04/09/2026
স্যার আশুতোষ মুখার্জির স্ট্যাচু ও ইস্টবেঙ্গল ক্লাব - হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ
'বাংলার বাঘ' স্যার আশুতোষ মুখার্জি শুধুমাত্র শিক্ষাবিদ হিসেবেই নয়, প্রচণ্ড ব্যক্তিত্ব এবং স্বাধীনচেতা মনোভাবের জন্য সেই সময় ইংরেজ শাসকদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন I তিনি সমগ্র বাংলার মানুষকে সংগ্রাম করার প্রেরণা যোগাতেন I দেশবন্ধুর হাতে ধরে প্রতিষ্ঠিত ইস্টবেঙ্গল ক্লাবকেও তিনি লড়াই করার সাহস জুগিয়েছিলেন I ১৯২৪ সালের ২৫ মে স্যার আশুতোষ মুখার্জির প্রয়াণের পরে ১৪ জুলাই কলকাতার আলিপুরে সন্তোষের মহারাজা স্যার মন্মথ নাথ চৌধুরীর বাড়িতে (সন্তোষ হাউস) ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের পক্ষ থেকে একটি স্মরণ সভার আয়োজন করা হয় I সেখানে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রয়াত স্যার আশুতোষ মুখার্জির একটি পূর্ণায়ব স্ট্যাচু তৈরী করা হবে এবং সেটি বসানো হবে কলকাতা শহরের প্রাণকেন্দ্রে I স্যার আশুতোষ মুখার্জি শুধুমাত্র শিক্ষাবিদ হিসেবেই নয়, প্রচণ্ড ব্যক্তিত্ব এবং স্বাধীনচেতা মনোভাবের জন্য সেই সময় ইংরেজ শাসকদের দুশ্চিন্তার কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন I তাই তাঁকে এভাবে সম্মান জানানোর প্রস্তাবে সেখানে উপস্থিত ক্লাবের সবাই এক বাক্যে সম্মতি প্রকাশ করেন I অবশ্য এর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন সন্তোষের মহারাজা স্যার মন্মথ নাথ চৌধুরী I যিনি সেই সময় ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন I
উক্ত সভায় স্যার মন্মথ নাথ চৌধুরী প্রস্তাব দেন, এই মূর্তি স্থাপনের অর্থ সংগ্রহের জন্য কলকাতায় আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ এর আয়োজন করবার I তাঁর উদ্যোগেই দুটি আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয় ডালহৌসি মাঠে I নাম দেওয়া হয় "স্যার আশুতোষ মেমোরিয়াল ফুটবল ফান্ড" I এই আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্য পুলিশের অনুমতি লাগে, সেই অনুমতি ও স্যার মন্মথ নাথ চৌধুরী আদায় করে নেন তৎকালীন কমিশনার অফ পুলিশ স্যার চার্লস টেগার্ট এর কাছ থেকে I
"স্যার আশুতোষ মেমোরিয়াল ফুটবল ফান্ড" এর ইন্ডিয়ান এবং ইউরোপিয়ানদের মধ্যে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ ডালহৌসি মাঠে হয় ১৬ আগস্ট ১৯২৪ এ, যেখান থেকে ৪,৮৪৫ টাকা সংগৃহিত হয় I ইন্ডিয়ান এবং ইউরোপিয়ানদের মধ্যে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ওই একই মাঠে ৬ আগস্ট ১৯২৫ এ, যেখান থেকে ৬,১৬৪ টাকা সংগৃহিত হয় I এই ম্যাচ দুটির মূল দায়িত্বে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের পাশাপাশি ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ও I
ফান্ড জমা হওয়ার পর এবার মূর্তি তৈরির উপযুক্ত শিল্পীর খোঁজ নেওয়া শুরু হয় I যোগাযোগ করা হয় মাদ্রাজ গভর্নমেন্ট স্কুল অফ আর্টস এর ভাইস প্রিন্সিপাল প্রখ্যাত স্কাল্পচার দেবীপ্রসাদ রায় চৌধুরীর সাথে I তিনি তৎক্ষণাৎ রাজি হলেও সময়ের অভাবে কাজ শুরু করতে বেশ খানিকটা দেরি হয়ে যায় I অবশেষে ২ মার্চ ১৯২৯, দেবীপ্রসাদ রায় চৌধুরীর সাথে স্যার আশুতোষ মেমোরিয়াল স্ট্যাচু উন্মোচন কমিটির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় স্যার আশুতোষ মুখার্জির পূর্ণাবয়ব মূর্তি তৈরির কাজে I তিনি প্রাথমিক ভাবে স্যার আশুতোষ মুখার্জির ভাইস চ্যান্সেলরের পোশাকে সজ্জিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এমন একটি প্লাস্টার অফ প্যারিসের মডেল তৈরী করেন I মূর্তিটির উচ্চতা হয় ৯ ফুট ২ ইঞ্চি I তৎকালীন সময়ে দেবীপ্রসাদ রায় চৌধুরীর মূর্তি তৈরির পারিশ্রমিক অত্যন্ত বেশি ছিল, কারণ তিনি ছিলেন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্কাল্পচার I কিন্তু স্যার আশুতোষ মুখার্জির স্ট্যাচুর জন্য তিনি তার পারিশ্রমিক অনেক কম ধার্য করেন, যা ছিল ৪,৫০০ টাকা I
এরপর এই প্লাস্টার অফ প্যারিসের মডেল থেকে ব্রোঞ্জের মডেল তৈরী করতে কলকাতার সালসিসিওনি লিমিটেড এর সাথে যোগাযোগ করে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব I তারা এই মডেলের কাস্টটা নিয়ে যায় ইতালিতে, সেখানে তার উপরে খাঁটি ব্রোঞ্জের অবয়ব তৈরী করে কলকাতায় নিয়ে আসে I চুনার পাথরের বেসমেন্টের উপর এই অপুরূপ সুন্দর ব্রোঞ্জের স্ট্যাচু টা তারা প্রতিস্থাপন করে I এই পুরো কাজে সালসিসিওনি লিমিটেডকে দিতে হয়েছিল ১০,০০০ টাকা I
এই সমস্ত কিছুর মধ্যেই মহারাজা মন্মথ নাথ রায় চৌধুরী চিত্তরঞ্জন এভিনিউ এর চৌরঙ্গীর কর্নারে দুটি ঘাসের প্লট কিনে নেন I সেই প্লটেই বেসমেন্ট সহ এই ব্রোঞ্জের স্ট্যাচু টা প্রতিস্থাপন করা হয় I ১৯৩৪ সালের ১৬ ই মার্চ স্যার আশুতোষ মুখার্জির নয়াভিরাম স্ট্যাটুটির উদ্বোধন করেন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সভাপতি মহারাজা মন্মথ নাথ রায় চৌধুরী I সাথে ছিলেন "স্যার আশুতোষ মেমোরিয়াল স্ট্যাচু উন্মোচন কমিটির" সভাপতি এস.সি.তালুকদার, যিনি তখন ছিলেন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সহ সভাপতি I এছাড়াও উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল কলকাতার পুলিশ কমিশনার, ময়দানের বিভিন্ন ক্লাবের অধিকারিকগণ, সমাজের বিশিষ্ট মানুষজন সহ আরো অনেকে I
স্ট্যাটু উন্মোচনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে "স্যার আশুতোষ মেমোরিয়াল স্ট্যাচু উন্মোচন কমিটির" সভাপতি এস.সি.তালুকদার যে বক্তব্যটি রেখেছিলেন, তার কিছু কথা নিম্নে তুলে ধরা হলো –
“The sporting world has, however, come forward to enshrine his memory to-day-because in him it finds the supreme exponent of the great attributes which sportsmen prize and hold so dear – devotion, discipline and courage – modesty in victory and resoluteness in defeat – high qualities of fairness and humanity. In him, whom success did not elate nor defeat daunt – who met his followers in the true spirit of comradeship and his opponents with honorable opposition – who thrilled and steeled his team by his stirring creed of courage – in him the sporting fraternity recognize the weal captain of sports”
সাথে সংযুক্ত করা হলো -
১) ১৯৩৪ সালে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের বার্ষিক সাধারণ সভার রিপোর্টের পাতা - যেখানে ক্লাবের তৈরী স্যার আশুতোষ মুখার্জির স্ট্যাচুর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দেওয়া রয়েছে I
২) স্যার আশুতোষ মুখার্জির স্ট্যাচু তৈরির ফান্ডের জন্য যে প্রদর্শনী ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছিল, সেই সংক্রান্ত তথ্য ১৯২৪ সালের অমৃতবাজার পত্রিকার ৬ টি ছবি I
৩) 1935 সালের ৬ জুন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের বার্ষিক সাধারণ সভার রিপোর্ট অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল - যেখানেও ক্লাবের তৈরী স্যার আশুতোষ মুখার্জির স্ট্যাচুর উল্লেখ রয়েছে I
৪) সম্পূর্ণ ঘটনাবলী নিয়ে একটি সচিত্র প্রতিবেদন I
03/09/2026
03/09/2026
03/09/2026
03/09/2026
02/09/2026
02/09/2026
02/09/2026
02/09/2026
02/09/2026