোনো রান না দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ঝুলিতে তিনটি উইকেট এনে দেন ওয়ার্ন , সেই সঙ্গে অবদান রাখেন টিমের ১৬ রানের জয়তেও । ম্যাচের শেষে শ্রীলঙ্কার তৎকালীন অধিনায়ক অর্জুন রণতুঙ্গা বলেই বসলেন , 'A bowler with Test average of more than 300 came and snatched the victory from our hands'. সফলতার ক্ষীণ আলো জন্মালেও তা ছিল ক্ষণস্থায়ী , এই কথাটা বুঝতে দেরী হয়নি ওয়ার্নের । শ্রীলঙ্কায় পরের দুটি টেস্টে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের জন্য আবারও দল থেকে বাদ পড়লেন তিনি । ৯২-৯৩ এর ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম টেস্ট থেকেও বাদ দেওয়া হয় ওয়ার্নকে । কিন্তু হঠাৎ ই মেলবোর্নে দ্বিতীয় টেস্টে ফের খেলার সুযোগ আসে তাঁর কাছে , চড়াই উতরাইয়ের টালমাটাল ক্যারিয়ারে এবার সুযোগকে সফলতায় পরিণত করলেন ওয়ার্ন , নিলেন সাতটি উইকেট এবং সেইসঙ্গে একটি মসৃণ জয় এনে দিলেন দলকে । সঙ্গে সঙ্গে শুধুমাত্র মেলবোর্ন কিংবা অস্ট্রেলিয়া নয় গোটা ক্রিকেট বিশ্বও বুঝে গেল , ‘ A star is born today ’ .
এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি ওয়ার্নকে , আসতে থাকে একের পর এক সুযোগ এবং তার সদ্বব্যবহার ও করেণ তিনি । সাল ১৯৯৪ , গাব্বায় ইংল্যান্ডের সামনে চাপের মুখে পড়ে যায় অজিরা । একক দক্ষতায় আট উইকেট দখল করে জয় ছিনিয়ে আনেন ওয়ার্ন । সাল ১৯৯৬ , ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে পাঁচ উইকেট দখল করে জয়ের রাস্তা সুদৃঢ় করে দেন ওয়ার্ন । এরপর ১৯৯৯ এ অ্যাসেজ সিরিজের পর অবসর ঘোষণা করেন তৎকালীন অজি অধিনায়ক মার্ক টেলর এবং তাঁর বদলি হিসেবে নতুন অধিনায়ক নির্বাচিত হয় স্টিভ ওয়াক এবং দলের সহ অধিনায়ক নির্বাচিত হন শেন ওয়ার্ন । আসে ১৯৯৯ এর ক্রিকেট বিশ্বকাপ , সেমি ফাইনালে অজিদের মুখোমুখি হল সাউথ আফ্রিকা , ওয়ার্ন নিজের বিস্ময়কর ঘূর্ণিতে ফেরালেন হারসেল গিভস , গ্যারি কাস্টেন , হ্যানসে ক্রনজে এবং জ্যাক ক্যালিসকে এবং সেমিফাইনালের ম্যান অফ দি ম্যাচও তিনিই নির্বাচিত হন । ফাইনালে মুখোমুখি হন পাকিস্তানের । পাকিস্তান প্রথমে ব্যাট করে ১৩২ রানে অলআউট হয়ে যান , বোলিং এর সিংহভাগ কৃতিত্ব , শেন ওয়ার্নের নিলেন ৩৩/৪ । সেইসঙ্গে মসৃণ জয় উপহার দিলেন অস্ট্রেলিয়াকে সাথে নিজেও প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেলেন ।
সাল ২০০২ , সাউথ আফ্রিকার বিরুদ্ধে তিনম্যাচের সিরিজে ওয়ার্ন আবারও প্রমাণ করলেন নিজের দক্ষতা । অজিদের জয়ের মূলকান্ডারী হয়ে থাকলেন তিনি । ওই সালেই পালাবদল হল অজি ক্রিকেটে , স্টিভ ওয়াকের বদলি হিসেবে এক দিবসীয় ক্রিকেটের অধিনায়ক নির্বাচিত হন রিকি পন্টিং কিন্তু এর সাথে সাথে খারাপ খবর ও আসে অজি ক্রিকেটে , শেন ওয়ার্নের গুরতর চোট , আসন্ন অ্যাসেজ তো বটেই এমনকি আগামী বিশ্বকাপেও অনিশ্চিত হয়ে পড়েন ওয়ার্ন । ২০০৩ বিশ্বকাপের একদিন আগে নিষিদ্ধ ড্রাগ ব্যবহারের জন্যে ওয়ার্নের উপর অভিযোগ ওঠে । এরপর ওয়ার্নের বয়ান শোনার পর অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ড তাঁকে এক বছর সমস্ত রকম ক্রিকেট থেকে ব্যান করেণ । শাস্তি কাটিয়ে ২০০৪ এর ফেব্রুয়ারীতে ফের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরেন শেন ওয়ার্ন এবং শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে দখল করেণ নিজের ৫০০তম উইকেট এবং পাঁচশো উইকেট দখলকারীদের তালিকায় কোর্টনি ওয়ালেশের পর নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করান ।
জীবন বড় অদ্ভুত , যেখান থেকে আমাদের মধ্যবিত্তি সকাল শুরু হয় দিনের শেষে আবার সেখানেই ফিরিয়ে দেয় । শেন ওয়ার্নের জীবনটাও অনেকটা সেইরকম , বছর পনেরো আগে যেই সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে রবি শাস্ত্রীকে ফিরিয়ে জীবনে প্রথম আন্তর্জাতিক উইকেট দখল করেছিলেন ২০০৬ এ সেই গ্রাউন্ডেই ইংলিশ স্পিনার মন্টি পানেসরকে শূন্য রানে ফিরিয়ে দখল করেন ক্যারিয়ারের ১০০০ তম উইকেট । ১৪৫ টেস্টে তাঁর শিকার ৭০৮টি উইকেট এবং ১৯৪ টি এক দিবসীয় ক্রিকেটে তাঁর শিকার ২৯৩টি উইকেট ।
ক্রিকেট জীবনের এত সাফল্য অভাবনীয় হলেও তাঁর ক্যারিয়ার কখনোই কলঙ্কমুক্ত ছিল না । নিষিদ্ধ ড্রাগ নেওয়া , একজন সেবিকার সাথে সেক্স চ্যাট করে অস্ট্রেলিয়ার সহ অধিনায়কের পদ থেকে বরখাস্ত হওয়া , একাধিকবার বিভিন্ন মডেল , অভিনেত্রীদের সাথে সম্পর্কে জড়ানো ওয়ার্নের উজ্জ্বল ক্যারিয়ারে কালো দাগের মতো । আসলে জীবন এইরকমই যতই রূপকথার নায়কেরা বইয়ের পাতায় ঈশ্বর হন না কেন বাস্তবের মাটিতে নামলে বেশিরভাগই ধূসর । এত বিতর্ককে নিমেষে উড়িয়ে দেয় যখন মেলবোর্নের পড়ন্ত বিকেলে পুরোনো লাল কোকাবুরার বল হাত একজন স্পিনার দাঁড়িয়ে থাকে তাঁর সবটুকু উজাড় করে দেওয়ার জন্য , জেনো রেখো ওটাই শেন ওয়ার্ন । আর বলগুলো কখনও কখনও লেগ থেকে অফে এবং অফ থেকে লেগে বাঁক নিয়েছে পরিস্থিতির মতন কিন্তু ওই বাইশ গজটাই জীবন , যেখানে তিনি সবসময়ই নায়ক । আসলে শেন ওয়ার্ন মানেই পুরোনো হয়ে যাওয়া লাল বলটা , ওটাই লড়াইয়ের অস্ত্র আর ওটাই ভালোবাসা তাছাড়া কথাতেই তো আছে -
‘ Everything is fair in love and war '
কলমে : কুশল ( Admin )