12/09/2026
আমরা কি সত্যিই ফুটবলার তৈরি করছি, নাকি শুধু ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত থাকার অভিনয় করছি?
বিগত দু’দিনে কলকাতা ও আশপাশের প্রায় ৩৫০ জন অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলারকে ট্রায়ালে দেখার সুযোগ হয়েছে। এতগুলো তরুণ ফুটবলারকে কাছ থেকে দেখার পর একটি বিষয় খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি—আমাদের নতুন প্রজন্মের অনেক ফুটবলারের মধ্যে ভালো ফুটবল শেখার, নিজের দুর্বলতাগুলো নিয়ে কাজ করার এবং প্রতিদিন নিজেকে উন্নত করার তাগিদটা যেন কোথাও একটু কমে যাচ্ছে।
একজন বাবা-মা অনেক স্বপ্ন ও আশা নিয়ে তাঁদের সন্তানকে ফুটবল কোচিং ক্যাম্প বা একাডেমিতে নিয়ে আসেন। তাঁদের স্বপ্ন—সন্তান ভালোভাবে ফুটবল শিখবে, একদিন ভালো ক্লাবে খেলবে। একইভাবে, একজন তরুণ ফুটবলারেরও স্বপ্ন থাকে—নিজেকে তৈরি করবে, বড় মঞ্চে খেলবে, একদিন দেশের বা দেশের সেরা ক্লাবগুলোর হয়ে মাঠে নামবে।
কিন্তু বাস্তব ছবিটা অনেক সময় অন্যরকম।
কোনো ক্লাবের ট্রায়ালে সুযোগ না পেলে কিংবা বাদ পড়লে, অনেক ফুটবলারের প্রথম অভিযোগ হয়ে দাঁড়ায়—“স্বজনপোষণ হয়েছে”, “খেলার সুযোগ পাইনি”, “ঠিকভাবে দেখা হয়নি”।
কিন্তু আমাদের নিজেদের কাছেও কিছু প্রশ্ন করা দরকার।
আমি কি সত্যিই নিজেকে সেই পর্যায়ের জন্য তৈরি করেছি?
আমি কি প্রতিদিন নিজের দুর্বলতাগুলো নিয়ে কাজ করছি?
আমি কি শুধু সুযোগের অপেক্ষায় আছি, নাকি সুযোগ পাওয়ার যোগ্য হয়ে উঠছি?
ফুটবলে শুধু প্রতিভা থাকলেই হয় না। প্রতিভাকে প্রতিদিনের পরিশ্রম, শৃঙ্খলা, সঠিক প্রশিক্ষণ এবং মানসিকতার মাধ্যমে খেলোয়াড়ে পরিণত করতে হয়।
একটি কোচিং ক্যাম্প বা একাডেমি থেকে একজন-দু’জন সেরা প্রতিভা হহয়তো ইস্টবেঙ্গল বা মোহনবাগানের মতো বড় ক্লাবে সুযোগ পাবে। সেটা স্বাভাবিক এবং অবশ্যই গর্বের বিষয়।
কিন্তু প্রশ্নটা সেখানে শেষ হয় না।
বাকি যে ছেলেগুলো আছে, তাদের ভবিষ্যৎ কী?
তারা কি ভালো ফুটবলার হওয়ার যোগ্য নয়?
তাদের কি আরও ভালোভাবে তৈরি করার দায়িত্ব নেই?
একজন খেলোয়াড় যদি ট্রায়ালে ব্যর্থ হয়, তার ফুটবলযাত্রা কি সেখানেই শেষ?
আমার মনে হয়, একটি ফুটবল কোচিং ক্যাম্পের সাফল্য শুধু কতজন খেলোয়াড় বড় ক্লাবে সুযোগ পেল তার সংখ্যায় বিচার করা উচিত নয়। বরং কতজন খেলোয়াড়কে তারা উন্নত করে তুলতে পারল, কতজনকে পরবর্তী স্তরে পৌঁছানোর মতো তৈরি করল—সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একজন কোচের কাজ শুধু সেরা খেলোয়াড়টাকে চিহ্নিত করা নয়; বরং যে খেলোয়াড় আজ পিছিয়ে আছে, তাকে তৈরি করা।
কারণ প্রত্যেক প্রতিভা প্রথম দিন থেকেই সম্পূর্ণ তৈরি থাকে না।
কেউ দ্রুত শেখে, কেউ সময় নেয়।
কেউ শারীরিকভাবে এগিয়ে থাকে, কেউ টেকনিক্যালি।
কেউ আজ ভালো খেলছে, আবার কেউ হয়তো এক-দু’বছর পর নিজেকে মেলে ধরবে।
তাই আমাদের দরকার শুধু “ট্যালেন্ট হান্ট” নয়—দরকার “ট্যালেন্ট ডেভেলপমেন্ট”।
আজ বাংলায় ফুটবলকে ঘিরে অনেক কিছুই হচ্ছে—অনেক কোচিং ক্যাম্প, অনেক একাডেমি, অনেক ট্রায়াল, অনেক টুর্নামেন্ট,অনেক দান ধ্যান হচ্ছে , ঘোষণা হচ্ছে, কিন্তু আমাদের একটু থেমে নিজেদের প্রশ্ন করা দরকার-
আমরা কি সত্যিই ফুটবলার তৈরি করছি?
নাকি শুধু কোচিং ক্যাম্প খুলছি, কিছু খেলোয়াড়কে নিজেদের মতো করে চালাচ্ছি, তাদের ধরে রাখার চেষ্টা করছি এবং শেষ পর্যন্ত তাদের স্বাভাবিক বিকাশের পথটাই আটকে দিচ্ছি?
একজন খেলোয়াড়ের দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির কথা না ভেবে তাকে শুধু নিজের ক্যাম্পের সঙ্গে আটকে রাখার প্রবণতা কোনওভাবেই ফুটবলের উন্নয়ন নয়।
আজ ভারতীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের ফুটবলারদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। এর পিছনে অবশ্যই তাদের প্রতিভা, পরিশ্রম ও ফুটবল সংস্কৃতির বড় ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও ভাবার সময় এসেছে—বাংলার মতো ঐতিহ্যবাহী ফুটবল রাজ্য কেন সেই হারে প্রতিভা তৈরি করে সর্বোচ্চ স্তরে পাঠাতে পারছে না?
সমস্যাটা শুধু খেলোয়াড়দের নয়।
সমস্যাটা শুধু কোচদেরও নয়।
সমস্যাটা আমাদের পুরো ফুটবল কোচিং ব্যবস্থার ও ফুটবল ইকো সিস্টেমের।
খেলোয়াড়কে যেমন নিজের উন্নতির জন্য দায়িত্ব নিতে হবে, তেমনই একাডেমি ও কোচিং ব্যবস্থাকেও ভাবতে হবে—একজন খেলোয়াড়কে শুধু ট্রায়ালের জন্য প্রস্তুত করব, নাকি তার দীর্ঘমেয়াদি ফুটবলজীবন তৈরির দায়িত্বও নেব? অধিকাংশ ছোট কোচিং ক্যাম্প গুলোর প্লেয়ারদের ধরে রাখার প্রবনতা ও তাদের মতো করে চালনা করার প্রবণতা প্লেয়ারদের মানসিকতা ও ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিচ্ছে।
কারণ একটা কথা মনে রাখা দরকার—
একজন খেলোয়াড়কে বাদ দেওয়া খুব সহজ।
কিন্তু একজন বাদ পড়া খেলোয়াড়কে আবার তৈরি করে ফিরিয়ে আনা—সেটাই আসল কোচিং।
বাংলার ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে সত্যিই যদি আমরা চিন্তিত হই, তাহলে শুধু বড় ক্লাবে কে সুযোগ পেল সেটা নিয়ে আলোচনা না করে, যারা সুযোগ পেল না তাদের নিয়ে কী করা হচ্ছে—সেই প্রশ্নটাও করতে হবে।
নইলে আমরা ফুটবল নিয়ে অনেক কথা বলব, অনেক আয়োজন করব, অনেক প্রতিভা খুঁজব—
কিন্তু ফুটবলার তৈরি করার আসল কাজটাই হয়তো পিছিয়ে থাকবে ও আছে।
এখনই সময় একটু থামার, ভাবার এবং কাজ শুরু করার।
কারণ বাংলার ফুটবলকে বাঁচাতে শুধু আবেগ নয়—দরকার সঠিক পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন এবং দায়িত্ববোধ। কারন ফুটবল খেলা টা কোনো ম্যাজিক নয় ।