08/09/2026
প্রয়াণ দিবসে স্মরণ করি কিংবদন্তি প্রশাসক বনোয়ারীলাল রায়কে I
পয়লা আগস্ট ১৯২০ সালে সুরেশ চৌধুরী তার জোড়াবাগানের বাড়িতে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রতিষ্ঠা করলেন বটে, কিন্তু ক্লাবকে খুব তাড়াতাড়ি বড় করে তুলবার জন্য দরকার হয়ে পড়েছিল সমাজে প্রতিষ্ঠিত কিছু গুণী মানুষের। শৈলেশ বসুর মাধ্যমে তার সাথে যোগাযোগ হলো কুমোরটুলির বিখ্যাত সলিসিটর রায় বাহাদুর তড়িৎ ভূষণ রায়ের । তার বাড়িতেই সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম যে মিটিং বসলো, সেখানে উপস্থিত ছিলেন বৃহত্তর রায় পরিবারের অনেক সদস্য । রায় পরিবারের আদি বাসস্থান ছিল বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকার কাছে ভাগ্যকুলে। সেখানকার বিখ্যাত কুন্ডু পরিবারই হলো এই রায় পরিবার। কুমারটুলি মাঠের উত্তর পশ্চিম প্রান্ত জুড়ে এদের পরিবারের এক এক জনের বিরাট বিরাট বাড়ি ছিল। কলকাতায় মূলত তারা বিভিন্ন রকমের ব্যবসা করতেন এবং সেই ব্যবসার সূত্রেই নিজেদের বাড়ি তৈরী করে নিয়েছিলেন। এদেরই একজন ছিলেন বনোয়ারীলাল রায়। যার সুবৃহৎ বাড়িটি কুমারটুলি মাঠের দক্ষিণ পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। ঠিকানা ৭ নম্বর কৃপানাথ লেন।
বনোয়ারীলাল রায়ের জন্ম ১৮৮৯ সালে ঢাকার ভাগ্যকুলে। পড়াশুনা সেখান থেকেই করেছিলেন। পারিবারিক ব্যবসার কারণে তার কলকাতায় আসা গত শতকের প্রথম দিকেই। সেই ব্যবসাকে ধীরে ধীরে তিনি আরো সম্প্রসারিত করে তোলেন। তার ছিল বহুমুখী ব্যবসা। কাপড়, পাট এসবের ব্যবসা তো ছিলই, সাথে ছিল বাড়ির ব্যবসাও । একসময় কলকাতা শহরে তার ২৩০ এর উপরে বাড়ি ছিল। তবে তিনি নিজে ছিলেন সাধক প্রকৃতির। নিজের এতো বড় ব্যবসা ঠিক মতো সামলে উঠতে পারতেন না। আর ছিলেন দানশীল। যখন যার যা কিছু প্রয়োজন হতো বনোয়ারীলাল রায় তার জন্য সব কিছু উজাড় করে দিতেন।
১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তড়িৎ ভূষণ রায়ের বাড়িতে হওয়া সভায় বনোয়ারীলাল রায়কে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রথম ফুটবল সচিব রূপে নির্বাচিত করা হয়। তখন ক্লাবের নিজস্ব কোনো মাঠ ছিল না। ক্লাবের নব নির্বাচিত খেলোয়াড়রা প্রাকটিস করতো কুমোরটুলির মাঠে। ১৯২১ সালে মোহনবাগানের সাথে যৌথ ভাবে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব মাঠ ভাগ করে নিলেও তখুনি টেন্ট তৈরী করে উঠতে পারে নি। কারণ তখন মাঠটি ছিল লম্বালম্বি, ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রাকটিসের জন্য জায়গা ছিল রেড রোডের দিকের অংশটা। যুদ্ধের কারণে রেড রোড দিয়ে প্লেন ওঠানামা করবে বলে প্রশাসন থেকে নির্দেশ আসে মাঠটিকে আড়াআড়ি করে নেওয়ার জন্য। এই সব করতে করে আরো তিন চার বছর সময় লেগে যায়। অবশেষে এখন যেখানে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব সেখানে তারা চলে আসে আর মোহনবাগান চলে যায় এখন যেখানে এরিয়ান ক্লাব সেখানেই। এর পরেই বনোয়ারিরাল রায় উদ্যোগী হয়ে ওঠেন ক্লাবের নতুন টেন্ট আর কাঠের গ্যালারি তৈরী করতে। সালটা ১৯২৭ সালের শেষের দিক। ইস্টবেঙ্গল ক্লাব তৈরী করে তাদের নতুন টেন্ট আর গ্যালারি। মূল টাকাটা অবশ্যই বনোয়ারীলাল রায়ের, তবে তার সাথে যোগ্য সহযোগিতা করেছিলেন সন্তোসের মহারাজা মন্মথ নাথ রায় চৌধুরী। শোনা যায় তৎকালীন সময়ে এই টেন্ট ও গ্যালারি তৈরী করতে বনোয়ারীলাল রায় লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করেছিলেন।
১৯২৫ সালে বনোয়ারীলাল রায় ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সচিব হলেন রায় বাহাদুর গুণেন্দ্র কৃষ্ণ রায়ের সাথে যুগ্ম ভাবে। ১৯২৭ সাল থেকে তিনি একক ভাবে ক্লাবের সচিবের দায়িত্ব সামলেছিলেন দীর্ঘ ১৫ বছর, অর্থাৎ ১৯৪১ সাল পর্যন্ত।
ফুটবল খেলায় টিমের খেলোয়াড়দের উদ্বুদ্ধ করবার জন্য তিনি নানা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। সেই সময় ক্লাবের হয়ে খেলবার জন্য খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক দেওয়ার প্রচলন ছিল না। বনোয়ারীলাল রায় সমস্ত খেলোয়াড়দের নিজের বাড়িতে থাকবার ব্যবস্থা করেছিলেন। ৭ নম্বর কৃপানাথ লেনের নিজের সুবৃহৎ বাড়ির একতলাটা খেলোয়াড়দের থাকবার জন্য নির্দিষ্ট করা ছিল। সেখানে একসাথে সমস্ত ধর্মালম্বী খেলোয়াড়রা থাকতেন আর খাওয়াদাওয়াও করতেন। সমস্ত দিকে তার তীক্ষ্ণ নজর ছিল। শুধু তাই নয়, যাদের পরিবার ছিল কিন্তু কলকাতায় যাদের থাকবার কোনো জায়গা ছিল না, তাদেরকে নিজে গাড়ি করে নিয়ে গিয়ে কলকাতা শহরের মধ্যে ভালো একটি বাড়ি দেখে সেটাও তাকে কিনে দিতে চাইতেন। তবে যতটুকু জানা গেছে কোনো খেলোয়াড়ই সেটি গ্রহণ করেন নি। কারণ তাদের কাছে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে খেলাটাই একটা আদর্শ ছিল, তার বিনিময়ে কোনো কিছু গ্রহণ করাটা তাদের নীতিতে বাধতো। দুটি ঘটনার উল্লেখ করা যাক। ১৯২৪ সালে বনোয়ারীলাল রায় একবার গোষ্ঠ পালকে নিজের বাড়িতে ডেকে অনুরোধ করেন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে যোগ দেবার জন্য। তার বিনিময়ে তৎকালীন সময়ে এক লক্ষ টাকা, একটি দামি গাড়ি আর কলকাতা শহরে দুটি সুন্দর বাড়ি দেবার কথাও বলেন। কিন্তু গোষ্ঠ পাল সেই প্রস্তাবে রাজি হন নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য বনোয়ারীলাল রায় ছিলেন গোষ্ঠ পালের আত্মীয় সম্পর্কে মামা। আর একবার ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের কিংবদন্তি খেলোয়াড় তথা তিন বছরের অধিনায়ক মোনা মৌলিক পরিবার নিয়ে কষ্টে আছেন শুনে বনোয়ারীলাল তাকে কলকাতার সবচেয়ে সুন্দর বাড়িটি দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু এক্ষেত্রে মোনা মৌলিক সেটি নিতে রাজি হন নি।
ইস্টবেঙ্গল ক্লাব কোনো খেলাতে জিতলেই বনোয়ারীলাল রায় তার বাড়িতে বিরাট ভোজের আয়োজন করতেন। কম করেও হাজার মানুষের সমাগম হতো সেদিন। খেলোয়াড়দের সাথে প্রশাসকদের এরকম অভিভাবক সুলভ বন্ধন ক্লাবের ভিত আরো মজবুত করে তুলেছিল।
বনোয়ারীলাল রায়ের কোনো সন্তান ছিল না, তিনি তার শালীর মেয়ে রাধারানী পালকে দত্তক নেন। খুব ছোট বয়েস থেকেই রাধারানী দেবীও তার বাবার মতোই ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের অনুরাগী হয়ে পড়েন। নিয়মিত মাঠে গিয়ে খেলোয়াড়দের প্র্যাকটিসের কোনো অসুবিধে হচ্ছে কিনা সেটা দেখা, বাড়িতে যেসব খেলোয়াড়রা রয়েছেন, তাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা তার দিকে নজর রাখা আবার ম্যাচের দিন নিয়ম করে মাঠে উপস্থিত হয়ে যাওয়া, সব কাজেই দিনের পর দিন রাধারানী দেবীও বন্ধুর মতো খেলোয়াড়দের পাশে থেকেছেন। তিরিশ-চল্লিশের দশকে একজন বাঙালি নারীর এরকম ময়দান কাঁপিয়ে বেড়ানোর ঘটনা ভারতবর্ষে আর কোথাও আছে কিনা জানা নেই।
আগেই বলা হয়েছে বনোয়ারীলাল সাধক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন, তাছাড়া বিভিন্ন ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকতেন বলে ক্লাবের হিসাবনিকাশ বা আরো সব কিছু খুঁটিনাটি বিষয়ে দেখবার মতো যথেষ্ট সময় পেতেন না। এই কাজে তাকে সহযোগিতা করতেন প্রাক্তন খেলোয়াড় জিতু মুখার্জি। এই জিতু মুখার্জিই বোধহয় ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রথম ব্যক্তি যিনি কোনো পদে না থেকেও ক্লাবের সমস্ত প্রশাসনিক কাজ একার হাতে সামলাতেন।
টিম জিতলে বিরাট করে ভুরিভোজের ব্যাপার তো আগেই বলা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সেই আসরে ভারতের নামি সংগীত শিল্পীকেও বনোয়ারীলাল রায় নিয়ে আসতেন। ১৯৪২ সালে ক্লাব প্রথবারের জন্য কলকাতা লীগ চ্যাম্পিয়ন হলে বনোয়ারীলাল রায় তার বাড়িতে খেলোয়াড়দের সংবর্ধনার এক বিরাট ব্যবস্থা করেন, সাথে ছিল সবার জন্য খাওয়াদাওয়ার আয়োজন ও। সেই উপলক্ষ্যে ১২ই আগস্ট সন্ধ্যেতে তার বাড়িতে সমাগম হয় প্রায় দুই হাজার মানুষের। সেখানে সংগীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী শচীন দেব বর্মন এবং আরো অনেকে।
জ্যোতিষ চন্দ্র গুহর অনুরোধে ১৯৫৮-৫৯ এই একবছর তিনি ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সভাপতি ও হয়েছিলেন।
আজও বনোয়ারীলাল রায়ের ৭ নম্বর কৃপানাথ লেনের সেই বাড়িটির খেলোয়াড়দের জন্য ব্যবহৃত ঘরগুলো একই রকম রয়েছে। তার নাতি ধনঞ্জয় পাল এবং তার স্ত্রী মমতা পাল খুব যত্নের সাথে সেই ইতিহাসকে আগলে রেখেছেন। কত ইতিহাস, কত স্মৃতি, কত গুণী মানুষের পদচিহ্ন সেই বাড়ির আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে। তাদের ইচ্ছা এই বাড়িটি যেন হেরিটেজ বাড়ি বলে সংরক্ষিত করা হয়। সত্যি তো ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের এক আস্ত ইতিহাসই নিহিত রয়েছে এই বাড়ির সর্বত্র। যদিও ৯ ই সেপ্টেম্বর ১৯৬১ সালে বনোয়ারীলাল মারা যাওয়ার পর ধীরে ধীরে বাড়িটির সেই জৌলুশ হারিয়ে যায়। যিনি ইস্টবেঙ্গল ক্লাবকে নিজের সমস্ত কিছু অকাতরে দিয়েছিলেন, সেই মানুষটিকেও সবাই যেন ভুলতে শুরু করে। এই পৃথিবী বড়োই নিষ্ঠুর। তার শখের সেই বাড়িটির কিছুটা অংশ ধীরে ধীরে রাজনৈতিক দলের দখলে চলে গিয়ে তাদের কার্যালয়ে পরিণত হয়।
তবে আশা রাখা যেতেই পারে, যতদিন ইস্টবেঙ্গল ক্লাব থাকবে ততদিন ৭ নম্বর কৃপানাথ লেনের বাড়িটিও থাকবে তার লড়াইয়ের ইতিহাস, তার সৃষ্টির ইতিহাসকে বুকে আগলে রেখে। থাকবেন সেই ইতিহাসের আরেক অগ্রণী বনোয়ারীলাল রায় ও।